ইষ্টভৃতি নিয়ে আলোচনা-প্রসঙ্গে ৭ম খন্ড

ইষ্টভৃতি নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গের ৭ম খন্ডের ৬১, ৭৭, ১৮২, পৃষ্ঠায় আলোচনা রয়েছে। নিম্নে সেগুলো উল্লেখ করা হলো।

২০শে মাঘ, ১৩৫২, রবিবার (ইং ০৩/০২/১৯৪৬)

….
রাজেনদা—আশীর্ব্বাদ করুন, যেন আমি অবিচলিতভাবে আপনার নিৰ্দ্দেশমত চ’লে দেশের, দশের মঙ্গল করতে পারি।

শ্রীশ্রীঠাকুর—আমিও তো তাই-ই চাই।

যোগেনদার সঙ্গে ইষ্টভৃতি-সম্বন্ধে কথা উঠতে বললেন—ইষ্টভৃতি হ’লো material devotion and concentration (বাস্তব ভক্তি এবং একাগ্রতা), সেইজন্য সেটা সকলের আগে।

রাজেনদাকে বললেন——ইষ্টভৃতি করবেই, অমন জিনিস আর হয় না।

রাজেনদা—হ্যাঁ!

খগেনদাকে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন—কি রে, কী খবর?

খগেনদা—করতেছি।

শ্রীশ্রীঠাকুর (হেসে বললেন) — করতেছি করতেছি তো ক’স, ‘কাম সারা ক’রে ফেলিছি’—সে কথা তো ক’স না। সেই কথা শোনার লোভেই তো অতবার জিজ্ঞাসা করি।

খগেনদা (সহাস্যে)—তাড়াতাড়িই সে-কথা বলতে পারব, আশা করি।

শ্রীশ্রীঠাকুর—আচ্ছা।…… আমার যে বুদ্ধিই অন্যরকম। ভাবি, কাজ ধরব তো শেষ করব। মন্তরের মত কাজ হ’য়ে যাবি, সুন্দর হবি, নিখুঁত হবি।
…….

২৬শে মাঘ, ১৩৫২, শনিবার (ইং ০৯/০২/১৯৪৬)

………
শরৎদা—ইষ্টের অবর্ত্তমানে কোথায় ইষ্টভৃতি দিতে হবে?

শ্রীশ্রীঠাকুর—ইষ্টের ঔরসজাত সন্তান যদি ইষ্টবাহী হয়, সেখানে ইষ্টভৃতি দেওয়াই শ্রেয়।

শরৎদা—জীবন্ত আদর্শ তো সব সময় থাকেন না, সে-সম্বন্ধে করণীয় কী?

শ্রীশ্রীঠাকুর—তাঁর অনুবর্ত্তী আচরণশীল শ্রেয় কাউকে গ্রহণ করলেও চলতে পারে। তবে তাঁর ঐ মূল আদর্শের প্রতিষ্ঠা করা চাই। নচেৎ তাঁকে আদর্শানুরাগী বলা যাবে না। যীশুর মধ্যে পার্ষদরা সবাই আছেন, কিন্তু পার্ষদদের মধ্যে যীশুর সবখানি নেই কিন্তু।
…..

৭ই বৈশাখ, ১৩৫৩, শনিবার (ইং ২০/০৪/১৯৪৬)

