ইষ্টভৃতি নিয়ে আলোচনা-প্রসঙ্গে ১৪শ খন্ড

ইষ্টভৃতি নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গের ১৪শ খন্ডের ২, ১৩৭, ১৪১, ১৫২, ১৬৩, ১৭৪, ১৯৪, ২১৫, ২১৭, পৃষ্ঠায় আলোচনা রয়েছে। নিম্নে সেগুলো উল্লেখ করা হলো।

২৯শে শ্রাবণ, শনিবার, ১৩৫৫ (ইং ১৪/৮/১৯৪৮)

….[শ্রীশ্রীঠাকুর ভাগ্য নিয়ে একটি বাণী দিলেন এবং তা নিয়ে আলোচনা চলছে]….

যতীনদা— কথাটা সুন্দর ও অভিনব। ভাগ্যরচনায় প্রত্যেকের নিজের কী করণীয় তা’ খুব ভালোভাবে বোঝা যায় এ থেকে।

মানুষ আনন্দ সন্ধানী। তাই, আনন্দময়ের সান্নিধ্যে মানুষের সমাবেশ লেগেই থাকে দিনরজনী। আর তিনিও বুকভরা ব্যাকুলতা নিয়ে অকাতরে বিলিয়ে চলেন অফুরন্ত আনন্দ ও উদ্দীপনার রসদ। রাত্রি তার মায়াময় ছায়া বিছিয়ে দিয়েছে ধরিত্রীর গাত্রে। বাতাসে হইছে মধুক্ষরা কুসুম সুরভি। দ্যুলোকে জ্বলছে জ্যোতিবিভাসিত জ্যোতিষ্কমণ্ডলী। বিরাটের এই পটভূমিকায় স্বরাট্ স্বমহিমায় সমাসীন। মানুষ ভূমার সন্তান, ভূমার পূজারী। স্বল্পে তার সুখ নেই, সে চায় আরো আরো আরো হ’য়ে, আরো আরো আরো ক’রে তাঁর সেবায় নিজেকে নিয়োজিত ক’রে সার্থকতা আলিঙ্গন করতে।

সেই চিরন্তন আকুতি যেন ভাষা পেল জনৈক ভক্তের কণ্ঠে — বাবা! আমি সাধ্যমতো ইষ্টভৃতি করি, কিন্তু মনে তৃপ্তি হয় না তাতে। ভাবি কবে যোগ-অর্ঘ্য করতে পারব। পরক্ষণেই মনে হয়, সামান্য আয়, অত টাকা পাব কোথায়?

শ্রীশ্রীঠাকুর হাসতে-হাসতে হাতে তুড়ি দিয়ে বললেন—টাকা কোথায়?—তোমার এই আন্তরিক সাধু সঙ্কল্পই হয়তো অদূরভবিষ্যতে অজস্র শুক্ল অর্থের জনয়িতা হ’য়ে উঠবে। মাথা খাটাও, অর্জ্জনপটুতা ও ইষ্টভৃতির পরিমাণ বাড়িয়ে চল। তোমার অগোচরে আপসে আপ যোগ-অর্ঘ্য করবার সামর্থ্য গজিয়ে উঠবে তোমার ভিতর। তোমার শক্তির সীমারেখা তোমার তো জানা নেই। তোমার আগ্রহই বলে দেয় তুবি খুব পারবে, ঢের পারবে। এক নেংটে পারে, আর পারে খুব অর্থবান। তবে প্রকৃতপক্ষে নেংটেরাই পারে। ধনীরা পারে কমই। ভগবান যীশু বলেছেন—”It is easier for a camel to go through the eye of a needle, than for a rich man to enter into the kingdom of heaven.” (একজন ধনীর স্বর্গরাজ্যে প্রবেশের চাইতে বরং একটা উটের পক্ষে একটা সূচের ছিদ্র দিয়ে গলিয়ে যাওয়া সহজ।)

১৭ই আশ্বিন, রবিবার, ১৩৫৫ (ইং ৩/৮/১৯৪৮)

……
শরৎদা—কম্যুনিষ্টরা ইষ্টভৃতিকে বলে শোষণ।

শ্রীশ্রীঠাকুর—ভগবানে কর্ম্মফল যদি ত্যাগ বা নিবেদন না করি, জীবনের উদ্বর্দ্ধন হয় না। যা’র থেকে জ্যোতি পাই সেখানে খালি ক’রে না তুললে, আলো পাই না, জ্যোতি আর পাই না। ভোগ করতে গেলে যে-উৎস থেকে পাই, তার জন্য ত্যাগ করতে হয়।

