ইষ্টভৃতি নিয়ে আলোচনা-প্রসঙ্গে ২য় খন্ড

ইষ্টভৃতি নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গের ২য় খন্ডের ১২১, ১৯৮ পৃষ্ঠায় আলোচনা রয়েছে। নিম্নে সেগুলো উল্লেখ করা হলো।

০৬ই পৌষ, ১৩৪৮, রবিবার (ইং ২১/১২/১৯৪১)

ঈষদাদা—ইষ্টভৃতির অঙ্গ হিসাবে ইষ্ট, ইষ্টভ্রাতা ও ভূতগণের জন্য তিনটে আলাদা নৈবেদ্য রোজ বাস্তবভাবে নিবেদন করলে আমার মনে হয় ইষ্টভৃতি ঠিক হয়।

শ্রীশ্রীঠাকুর—ভ্রাতৃভোজ্য ও ভূতভোজ্যও উৎসর্গ করতে হবে ইষ্টপ্রীতিকে লক্ষ্য ক’রে, সবটা মিলে integrated (সংহত) একটা জিনিস। নিজের ভরণের কথা ভাববার আগে আমরা ভাবব আমাদের ইষ্ট, গুরুজন, গুরুভ্রাতা ও ভূতগণের ভরণের কথা, ও বাস্তবভাবে যেজন্য যতটা পারি করব। এর ভিতর-দিয়েই আমাদের মগজে ঢোকে যে, ইষ্টসেবা ও ইষ্টার্থে পরিবেশের সেবাই আমাদের জীবনে মুখ্য। এই চিন্তাটা যদি আমাদের মাথায় ও আচরণে ঢোকে, তাহ’লে কিন্তু দারিদ্র্য, অযোগ্যতা ও অলক্ষ্মী আর সেখানে ঠাঁই পায় না। ইষ্টভৃতি তাই ধর্ম্মের অর্থাৎ জীবন-বৃদ্ধির একটা corner stone (প্রধান ভিত্তি-প্রস্তুর)। ইষ্টভৃতি হিসাবে নিত্য ভোজ্য বা নৈবেদ্য উৎসর্গ করাই বিধি। তবে তা’ রাখা এবং ঐ জিনিসই মাসান্তে ইষ্টস্থানে পৌঁছে দেবার বাস্তব অসুবিধা আছে। তাই ভোজ্যের অনুকল্পে পয়সা রাখা চলে।

ইষ্টভৃতি করার সময় নিত্য ইষ্টভৃতি, ভূতভোজ্য ও ভ্রাতৃভোজ্য যদি আলাদা- আলাদা ক’রে আলাদা তিনটে কোটায় বা ন্যাকড়ায় বেঁধে earmark (চিহ্নিত) ক’রে রাখ, তা’তেও কোন দোষ নেই। সারা মাসে যে বাবদ যেমন নিবেদিত হ’লো, সেই অনুযায়ী মাসের শেষে দেবে। তবে স্মরণ রাখতে হবে ইস্টভরণই মুখ্য, ঐটেই গুঁড়ি, ভূতভোজ্য ও ভ্রাতৃভোজ্য ওরই শাখা। শুধু ভূতভোজ্য ভ্রাতৃভোজ্যের কোন দাম নেই, যদি একজন ইষ্টভৃতি না করে। ইষ্টভৃতির আনুষঙ্গিক হিসাবেই ভূতভোজ্য ও ভ্রাতৃভোজ্য। অবশ্য, ইষ্টভৃতির পূর্ণাঙ্গতার জন্য ভূতভোজ্য ও ভ্রাতৃ-ভোজ্য অবশ্য দেয়। তিনটি আলাদা নৈবেদ্য উৎসর্গ করার প্রসঙ্গেই আমি এত কথা বলছি। আলাদা নিবেদন করা যেতে পারে ব’লে কেউ যেন মনে না ক’রে যে ঐগুলি তুল্য মূল্যের। আলাদা হ’লেও আলাদা নয়, সবটা মিলে ইষ্টভৃতি পূর্ণ হয়, এই যা’ কথা। এবং ভ্রাতৃভোজ্য ও ভূতভোজ্য ইষ্টভৃতি ও ইষ্টপ্রীতিকেই লক্ষ্য ক’রে। প্রত্যেক ৩০ দিনের দিন দক্ষিণা ও সংগঠনী-সহ ইষ্টভৃতি দেওয়াই বিধি। আগে ইষ্টভৃতি দিয়ে বা পাঠিয়ে তার ভ্রাতৃভোজ্য ও ভূতভোজ্য দানের কথা। আবার, কেউ যদি ভ্রাতৃভোজ্য ও ভূতভোজ্য রোজ না রাখে, এবং মাসের শেষে নিবেদিত ইষ্টার্ঘ্য পুরোপুরি ইষ্টস্থানে পাঠিয়ে আলাদা ক’রে ঐটে দেয়, তাহ’লেও চলতে পারে। পরিবেশের সেবার ব্যাপারে আমরা যেন এই concentric (সুকেন্দ্রিক) ধাঁজটা অক্ষুণ্ণ রাখি। তাকেই বলে ইষ্টপ্রাণ সেবা। তার মাধ্যমেই মানুষকে সুকেন্দ্রিক ক’রে তোলা যায়, ইষ্টপ্রাণ ক’রে তোলা যায়। তাতেই মানুষ ত’রে যায়। নচেৎ মানুষের বৃত্তিতে তেল মালিস করাই সার হয়। তুমি নিজেকে উজাড় ক’রে দিয়েও কারও সত্যিকার কিছু করতে পার না। তোমাকে সবাই exploit (শোষণ) করতে সুরু ক’রে দেয়, নিজেদের প্রবৃত্তি-পোষণের জন্য। তা’তে নিজের ও অন্যের খারাপ ছাড়া ভাল কিছু হয় না। ওতে তারাই যোগ্য হয় না, শক্তিমান হয় না, সুনিয়ন্ত্রিত হয় না।

কেষ্টদা—ইষ্টভৃতি ভাল ক’রে পালন যারা করে, তারা এই যুদ্ধে বোমা চাপা পড়বে না?

