ইষ্টভৃতি নিয়ে আলোচনা-প্রসঙ্গে ১৯শ খন্ড

ইষ্টভৃতি নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গের ১৯শ খন্ডের ৬৬, ১২৯, ১৬৬, ১৯৩, ২৩১, ২৪৫, ২৯০ পৃষ্ঠায় আলোচনা রয়েছে। নিম্নে সেগুলো উল্লেখ করা হলো।

১৮ই চৈত্র,১৩৫৬ শনিবার, (ইং ১/৪/১৯৫০)

…..
কথাপ্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর বললেন—তিনটি জিনিস আমাদের বিশেষভাবে করণীয়। প্রথম হ’ল যজন অর্থাৎ নাম-ধ্যান, পূজাপাঠ, আত্মবিচার-আত্মবিশ্লেষণ ইত্যাদির ভিতর-দিয়ে নিজের মনোজগৎকে ইষ্টের ছন্দানুবর্তী ক’রে তোলা। দ্বিতীয়টি হ’ল যাজন। অর্থাৎ পরিবেশকে ইষ্টের ভাবে ভাবিত ক’রে তাঁতে যুক্ত ক’রে তোলা। পরিবেশকে বাদ দিয়ে আমরা কেউ একলা বাঁচতে পারি না। তাই, পরিবেশকে গ’ড়ে তোলার জন্য সক্রিয় প্রচেষ্টা চাই-ই। যাজন তাই আমাদের নিত্য করণীয়। আমাদের প্রত্যেককেই Fisher of man (মানুষ ধরার জেলে) হওয়া লাগবে। আর, চাই ইষ্টের ভরণ ও পোষণ। এর ভিতর দিয়ে তাঁর উপর টান গজায় এবং সেই টান আমাদের জীবনের নিয়ামক হ’য়ে ওঠে। এর কোনটা বাদ দিলে চলবে না।

জনৈক দাদা রামকৃষ্ণদেবের কথা বললেন।

শ্রীশ্রীঠাকুর — রামকৃষ্ণদেবকে যদি আমরা আমাদের জীবনে জীবন্ত ক’রে তুলতে না পারি তাহ’লে শুধু মৌখিক শ্রদ্ধা দেখানর ভিতর-দিয়ে আমরা কিন্তু বিশেষ লাভবান হব না। রামকৃষ্ণদেবকে অনুসরণ করতে গেলেও তাঁর সঙ্গে যুক্ত হ’য়ে যজন-যাজন-ইষ্টভৃতি ক’রে চলা লাগবে।
….

১৮ই বৈশাখ,১৩৫৭ সোমবার, (ইং ১/৫/১৯৫০)


জনৈক দাদা—ইষ্টভৃতি যদি নিয়মিত করি এবং তিন-চার মাস অন্তর পাঠাই তাহ’লে ক্ষতি কী ?

শ্রীশ্রীঠাকুর—ইষ্টভৃতি-বিধির ব্যত্যয় হ’লে সুখ-শান্তিও ব্যত্যয়ী রকমে চলে আমাদের জীবনে।

উক্ত দাদা—ভোরে বিছানায় ব’সে বাসি কাপড়ে ইষ্টভৃতি করতে পারি?

শ্রীশ্রীঠাকুর—করা যায়, তবে যতটা পবিত্রভাবে করা যায় তাই ভাল।

উত্ত দাদা—সামর্থ্য যদি না থাকে তবে ইষ্টভৃতি করব কিভাবে?

শ্রীশ্রীঠাকুর—প্রয়োজন হ’লে ভিক্ষা ক’রে করবে। নইলে ফুল, ফল, জল যা জোটে তাই দিয়েই করতে পার। তবে নিজে যদি অন্নজল গ্রহণ কর, ইষ্টের জন্য ভোজ্যানুকল্পে যা’ পার নিবেদন করবেই। যোগ্যতাকে কখনও ফাঁকি দিও না।
….