….খেপুদা—দেশে তো আজ কত party (দল), এদের ভিতর আবার কত পার্থক্য।

শ্রীশ্রীঠাকুর—এক-একটা party (দল) বা ism (বাদ) যেন এক-একটা organ (অঙ্গ), এইগুলিকে নষ্ট না ক’রে, আদর্শপ্রাণতার সঞ্চারণায় সমুন্নত ক’রে সবগুলিকে মিলিয়ে একটা organism (সজীব দেহ) গ’ড়ে তোলাই তোমাদের কাজ। তোমাদের এটাকে বলা যায় Indo-Aryan Soviet Socialist Republic (আর্য্যভারতীয় সমাজতান্ত্রিক সঙ্ঘ-সমন্বিত প্রজাতন্ত্র)। যজন, যাজন, ইষ্টভৃতি ও সদাচার হ’লো common factor (অভিন্ন উপাদান), প্রত্যেক organisation (সংস্থা) -এর তাদের principle (আদর্শ)-অনুযায়ী এটা আছে। তাদের unit (একক) হয়তো আলাদা। শুনতে গেলে কান দিয়েই শুনতে হবে, দেখতে গেলে চোখ দিয়েই দেখতে হবে, খেতে গেলে মুখ দিয়েই খেতে হবে—মানুষ, জীব, জন্তু সবার বেলায় এটা সাধারণ নিয়ম। যজন মানে আদর্শ-অনুযায়ী চিন্তা ও অভ্যাসকে গঠিত করা; যাজন মানে পারিপার্শ্বিকের ভিতর ইষ্টের সঞ্চারণা; ইষ্টভৃতি মানে ইষ্ট বা আদর্শের বাস্তব পালন, পোষণ ও প্রবর্দ্ধন। যজন হ’লো psychical devotion (মানস তপস্যা), যাজন হ’লো psycho-physical devotion (মানস দৈহিক তপস্যা), ইষ্টভৃতি হ’লো physical devotion along with will (ইচ্ছা-সমন্বিত শারীর তপস্যা)। দৈনন্দিন প্রাতঃকালীন ঐ love-offer (প্রীতি-অবদান)-ই হ’লো first push of duty (কর্তব্যের প্রথম প্রেরণা)। তোমার being (সত্তা) যেন ইষ্টে বাস্তবভাবে concentrated (একাগ্র ) হ’য়ে, রথী হ’য়ে নামলো তোমার প্রতিদিনকার জীবন-রথ চালনা করতে। মানুষের ঠাকুর থাকলে তার সব থাকবে, জীবন থাকলে শরীর থাকবে। ইষ্টস্বার্থ বজায় রাখবার দায়িত্ব, নিজেকে বাঁচাবার দায়িত্বের মত অকাট্য। অস্তিত্বকে অক্ষুণ্ণ রাখার precondition (প্রাকসর্ত্ত)-ই হ’লো ঐ।

আমরা ইষ্টভৃতি করি to maintain our principle—the Ideal—the Beloved (আদর্শকে, ইষ্টকে, প্রেষ্ঠকে পালন করতে)। Centre (কেন্দ্র)-কে strong (শক্ত), intact (অক্ষুণ্ণ) ও exalted (উন্নত) ক’রে রাখতে হবে। সবাইকে দিয়ে centre (কেন্দ্র)। সবাই centre (কেন্দ্র)-কে দেখবে, centre (কেন্দ্র) সবাইকে দেখবে। গীতায় কী যেন আছে?—পরস্পরং ভাবয়ন্তঃ।

কেষ্টদা বললেন—
‘দেবান্ ভাবয়তানেন তে দেবা ভাবয়ন্তু বঃ
পরস্পরং ভাবয়ন্তঃ শ্রেয়ঃ পরমবাপ্ স্যথ।’ ৩।১১

(এই যজ্ঞ দ্বারা তোমরা দেবতাগণকে সম্বর্দ্ধনা কর, এবং দেবতাগণও তোমাদের সম্বর্দ্ধনা করুন। এমনতর পারস্পরিক সম্বর্দ্ধনা দ্বারা তোমরা পরম মঙ্গল লাভ করবে)।

শ্রীশ্রীঠাকুর—Centre (কেন্দ্র) দেবে nurture (পোষণ)। খ্রীষ্টানরা বলে mercy (দয়া), bliss (আনন্দ)। Centre (কেন্দ্র)-এর duty (কৰ্ত্তব্য) হ’লো সবাইকে vitalise (সঞ্জীবিত) করা—প্রত্যেকটা individual (ব্যষ্টি)-কে বিশিষ্ট-ভাবে। তার জন্য তোমাদের তপস্যাপরায়ণ হ’তে হবে— ইষ্টস্বার্থপ্রতিষ্ঠাপরায়ণ হ’য়ে passion (প্রবৃত্তি)-এর সওয়া হাত উপরে থাকা লাগবে, নইলে nurture (পোষণ) দেবার বাহানা করতে পারে, সেই বাহানায় জল ঘোলা করতে পার, কিন্তু প্রকৃতপ্রস্তাবে কাউকে কোন nurture (পোষণ) দেবার যোগ্যতা অর্জ্জন করতে পারবে না।

…..যাজনমুখর মানুষগুলি germ-cell (বীজকোষ)-এর মত। তারা generator (উৎপাদক)-এর কাজ করে। ইষ্টহীন পরিবেশের মধ্যে ইষ্টমুখী নূতন জীবন গজিয়ে তোলে। এরাই হ’লো জাতির উন্নতির জনক। তাই প্রত্যেকটি সৎসঙ্গী যাতে যাজনে অভ্যস্ত হ’য়ে ওঠে, তা’ তোমাদের করাই চাই। দীক্ষার পরে একটা মানুষকে যখন যাজনশীল ক’রে তুলতে পারলে, তখন বুঝলে কিছু করা হ’লো। যাজন যে করবে, তার যজন ও ইষ্টভৃতি করাই চাই।