ইষ্টভৃতি নিয়ে আলোচনা-প্রসঙ্গে ২১শ খন্ড

ইষ্টভৃতি নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গের ২১শ খন্ডের ৬৪, ১৮১, ২৩৫, ২৪৫ পৃষ্ঠায় আলোচনা রয়েছে। নিম্নে সেগুলো উল্লেখ করা হলো।

২৭ শে বৈশাখ, ১৩৫৯, শনিবার (ইং ১০/০৫/১৯৫২)

শ্রীশ্রীঠাকুর প্রাতে যতি-আশ্রমে। পূজনীয় হরিদাসদা (ভট্টাচার্য্য), ননীদা (চক্রবর্তী), নরেনদা (মিত্র), হরিদাসদা (সিংহ), স্পেন্সারদা প্রমুখ আছেন।

ক্ষিতীশদা (দাস) জামতাড়া থেকে একটি দাদাকে নিয়ে এসেছেন। উক্ত দাদা ইষ্টভৃতি ছেড়ে দিয়েছেন।

শ্রীশ্রীঠাকুর—ইষ্টভৃতি করা খুব ভাল। ইষ্টভৃতি ঠিকমত করলে insurance-এর (বীমার) মতো হয়। ইষ্টভৃতির ফলে ভিতরেও শক্তি সংহত হয়। তাই-ই আমাদের আপদ-বিপদের সময় রক্ষা করে।

এখানে আসা সম্বন্ধে বললেন—ফাঁক পেলেই চলে আসতে হয়। মনে করতে হয়, যেখানে থাক সেইটে তোমার কর্মস্থল, এইটে তোমার বাড়ী।

উক্ত দাদা—ইষ্টভৃতি না করার দরুন এখানে আসতে ভয় ভয় করত।

শ্রীশ্রীঠাকুর—বাড়ীতে আবার ভয়? এতো নিজের বাড়ী। তবে ইষ্টভৃতি করাই লাগে। আর, বাপ-মার উপর খুব ভক্তি রাখাই ভাল। পূর্ব্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা, পিতৃতর্পণ, পিতামাতার সেবা ইত্যাদির সুফল অনেক। ওতে আমাদের ভিতরের instinct (সহজাত সংস্কার)-গুলি nurture (পোষণ) পায়, ফুটে ওঠে। পিতৃপুরুষের সঙ্গে সঙ্গতি নিয়ে ব্যক্তিত্ব স্ফুরিত হ’য়ে ওঠে।

উক্ত দাদা—নানা ঝঞ্ঝাটে পড়ে গিয়েছি।

শ্রীশ্রীঠাকুর—দুনিয়ায় ঝঞ্ঝাট আসবেই। Concentric (সুকেন্দ্রিক) হ’য়ে এই ঝঞ্জাটকে অতিক্রম করাতেই আনন্দ, সার্থকতা, আত্মপ্রসাদ। প্রথমে ঝঞ্ঝাট দেখলে ভয়-ভয় করে। কিন্তু এক-আধটা অতিক্রম ক’রতে পারলে পরে ঝঞ্ঝাট দেখে আনন্দ হয়। তা’ অতিক্রম করার মতো বুদ্ধি আসে, কৌশল আসে, শক্তি আসে, সাহস আসে।

উক্ত দাদা ভাগে ব্যবসা ক’রে অসুবিধায় পড়েছেন।

শ্রীশ্রীঠাকুর—আমার সেইজন্য ভাগে ব্যবসা কারবার পছন্দ হয় না। ভাগে কারবার করার মতো চরিত্র এখনও আমাদের গঠিত হয়নি।

২ রা আশ্বিন, ১৩৫৯, বৃহষ্পতিবার (ইং ১৮/০৯/১৯৫২)

……
শ্রীশ্রীঠাকুর সুরেশবাবুকে কথায় কথায় বলছিলেন—একটু একটু ক’রে নাম ক’রবেন। ওতে বৃহস্পতিকে তাজা রাখবে। ওর অসম্ভব ফল। আর, সংসার প্রতিপালন করবার জন্য আয় করবেন না। আপনার আয়, ঘর-সংসার ইত্যাদি যাবতীয় যা-কিছু বৃহস্পতির জন্য। তাই, আয়ের অগ্রভাগ রোজ বৃহস্পতির জন্য তুলে রাখবেন। যারা এটা ঠিকভাবে করে, তা’রা যে বিপদে-আপদে কেমনভাবে রক্ষা পেয়ে যায়, তার অবধি নেই।
……