শ্রীশ্রীঠাকুর—না পড়াই সম্ভব। ভাল ক’রে কিছুদিন এ-সব করলে একটা intuition (অন্তর্দৃষ্টি) develop করে (বিকশিত হয়), তার দরুন আগে থাকতে টের পেয়ে সাবধান হ’তে পারে। James (জেম্‌স্‌) কী বলেছে তো?

শ্রীশ্রীঠাকুর ইঙ্গিত করতেই কেষ্টদার বাড়ী থেকে প্রফুল্ল উইলিয়ম জেমসের Selected Papers (নির্ব্বাচিত নিবন্ধরাজি) বইখানি নিয়ে আসলেন।

কেষ্টদা সেই বই থেকে পড়লেন — Keep the faculty of effort alive in you by a little gratuitous exercise everyday. That is, be systematically ascetic or heroic in little unnecessary points, do everyday or two something for no other reason than that you would rather not do it, so that when the hour of dire need draws nigh, it may find you not unnerved and untrained to stand the test. Asceticism of this sort is like the insurance which a man pays on his house and goods. The tax does him no good at the time, and possibly may never bring him a return. But if the fire does come, his having paid it will be his salvation from ruin. So with the man who has inured himself to habits of concentrated attention, energetic volition and self-denial in unnecessary things. He will stand like a tower, when everything rocks around him, and when his softer fellow-mortals are winnowed like chaff in the blast. অর্থাৎ, মানুষ যদি স্বতঃস্বেচ্ছ আগ্রহে নিত্য তপস্যা-পরায়ণ হয়, শুভার্থে উৎসর্গপরায়ণ হয়, তবে ঐ তপপ্রাণতায় তার মধ্যে এমন শক্তি সঞ্চিত হয় যে, তার বলে সে হেলায় বহু বিপদ, আপদ ও দুৰ্দ্দৈবকে অতিক্রম ক’রে যেতে পারে। যাদের অমনতর তপসঞ্জাত শক্তি নেই, তারা অমনতর অবস্থায় প’ড়ে ধূলিসাৎ হ’য়ে যায়।
…….

৮ পৌষ, ১৩৪৮, মঙ্গলবার (ইং ২৩/১২/১৯৪১)

….[শ্রীশ্রীঠাকুর শিক্ষা বিষয়ক একটি প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন]….এর জন্য অনেকখানি আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হতো। কারণ, আত্মনিয়ন্ত্রণের অভিজ্ঞতা যার নেই, সে অপরকেও নিয়ন্ত্রিত করে নিজের অনুকূল ক’রে তুলতে পারে না। এমনি ক’রে তাদের ব্যক্তিত্ব বেড়ে উঠতো। তাই, আপনারা শিক্ষার মধ্যে ইষ্টভৃতি জিনিসটা ভাল ক’রে ঢুকিয়ে দিতে পারেন এবং ইষ্টভৃতি যদি ছেলেমেয়েরা নিজেদের আহরণের উপর দাঁড়িয়ে করতে অভ্যস্ত হয়, তখন দেখবেন তাদের মাথা কতখানি খুলে যায়। শুধু ইষ্টভৃতি নয়, পিতামাতা ও শিক্ষককে দেওয়াবার অভ্যাসও করতে হয়। মা’র বলা উচিত—ছেলে যা’তে বাবাকে কিছু দেয়, বাবার বলা উচিত— ছেলে যা’তে মা’কে কিছু দেয়। আবার, উভয়ের বলা উচিত ইষ্ট ও শিক্ষককে দেবার কথা। প্রত্যেক বাড়ীতে-বাড়ীতে কিছু-কিছু কুটির-শিল্পের ব্যবস্থা রাখাই ভাল। ছেলেপেলেদের বলতে হয়, তোমরা এমনভাবে কাজ কর, যা’তে তোমাদের কাজের আয়ের উপর দাঁড়িয়ে ইষ্টভৃতি করতে পার। একটু বড় যারা তাদের হয়তো এক কাঠা জমিতে আলুর চাষ করতে দিলেন, দিয়ে বললেন— আলু চাষের নিয়ম-কানুন ভালভাবে জেনে নিয়ে ভাল ক’রে চাষ কর, এই জায়গাটুকুর ফসল হবে তোমাদের ঠাকুর-পূজার অর্ঘ্য। এমনিভাবে ছেলেবেলা থেকে দায়িত্ব নিয়ে শ্রেয়ের জন্য যদি পরিশ্রম করতে শেখে, লাভজনকভাবে কাজ সুসম্পন্ন করতে শেখে, তাতে যে অভিজ্ঞাতা জন্মাবে, যে আত্মপ্রত্যয় জন্মাবে, তা’ পরীক্ষা পাশের থেকে ঢের দামী।
…….