ইষ্টভৃতি নিয়ে আলোচনা-প্রসঙ্গে ১০ম খন্ড

ইষ্টভৃতি নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গের ১০ম খন্ডের ২৬, ৩৬, ১৮৫ পৃষ্ঠায় আলোচনা রয়েছে। নিম্নে সেগুলো উল্লেখ করা হলো।

২২শে পৌষ, ১৩৫৪, বুধবার (ইং ৭/১/১৯৪৮)

….
প্রফুল্ল—বৈষ্ণবদের মধ্যে নামের উপর খুব জোর দেওয়া আছে। নাম করতে গেলে নামীর প্রতি অনুরাগ নিয়ে নাম করতে হবে, তাও বুঝলাম, কিন্তু ইষ্টভৃতি জাতীয় বাস্তব কিছু করার বিধান তো দেখা যায় না!

শ্রীশ্রীঠাকুর—আত্মবৎ ইষ্টসেবা এটা বৈষ্ণবদের মধ্যে normal (স্বাভাবিক) হ’য়ে আছে। That is the beginning (সেই-ই সুরু)। এই করাটাই আগ্রহ বাড়ায়। ওরা বিগ্রহের সেবা খুব নিষ্ঠা সহকারে করে। ওটা হ’লো বিকল্প ব্যবস্থা। ওতেও কাজ কিছুটা হয়। বেশী কাজ হয় জীবন্ত গুরু যিনি, তাঁর বাস্তব সেবায়। একজন জ্যান্ত মানুষকে সেবায় তুষ্ট করতে গেলে নজর দিতে হয় তিনি কী চান, তাঁর কী পছন্দ, তাঁর কী প্রয়োজন, আর সেইভাবে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে হয়, এতে নিজের খেয়াল-খুশি নিয়ে আবিষ্ট হ’য়ে থাকার জড় অভ্যাসটা ভাঙ্গে। শ্রেয়জনকে সেবায় প্রীত করা তাই একটা মস্ত সাধনা। ওতে অনেক কাজ হয়। অনেক আড় ভাঙ্গে। ছেলেপেলেদের দিয়ে ইষ্টভৃতি যেমন করাতে হয়, তেমনি করাতে হয় মাতৃভৃতি, পিতৃভৃতি। মাথায় ধান্ধাটা ঢুকিয়ে দিতে হয়, যাতে মা-বাবাকে নিত্যনূতন কিছু দিয়ে খুশি ক’রে খুশি হওয়ার নেশা চাঙ্গা হ’য়ে ওঠে। এতে জীবনটা উপভোগ্য হ’য়ে ওঠে। মানুষের সার্থকতা হ’লো শ্রেয়কে প্রীত ক’রে চলায়। সেইজন্য বাপ, মা, গুরুজন ও শিক্ষকের উচিত হ’লো ছোটরা সামান্য কিছু প্রশংসনীয় কাজ করলেই আন্তরিকতার সঙ্গে উৎসাহ দেওয়া ও তারিফ করা। তা’ না করলে ওদের সদ্বুদ্ধি পোষণ পায় না। ছেলেপেলের যেমন বাপ-মা’র খুশিকে মুখ্য ক’রে চলা উচিত, স্ত্রীরও উচিত তেমনি স্বামীর খুশিকে মুখ্য ক’রে চলা। স্ত্রী নিত্য না পারলেও তার মতো ক’রে কিছু-কিছু উপঢৌকন যদি স্বামীকে মাঝে-মাঝে দেয়, তাতে তার স্বামীভক্তি বাড়ে এবং ছেলেপেলেরাও ঐ দৃষ্টান্ত দেখে উপকৃত হয়। রোজ যদি কিছু না-কিছু দেয়, তাতে আরও ভাল হয়। দিয়ে ও ক’রে পরস্পরের পরস্পরকে সুখী করার অভ্যাস যত চারায়, ততই সমাজের মঙ্গল। গুরুসেবার কথা নানা জায়গায় নানাভাবে আছে। শুনেছি, শিখদের আছে দশবন্ধ—অর্থাৎ অর্জ্জনের অগ্রভাগ দশ আঙ্গুল দিয়ে তুলে গুরুকে নিবেদন করতে হবে।…

২৩শে পৌষ, ১৩৫৪, বৃহষ্পতিবার (ইং ৮/১/১৯৪৮)

….
এরপর ইষ্টভৃতি-সম্বন্ধে কথা উঠলো।

শ্রীশ্রীঠাকুর বললেন— ইষ্টভৃতির মত মালই নেই। ইষ্টভৃতির ভিতর-দিয়েই দীক্ষা চেতন থাকে। রোজ বাস্তবে যাঁর জন্য কিছু করা যায় তাঁর সঙ্গে একটা বাস্তব সম্পর্ক গ’ড়ে ওঠেই। ইষ্টের সঙ্গে একটা বাস্তব সম্পর্ক যদি আজীবন বজায় রাখা যায়, তাতেই দীক্ষা সজাগ থাকে। ঐ সম্পর্ককে অবলম্বন ক’রে ধীরে-ধীরে জীবনে পরিবর্ত্তন আসতে থাকে—অবশ্য যদি নিত্য করণীয়গুলি sincerely (আন্তরিকতা-সহকারে) ক’রে চলা যায়। ইষ্টের জন্য বাস্তব দায়িত্ব গ্রহণের ব্যাপারটা প্রায় উঠেই গিয়েছিল। ওটা না থাকলে ধৰ্ম্ম কিন্তু একটা ভাবালুতায় পর্য্যবসিত হয়। জীবনে ব’সে যায় না।

প্রফুল্ল—অনেকে তো ইষ্টভৃতি অভ্যাস-বসে যান্ত্রিকভাবে করে। তাতে কি খুব ভাল হয়?