২০শে আশ্বিন, বুধবার, ১৩৫৫ (ইং ৬/১০/১৯৪৮)

……
ইষ্টভৃতি নিয়ে কথা হচ্ছিল। সেই প্রসঙ্গে বললেন—ইষ্টভৃতির ফল অশেষ। ইষ্টভৃতি যারা উদগ্র আগ্রহ নিয়ে করে, এমন কাম নেই যে তারা পারবে না—অবশ্য সম্ভাব্যতার ভিতর হ’লে।

২৭শে আশ্বিন, বুধবার, ১৩৫৫ (ইং ১৩/১০/১৯৪৮)

……
দুইজন দাদা কৃষ্টিবান্ধব হ’লেন।

শ্রীশ্রীঠাকুর তাদের বললেন—ইষ্টভৃতি ক’ষে করবে। অমন মাল আর নেই। ওতে শক্তি ঠেলে বেড়িয়ে পড়বে। কিছুতেই আটকাবে না। ভোরে উঠে সন্ধ্যা-আহ্নিক ও ইষ্টভৃতি ক’রে কাজে বেরুবে। আর, ভাবা ও করায় মিল রাখবে। এই motion (গতি)-টুকু দিয়ে দিলে গাড়ি চলতে থাকবে।

২৯শে আশ্বিন, শুক্রবার, ১৩৫৫ (ইং ১৫/১০/১৯৪৮)

…….[পৃষ্টা নং ১৬৩]
একটু পরে শ্রীশ্রীঠাকুর বললেন— নিত্য সাধনা চাই। প্রথম জিনিস যজন। ভক্তির সঙ্গে ইষ্টের মনন, নাম, জপ, ধ্যান, তাঁর নীতিবিধিগুলি পরিপালন করা, চরিত্রগত করা। এক-কথায় নিজেকে ইষ্টের ভাবে ভাবিত, অনুরঞ্জিত ও নিয়ন্ত্রিত করাই যজন। যাজন মানে সেবা-সাহচর্য্য-বাক্য-ব্যবহারে অপরকে প্রবুদ্ধ ক’রে ইষ্টস্বার্থপ্রতিষ্ঠাপ্রাণ ক’রে তোলা। নিজে ইষ্টস্বার্থপ্রতিষ্ঠাপন্ন না হ’লে কিন্তু অন্যের ভিতর এই ভাবটা সঞ্চারিত করা যায় না। ইষ্টভৃতি হ’ল নিত্য অন্নজল গ্রহণের পূর্ব্বে ইষ্টকে নিত্য বাস্তবে যথা সম্ভব নিবেদন করা। নিয়মিতভাবে তাঁকে দেওয়া ও তাঁর জন্য করার ভিতর-দিয়ে তাঁর উপর টান বাড়ে। দেশ ও দশকে জাগাতে গেলে আমাদের যাজনজৈত্র হ’তে হবে। আমাদের প্রত্যেকটা চলা-বলা যেন মানুষকে ইষ্টে উদ্বুদ্ধ ক’রে তোলে। মানুষ হয় ঈশ্বরমুখী হবে, না হয় প্রবৃত্তিমুখী হবে। নিজেরা ঈশ্বরমুখী হওয়া ও অপরকে ঈশ্বরমুখী ক’রে তোলাই মঙ্গলের পথ। এই-ই প্রত্যেকের করণীয়।

সুধীরদা— তার জন্য তো চাই অনুভূতি ও চরিত্র।

শ্রীশ্রীঠাকুর—যথাস্থানে দীক্ষা নিয়ে ঠিকভাবে যজন, যাজন, ইষ্টভৃতি করতে থাকলে নিষ্ঠা ও ঐসব আসে।

সুধীরদা—নিষ্ঠাও তো অনুভূতির উপর নির্ভর করে।

শ্রীশ্রীঠাকুর—ন্যাংটা ক’রে ভাব। মুল কথা, ইষ্ট মানুষটিকে ভালবাসা, আর ভালবাসা থাকলে যা’ করে, তাই করা।

সুধীরদা—ভালবাসা তো জোর ক’রে হয় না।

শ্রীশ্রীঠাকুর—ভালবাসলে ভালবাসা হয়। তার মধ্যে থাকে ভাললাগা ও পছন্দ ও সেই অনুযায়ী করা। কা’রও জন্য করতে-করতে আবার তাকে পছন্দ করি, ভাললাগা ও ভালবাসা গজায়। আপনজনের উপর ভালবাসাটাও এইভাবে হয়। ভালবাসলে যেমন ভাবে, বলে ও করে, তেমন ভাবা, বলা, করাটাই যজন, যাজন, ইষ্টভৃতি।