২২শে জ্যৈষ্ঠ,১৩৫৭ সোমবার, (ইং ৫/৬/১৯৫০)

শ্রীশ্রীঠাকুর প্রাতে যতি আশ্রমে। যতিবৃন্দ ও পি এস ভান্ডারী আছেন। কথায়-কথায় ভান্ডারীদা জিজ্ঞাসা করলেন—অনেক সদ্বংশজাত লোকের ভিতরেও তো দীক্ষা নেবার প্রবৃত্তি দেখা যায় না।

শ্রীশ্রীঠাকুর—সদগুণ থাকা সত্ত্বেও হয়তো এমন কতকগুলি প্রবৃত্তি তাকে চালনা করে যে, সে হয়তো দীক্ষা নেবার প্রয়োজন বোধ করে না। আবার, ঐ পথে যখন ধাক্কা খায়, তখন হয়তো এইদিকে ঝোঁকে। ছোট থাকতেই দীক্ষা দিয়ে যজন, যাজন, ইষ্টভৃতি পালনের অভ্যাস করিয়ে দেওয়া ভাল। পরিবারের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি যিনি তাঁর যদি শ্রদ্ধার্হ চলন না হয় এবং তিনি যদি শ্রদ্ধা আকর্ষণ করতে না পারেন, তাহ’লে হয় না। পারিবারিক জীবনে যাজন খুব প্রয়োজন। আর, পরিবারের মধ্যে থাকা চাই একটা ধর্ম্মীয় পরিবেশ। একটা পরিবারও যদি ঠিকভাবে গ’ড়ে ওঠে, আশ-পাশের অন্যান্য পরিবারও তা’ দেখে প্রভাবিত হয়। যারা ইষ্টকে নিয়ে ঠিকমত চলে, তাদের সঙ্গে জড়িত অন্য লোকেরাও সেই দিকে আকৃষ্ট হয়।
….

২রা শ্রাবণ,১৩৫৭ মঙ্গলবার, (ইং ১৮/৭/১৯৫০)

….
নগেনদা—ইষ্টভৃতি অন্তত আহার্য্যানুপাতিক করতে হয়, কিন্তু তা’তো পারে না সবাই।

শ্রীশ্রীঠাকুর—যা’ পারে তা’ দিয়ে করলেই হয়, সামর্থ্যকে ফাঁকি না দিয়ে। তেমনক্ষেত্রে একটা ফুল দিয়ে করলেও হয়।

নগেনদা—নিজের আহার্য্যানুপাতিক না করলে তো insincerity (কপটতা) এসে যায়।

শ্রীশ্রীঠাকুর—Sincerity-র (আন্তরিকতার) বুদ্ধি যত বাড়ে, মানুষ করেও তত, যোগ্যতাও বাড়ে। ধর্ম্মের ভানও ভাল। ইষ্টভৃতি আমরা করতাম বটে, কিন্তু এর ফলে যে কাী হয় জানতাম না। কিন্তু জেমসের কথার মধ্যে এ জাতীয় অনুষ্ঠানের কার্য্যকারিতা সম্বন্ধে ইঙ্গিত পাওয়া গেল। আর, বাস্তবে তার অজস্র নজিরও আছে। ইষ্টভৃতি donation (দান) মতো দিতে হয় না, নিত্য নিবেদন করতে হয়। আগ্রহ থাকা চাই—তা দৈনন্দিন সমস্ত কাজগুলির মধ্যে অজানিতে অনুস্যুত হয়, আর সেগুলিকে adjust (নিয়ন্ত্রণ) করে। ওর ক্ষমতা যে কী, সেটা বিপদ-আপদের সময় বোঝা যায়। কত যে এর ঘটনা আছে, তার ইয়ত্তা নেই।
….

৩রা ভাদ্র,১৩৫৭ রবিবার, (ইং ২০/৮/১৯৫০)

…..
বর্ধমানের একটি দাদা বললেন—দীক্ষা নিয়েছি, ইষ্টের জন্য ভাবা-বলা-করা দরকার। মানুষকে কী বলব, আর করবই বা কী?