শ্রীশ্রীঠাকুর—যে যেভাবে পারে, continuity (ক্রমাগতি) বজায় রেখে যদি ক’রে যায়, তাতে ভাল হয়। এমন-এমন ঘটনা শুনেছি যে ইষ্টভৃতি না ক’রে হঠাৎ ভুল ক’রে কিছু খেয়ে ফেলার পর এক-এক জনের নাকি বমি হ’য়ে সেই খাদ্য বেরিয়ে যায়। তার মানে system (বিধান)-এর ভিতর অভ্যাসটা অতোখানি ঢুকে গেছে। প্রথমে মানুষ সজাগভাবে অভ্যাস গঠন করে। পরে যখন সেটা রপ্ত হ’য়ে যায় তখন সে-সম্বন্ধে অতোখানি সচেতন ভাব থাকে না। কিন্তু তার মানে এ নয় যে তাতে কোন ফল হচ্ছে না। ওটা ধীরে-ধীরে সত্তার সঙ্গে সহজভাবে মিশে যায়। ইষ্টার্থী অভ্যাস এইভাবে যত কায়েম হয়, ততই ভাল। তবে কোন প্রত্যাশা নিয়ে ইষ্টভৃতি করতে হয় না। ইষ্ট আমার পরম প্রিয়, তাঁর খুশিটাই আমার লাভ—সে বোধে যজন, যাজন, ইষ্টভৃতি করতে হয়।

১৬ই মাঘ, ১৩৫৪, শুক্রবার (ইং ৩০/১/১৯৪৮)

……
শ্রীশ্রীঠাকুর বলছেন…..
….পাশ্চাত্য দেশকে blindly (অন্ধভাবে) follow (অনুসরণ) ক’রে লাভ নেই। কারও লাভ নেই তাতে। আমরা আমাদের বৈশিষ্ট্য-অনুযায়ী চললে নিজেরাও যেমন লাভবান হব অন্যেরাও তেমনি লাভবান হবে। বৈশিষ্ট্য-অনুযায়ী চলনে আমাদের যা’ হবার তা’ আমরা হ’তে পারব এবং তখন অন্যের আমাদের কাছ থেকে যা’ পাবার তাও তারা পেতে পারবে। ধরুন, প্রত্যেকেই যদি ইষ্টকৃষ্টিকে অবলম্বন ক’রে নিত্য বাস্তবে পঞ্চযজ্ঞ করে তাহ’লে কি বিরাট কাণ্ড হয়। এই পঞ্চযজ্ঞের কথা স্মরণ করেই আমি ইষ্টভৃতির সঙ্গে তার অঙ্গ হিসেবে ভ্রাতৃভোজ্য ও পরিবেশকে সাহায্য দানের বিধান আবশ্যিকভাবে জুড়ে দিয়েছি। রোজ প্রত্যেকে যদি প্রত্যেকের জন্য ভাবে, প্রত্যেকের জন্য করে, প্রীতিপূর্ণ পারস্পরিক আদান-প্রদান ও সেবা-বিনিময় যদি সহজে উৎসারিত হ’য়ে চলে তাহ’লে কেউ কি নিজেকে অসহায় মনে করতে পারে? সকলের বুকে কতখানি বল হয়। তখন সকলে মিলে যেন একটা মানুষ। একেই তো বলে সংহতি। আর সংহতিই তো শক্তির উৎস। ইষ্টভৃতির গুণের কথা ব’লে শেষ করা যায় না। আমি একে বলি সামৰ্থীযোগ। এতে মানুষ যোগ্য হ’য়ে ওঠে। নিয়মিতভাবে ascetic way-তে (তাপসভাবে) ইষ্টভৃতি করলে বোধ করতে পারবেন বিপদ-আপদ কাটাবার ক্ষমতা কতখানি বেড়ে যাচ্ছে। দুনিয়া টলমল করতে থাকলেও আপনি অটলভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবেন। শক্তির জাগরণ নিজ অন্তরেই বোধ করতে পারবেন। বার্ম্মার যুদ্ধের সময়, নোয়াখালি ও কোলকাতার দাঙ্গার সময় ভুরি-ভুরি দৃষ্টান্ত দেখা গেছে—যারা নিষ্ঠার সঙ্গে যজন-যাজন-ইষ্টভৃতি করে তারা পরমপিতার দয়ায় কিভাবে সমূহ বিপদের হাত থেকে রক্ষা পেয়ে যায়। অবশ্য আত্মস্বার্থের লোভে কিছু করতে নেই। পরমপিতাকে ভালবেসে তাঁর পথে চললে পরমপিতা তাদের হাত ধ’রে চালিয়ে নিয়ে মঙ্গলের কোলে সমাসীন করেন।