সুধীরদা—ইষ্টকে ভালবাসি, না নিজের স্বার্থ ভালবাসি বোঝা যায় না।

শ্রীশ্রীঠাকুর—ইষ্টার্থ যখন কারও নিজের স্বার্থ হ’য়ে দাঁড়ায়, তখনই সে ইষ্টপ্রাণ হয়। আর, যতক্ষণ তার নিজের কামনাপূরণের জন্য ইষ্ট, ততক্ষণ সে আর্ত্ত বা অর্থার্থী থাকে।

সুধীরদা—মানুষ যে কী চায়, তাই বোঝে না।

শ্রীশ্রীঠাকুর—আমার কেউ আছে, এটা বুঝতে পারলে, মন যেন ঠাণ্ডা থাকে। সত্তাটা তৃপ্তি পায়। মানুষ যেন তাই-ই খোঁজে। সেইটেই বুঝতে চায় যে, তার কেউ আছে। আমি রাজারাজড়াই হই, আর যেই হই, যদি জানি কেউ নেই, তবে অসহায়, নিরাশ্রয়, ‘নিরাশ্রয়ং মাং জগদীশ রক্ষ।’ উদ্যম, স্পৃহা, কৰ্ম্মশক্তি সব ফুটে বেরোয়, কেউ আছে আমার এই বোধ থাকলে।
….

৩১ শে আশ্বিন, রবিবার, ১৩৫৫ (ইং ১৭/১০/১৯৪৮)

……
আজ সারাদিন অমন শতাধিক ব্যক্তি তাদের ব্যক্তিগত, দাম্পত্য, পারিবারিক, শারীরিক, মানসিক, আর্থিক, বৈষয়িক, ব্যবসায়িক, আধ্যাত্মিক সমস্যাদির কথা শ্রীশ্রীঠাকুরের কাছে নিবেদন ক’রে সমাধান নিলেন। কাল থেকে তাঁর শরীর কিছুটা অসুস্থ, মনও ভাল নয়। অথচ নিজের সব অসুবিধা উপেক্ষা ক’রে মানুষকে শান্তি, স্বস্তি, তৃপ্তি, বুদ্ধি, পরামর্শ ও প্রেরণা বিলিয়ে চলেছেন নিরন্তর।

জনৈক দাদা সাংসারিক অসুবিধার কথা জানালেন।

শ্রীশ্রীঠাকুর—ইষ্টভৃতি ঠিকমত ক’রে যাও, সঙ্গে-সঙ্গে যজন, যাজন। এই হ’ল পরম ঢাল। এই ঠিক থাকলে সব গুছিয়ে নিতে পারবে।

একজন বিহারী মালী আধ্যাত্মিক জীবনে উন্নতির জন্য প্রার্থনা জানালেন।

শ্রীশ্রীঠাকুর প্রীতিভরে বললেন—অনুরাগের সঙ্গে নাম কর। সদাচারে থাক। প্রেমের সঙ্গে সেবা কর মানুষকে। তাঁকে ভালবাস। তুমি তাঁর মালী হও আর খুব ভক্তিসে চল।

জনৈক দাদা—ঠাকুর! আমি অন্তিম সময়ে ভগবানের নাম স্মরণ করতে-করতে যেন দেহত্যাগ করতে পারি।

শ্রীশ্রীঠাকুর—অচ্যুতভাবে তাঁকে অনুসরণ করো। সদাচারে থেকো। ভগবান তোমাকে কৃপা করবেন।

১১ই কার্ত্তিক, বৃহষ্পতিবার, ১৩৫৫ (ইং ২৮/১০/১৯৪৮)

…..
এরপর এলেঞ্জিমিটটাম শ্রীশ্রীঠাকুরের সঙ্গে নিভৃতে কথা বলার পর দীক্ষা নিতে গেলেন।

এমন সময় পূজনীয় বড়দা আসলেন।

শ্রীশ্রীঠাকুর বড়দাকে বললেন—এলেঞ্জিমিটটাম দীক্ষা নিতে গেছে।

তারপর হঠাৎ বললেন—আচ্ছা এমন হয় কেন? সবাইকে ভাল লাগে। সবারই ভাল করতে ইচ্ছা করে। কিন্তু কেউ দীক্ষা নিলে মনে যেন একটা ভরসা হয়। অবশ্য চিন্তাও বেড়ে যায় তা’র জন্য। তবু মনে হয়, তা’র মধ্যে সেই seed (বীজ)-টা পড়ল, যাতে সে exalted (উন্নীত) হ’তে পারে। তা’র রাস্তা যেন খুলে গেল। আচ্ছা! এরকম মনে হয় কেন?