শ্রীশ্রীঠাকুর—যাতে মানুষের সত্তা-সম্বর্ধনা হয়, তাই মানুষকে বল—প্রত্যেকের মতো ক’রে তাকে। পরিবেশ উন্নত না হ’লে তোমারও উন্নতি নেই। তাদের কাছ থেকেই দেহ ও মনের খোরাক নিতে হবে তোমাকে, তাই তারা যত সৎ ও সাত্ত্বিক হয়, ততই ভাল তোমার পক্ষে; তাতে তুমি জীবনীয় রসদ পাবে। সুতরাং মানুষকে বলতে হবে তাই যাতে তাদের মঙ্গল হয়। তাদের মঙ্গলেই তোমার মঙ্গল। আর তোমার ভাবাটা যদি ভাবাতেই পর্ব্যবসিত হয়—তোমার nerve (সার)-কে excite (উদ্দীপ্ত) ক’রে যদি তা’ করায় উদ্ভিন্ন না হ’য়ে ওঠে, তবে তা’ তোমার সত্তায় দানা বেধে ওঠে না। আবার, ইষ্টার্থে ভাবা, বলা, করার সঙ্গতি যত হয়, ততই ইষ্টানুরাগ গজিয়ে ওঠে। ঐটেই মানুষের মূল সম্বল।

উক্ত দাদা—আমরা নিজেরা যতটা খাই, ইষ্টের জন্য ততটা যদি না দিই, তবে তো আমরা অপরাধী হব,—এ কপটতায় লাভ কী ?

শ্রীশ্রীঠাকুর—’যেন ভুলে না যাই/বেদনা পাই/শয়নে স্বপনে। তোমায় আমার হয়নি পাওয়া/সে কথা রয় মনে।’ তুমি যখন বাচ্চা ছিলে মা-বাবা তোমার জন্য কত করেছেন, তুমি আর কতটুকু করতে পেরেছ। যা হোক, আমরা যদি কাউতে concentric (সুকেন্দ্রিক) হ’তে চাই, তবে তাঁর জন্য আমাদের করা লাগে। এবং কিছু করলেও আরও করতে পারছি না ব’লে বেদনা থাকাই লাগে। এই আকুতিতেই তখন তুমি যেখানে যা’ পাবে তাঁকে তা’ দিয়ে তৃপ্তি পেতে চেষ্টা করবে। একটা কুল পাও, ফুল পাও, আগ্রহ-আবেগভরে তাই তাঁকে নিবেদন করবে। আদত কথা হল—ভোজ্য দেওয়া। Sincere (আন্তরিক) হ’লেই আশানুরূপ না দিতে পারলে বেদনা লাগবেই, আর বেদনা না পাওয়ার জন্যই তখন আরও বাড়াতে থাকবে, আরও দিতে থাকবে। এতেই বাড়বে যোগ্যতা।

আগ্রহটাই বড় কথা। এই আগ্রহদীপ্ত সেবার ভিতর-দিয়ে মানুষের অনুরাগ বাড়ে। আর অনুরাগ বিনা সব ব্যর্থ। আহাৰ্য্যানুপাতিক দিতে পারছি না ব’লে ঐ অজুহাতেই কিছু না দেওয়ার চাইতে দুটো হ্যালেঞ্চা বা কলমী দেওয়াও কত ভাল। এই রকম খুঁদ-কুঁড়ো যা’ জোটে সেই দেওয়ার মধ্য দিয়েই কতজনে অভাবনীয়ভাবে বেঁচে গেছে। তাঁকে আরও-আরও দেবার জন্য যদি মনে একটা আকুতি না থাকে তাহ’লে evolution (বিবর্তন) হয় না। Evolution (বিবর্তন) এর মূলেই থাকে অমনতর আগ্রহ ও বেদনা। ঐ বেদনাই তাকে বাড়তির পথে নিয়ে যায়।

উক্ত দাদা—যারা সামর্থ্য সত্ত্বেও ইষ্টভৃতি বাড়ায় না, তাদের কি ক্ষতি হয় না?

শ্রীশ্রীঠাকুর—করতে-করতেই বাড়াবার বুদ্ধি আসে। বলে—’habit is the second nature’ (অভ্যাসই দ্বিতীয় স্বভাব)। এক ফকির গিয়েছিল এক বাড়িতে ভিক্ষা করতে, কিছুই দেয় না, বার-বার চাইতে চাইতে গৃহিণী বিরক্ত হ’য়ে শেষটা একমুঠো ছাই দিল। তা’ পেয়েই ফকির বলল—’এও ভাল, হাত আসুক’।
…..