২৯শে কার্ত্তিক, ১৩৫৯, শনিবার (ইং ১৫/১১/১৯৫২)

……
এক দাদা প্রশ্ন করলেন—স্বর্গ, ধর্ম্ম, তপ বড়, না দেবতা বড় ?

শ্রীশ্রীঠাকুর—বৈষ্ণবদের কথায় আছে, ভগবান যদি রুষ্ট হন, গুরু তাকে রক্ষা করতে পারেন,কিন্তু গুরু যদি রুষ্ট হন, ভগবানও তাকে রক্ষা করতে পারেন না। ধর্ম্ম মানে যা সত্তাকে ধারণ করে। সত্তাপোষণী আচরণই ধর্ম্ম। সত্তাপোষণী যা যা সবই করা লাগবে। তাই পরিবেশকেও বাদ দেবার উপায় নেই। তাই আমি যজন, যাজন, ইষ্টভৃতির কথা বলেছি। যাজন মানে ইষ্টানুবর্ত্তী হয়ে চলা, নিজেকে তেমনভাবে নিয়ন্ত্রিত করা। যাজন মানে সেবার ভিতর দিয়ে পারিপার্শ্বিককে ইষ্টানুবর্ত্তী করে তোলা। আর, ইষ্টভৃতি মানে ইষ্টের ভরণ। যজন, যাজন, অধ্যয়ন, অধ্যাপনা, দান, প্রতিগ্রহকে ওইভাবে সংক্ষেপ ক’রে দিয়েছি। দেবতা তারাই, যাদের ভিতর দিয়ে বার্ত্তা পেয়েছি। ঋষির বিশেষ গুণ যাতে উদ্ভিন্ন হয়ে সুপ্রকাশিত হয়ে উঠেছে, তাকেও দেবতা বলে। ধর্ম্ম আবার নির্ভর করে আদর্শের উপর। আচার্য্যে সুকেন্দ্রিক না হলে ধর্ম্ম হয় না, আদর্শ, ব্যাষ্টি ও পরিবেশের সার্থক সমন্বয় হয় না। ঐ আদর্শের অবশ্যই বৈশিষ্ট্যপালী আপূরয়মাণ হওয়া চাই। তিনি বিপ্র, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র, হিন্দু, মুসলমান যে যেমনই হোক, সকলেরই বৈশিষ্ট্যানুগ আপূরণশীল হবেন। তাই ধর্ম্ম বড়, কি দেবতা বড় ইত্যাদি প্রশ্নের অবকাশ নেই, সবগুলি জড়িত।
……

৮ই অগ্রহায়ণ, ১৩৫৯, সোমবার (ইং ২৪/১১/১৯৫২)

……
অরবিন্দদা—কাল ইষ্টভৃতি না করায় একটা chain of mistakes (ভুলের শৃঙ্খল) যেন হ’তে লাগল।

শ্রীশ্রীঠাকুর—ইন্দ্রজিৎ ছিল অজেয়। তার মূল ছিল নিকুম্ভিলা যজ্ঞ। কিন্তু যেদিন তার সেই যজ্ঞে ব্যাঘাত হ’ল সেইদিনই তার বিনাশ সম্ভব হ’ল। আমরা যদি তেমনি ইষ্টভৃতি অটুট রাখি, তাহ’লে যেন রক্ষাকবচটা হাতে থাকে। ভোরে উঠে নামধ্যান, ইষ্টভৃতি করে বেরোন লাগে। সেটা আয়ুদ, স্বাস্থ্যদ, সবদিক দিয়েই ভাল। আর, ঐসব করে যখন বেরুলাম, তখন সে বেরুনও হয় তেমনি বেরুন, একেবারে শক্তিসমন্বিত হ’য়ে বের হওয়া।
…….