সুশীলদা—তাই-ই তো স্বাভাবিক।

একটু পরে এলেঞ্জিমিটটাম দীক্ষা নিয়ে এসে প্রণাম করার পর শ্রীশ্রীঠাকুর বললেন—নাম পেলে, এখন practice (অনুশীলন) কর ঠিকমতো।

এলেঞ্জিমিটটাম্—ফরমুলা পেলাম।

শ্রীশ্রীঠাকুর—বাস্তবে প্রয়োগ কর, কাজে লাগাও। “বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি, ধম্মং শরণং গচ্ছামি, সঙ্ঘং শরণং গচ্ছামি”। যত যাই করি, মূল ঠিক না থাকলে দানা বাঁধে না। তিনটে জিনিস আছে—যজন মানে নিজে করা, যাজন, মানে পারিপার্শ্বিকের ভিতর সঞ্চারিত করা, আর ইষ্টভৃতি, মানে নিত্য নিজে অন্নজল গ্রহণের পূর্ব্বে ভক্তিভরে তাঁকে ভোজ্য নিবেদন। এই তিনটে জিনিষ নিয়মিতভাবে ক’রে যাও। করলেই ফল বুঝতে পারবে।
…..

২০ শে কার্ত্তিক, শনিবার, ১৩৫৫ (ইং ০৬/১১/১৯৪৮)

শ্রীশ্রীঠাকুর প্রাতে বড়াল-বাংলোর বারান্দায়। কান্তিদা (বিশ্বাস), যামিনীদা (রায়চৌধুরী), ভগীরথদা (সরকার) প্রমুখ কাছে আছেন।

যামিনীদা এক ভদ্রলোক সম্বন্ধে বললেন—তিনি বলেন সৎসঙ্গের এত বদনাম কেন ?

শ্রীশ্রীঠাকুর—বদনামই তো indication (নিদর্শন) যে কিছু করা হ’চ্ছে।

যামিনীদা—ইষ্টভৃতিকে তিনি শোষণ ব’লে মনে করেন।

শ্রীশ্রীঠাকুর—আমরা যে টাকা পাই, তা Love-offer (ভালবাসার দান), oblation (অর্ঘ্য)। অতি pure (পবিত্র), honest (সৎ)। এর চাইতে honest (সৎ), pure (পবিত্র), sublime (মহৎ) আর কিছু নেই। ডাক্তারি, প্রফেসারি, জজিয়তি, এটর্নিগিরি, ওকালতি যা-কিছু কর, সবই হ’লো service (সেবা) বিক্রি করা। আর, এটা হ’লো কৃতার্থ হ’য়ে প্রাণের উৎসর্গ। এর চাইতে pure money ( পবিত্র অর্থ) দুনিয়ার dictionary তে (অভিধানে) নেই। আমাদের যা’ দেয়, তা’ হ’ল ইষ্টভৃতি। ইষ্টভৃতি যদি খারাপ জিনিস হয়, ভাল জিনিস আর কিছু নেই। এটা মানুষ দেয় নিজেদেরই কল্যাণের জন্য। মানুষের কল্যাণের জন্যই এটা পরমপিতার বিধান। যারা বিধিমতো করে, তারা ঠিক পায়। বাইরে থেকে কী বুঝবে?
…….

এরপর বোধ সম্বন্ধে কথা উঠলো।

প্রফুল্ল—অনেকে বোঝে খুব, কিন্তু ইষ্টভৃতিটাই ঠিকমতো করতে পারে না।

শ্রীশ্রীঠাকুর—তার মানে নিষ্ঠার অভাব। ইষ্টভৃতির মতো অমন জিনিসই নাই। অতি উপাদেয়। It is a boon to the being (এটা সত্তার প্রতি একটা বর)।

পরে এই সম্পর্কে ইংরাজীতে একটা বাণী দিলেন। কথাপ্রসঙ্গে বললেন—সৎসঙ্গের অনেকের innate tendency (অন্তর্নিহিত ঝোঁক) হ’লো নিজের মূল্যে মানুষকে বড় করা, কিন্তু মানুষের মূল্যে নিজেকে বড় করা নয়। তাই এরা দৈন্যপীড়িত কম। আজকাল বেশীর ভাগ leader (নেতা)-দের মধ্যে এ জিনিস পাবে না।

শ্রীশ্রীঠাকুর কথায়-কথায় বললেন—আমার কাজটা যদি hobby (খেয়াল)-এর মতো তোমাদের পেয়ে বসে, তাতে তোমাদের যোগ্যতা বেড়ে যাবে।
….