১৬ই ভাদ্র,১৩৫৭ শনিবার, (ইং ২/৯/১৯৫০)

……
সত্যদা—ক্ষত্রিয়ের তো বামুনকে ভাত খেতে দেওয়া উচিত না। আমরা ইষ্টকে নিবেদন ক’রে খাই, তা’ কি ঠিক ?

শ্রীশ্রীঠাকুর—ইষ্টকে নিবেদন করার বাধা কি ? সেটা তো তিনি গ্রহণ করছেন সূক্ষ্মভাবে। আপনি যদি ক্ষত্রিয় হ’য়ে বামুনের বৈশিষ্ট্য অবদলন করেন, তাতে তার যা’ ক্ষতি হোক বা না হোক—সে অবদলন আপনাকে স্পর্শ করবেই। সব বেড়া দেওয়া আছে । একটা বেড়া ভাঙলে সকলেরই ক্ষতি। আমাদের সম্বর্দ্ধনী বৈশিষ্ট্যচলন যদি বজায় রাখা যায়, তাহ’লে একেবারে অচ্ছেদ্য অটুট জিনিস হ’য়ে দাঁড়ায় । আপনি যা’ই খান, তাইতো আপনার অন্তর্নিহিত ইষ্টের খাওয়া হয়। কারণ, তিনিই আপনার আত্মাস্বরূপ, তাই তাঁকে নিবেদন করায় দোষ নেই। এটা করতে হয় অনুরাগের সঙ্গে।

একটা আছে আপনার ব্যষ্টিদেহ, আর একটা আছে সমগ্র সমাজকে নিয়ে, মনুষ্য- জাতিকে নিয়ে সমষ্টি-দেহ । সমষ্টি-দেহকে যদি অবজ্ঞা করেন, সমষ্টি-দেহের প্রতীক-স্বরূপ ইষ্টকে যদি আপনি অবজ্ঞা করেন, তাহ’লে কিন্তু আপনার ব্যষ্টি-দেহ টিকবে না।

আপনার সম্মান বজায় রাখতে গেলে অন্যের সম্মান বজায় রাখতে হবে। অন্যের সম্মান যদি এক সরষে ভাঙেন, আপন সম্মান কুড়ি সরষে পরিমাণ ভাঙা প’ড়বে । আমরা ভাবি একজনকে খাটো ক’রে আমরা বুঝি বড় হ’লাম। কিন্তু অন্যে যদি বড় না হয়, বড় না থাকে, আমার বড়ত্ব দাঁড়ায় কোথায় ? পারিপার্শ্বিক নিয়েই তো আমি।

২রা কার্ত্তিক,১৩৫৭ বৃহষ্পতিবার, (ইং ১৯/১০/১৯৫০)

……
ইষ্টভৃতি-স্বস্ত্যয়নী সম্বন্ধে কথা ওঠায় শ্রীশ্রীঠাকুর বললেন—নিত্য এটা নিষ্ঠা সহকারে করলে মস্তিকে এমন একটা ছাপ পড়ে যে বিপদ-আপদের সময় জাগ্রত হ’য়ে তা’ রক্ষা করে। নিত্য এটা করতে থাকলে অস্তিত্বের একটা স্তম্ভস্বরূপ হ’য়ে দাঁড়ায়।

ইষ্টভৃতি স্বস্ত্যয়নীর অর্ঘ্য চুরি গেলে ভিক্ষা করতে হয় কেন, সেই সম্পর্কে শ্রীশ্রীঠাকুর বললেন—যে মনোযোগের অভাবের জন্য চুরি হ’ল, মানুষের কাছে গিয়ে ভিক্ষা করতে হ’লে সেটার খ্যাপন করতে হয়। অনেকে হয়তো মুখ বেঁকায়। অনেকে হয়তো কুত প্রশ্ন করে। এর ভিতর দিয়ে সে নিজের দোষ-সম্বন্ধে আরও সচেতন হ’য়ে নিজেকে সংশোধন করতে চেষ্টা করে।