ইষ্টভৃতি নিয়ে দীপরক্ষী ৬ষ্ঠ খন্ড

ইষ্টভৃতি নিয়ে দীপরক্ষী ৬ষ্ঠ খন্ডের ১৫১, ৩০০, ৩০১ পৃষ্ঠায় আলোচনা রয়েছে। নিম্নে তা দেয়া হলো।

২৬শে ফাল্গুন,১৩৬৬ বৃহস্পতিবার, (ইং ১০/০৩/১৯৬০)


সন্ধার পর বহিরাগত একটি দাদা এসে বললেন—আমি ঠিকমত ইষ্টভৃতি করতে পারছি না, পাঠাতেও পারছি না।

শ্রীশ্রীঠাকুর—ওরে পাগল! ওটা তুই তোর ইষ্টকে খেতে দিস্। তোর স্বস্তি-যজ্ঞ। সেজন্যে ভোরে উঠে প্রথমেই ওটা করা লাগে।

উক্ত দাদা—এতদিন যে পাঠাই নি, সেজন্য কী করতে হবে?

শ্রীশ্রীঠাকুর—প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়। হবিষ্য করা লাগে। তা’ও কেষ্টদার কাছে শুনে নিস্।
……

২৬শে বৈশাখ,১৩৬৭ সোমবার, (ইং ৯/৫/১৯৬০)

….
শরৎদা—অনেকের ধারণা, ইষ্টভৃতি ঠাকুরের একটা আয়ের পথ।

শ্রীশ্রীঠাকুর—যার উপর টান হয়, তার জন্য করা আপনা থেকেই আসে। ধরেন, আপনার ছেলে হয়েছে। বৌ ক’চ্ছে, ছেলের জন্য দুধ যোগাড় করতে হবে। তখন দুপুর রোদে ঘটি হাতে করে বেরোলেন, কোথা থেকে দুধ দিয়েও এলেন, কেন এটা করলেন? আপনি তো বলতে পারতেন, ‘মাগী! তুইই তো ছাওয়াল বিয়োইছিস্! আমি দুধ জোগাব ক্যা?’ এই কথা ক’য়ে বাপ যদি সরে দাঁড়ায় তাহলে ছাওয়াল তো অক্কা পাবে। আর, আয়ের পন্থা কচ্ছেন! যদি কওয়া যায়, মা মাগী ছাওয়াল বিয়োয়ে একটা আয়ের পথ ক’রে নেছে, তাহলে কেমন হয়?

পারিজাতদা—তাহলে টান এলেই তো সব কিছু হয়ে গেল!

শ্রীশ্রীঠাকুর—ওরে পাগল! বুঝিস্ নে? ছাওয়াল তোর, কিন্তু হইছে তোর বৌর পেটে। তোর পেটে ব্যাথাও হয়নি, রক্তারক্তিও হয়নি। কিন্তু ঘরের মধ্যে থেকে তোর বৌ চেঁচাচ্ছে। ঐ চেঁচানিই তোকে কান ধরে নিয়ে যেয়ে দুধ এনে দেবে নে। আবার হয়তো ছাওয়ালের পেট খারাপ করেছে, তখন ভাবছ, ‘কী করব! যাই হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার ঐ বিশুর কাছে।’ তারপর সেখানে যেয়ে ওষুুধ এনে দিলে। এত সব কর কেন? মূলে আছে ঐ বৌর উপর টান, ছেলের উপর টান—সেই নিষ্ঠা-আনুগত্য-কৃতিসম্বেগ। আর, তার সাথে আছে volition (উদ্যম)।

পারিজাতদা—এ সবই তো existence (অস্তিত্ব) বজায় রাখার জন্য?

শ্রীশ্রীঠাকুর—existence-এর (অস্তিত্বের) দুটি factor (উপাদান)—একটা বাঁচা, আর একটা সমীচীনভাবে বাড়া। সমীচীন ক’লেম কেন? তার মানে, আমি এমনভাবে বাড়তে চাই নে যাতে আমার বাঁচাটা ব্যাহত হতে পারে। থাকাটাকে বজায় রাখার জন্য পরিবেশকেও সেইভাবে adjust (নিয়ন্ত্রিত) করা দরকার। কারণ, আমরা বাঁচি পরিবেশের compassion-এর (অনুকম্পার) ভিতর দিয়ে। তোমার পরিবেশের মানুষগুলির উপর তুমি যেমন compassionate (অনুকম্পী), এরাও তোমার উপর তেমন। পারস্পরিক এই করা এবং বোধ ছাড়া আমরা বাঁচতেই পারি না। বাপ-মা আমাদের জীবনের prime factor (প্রধান অবলম্বন)। তাঁদের উপর ভক্তি রেখে সবাইকে adjust (নিয়ন্ত্রিত) করব—পশুপক্ষী, পরিবার, পরিজন, সব যা-কিছুকে। আর, সব সময় দেখব, তারা কি ক’রে সুখী থাকে, বেঁচে থাকে! এই যে বনে যাওয়ার একটা কথা আছে। আমি ও বুঝি না। একটা cell-এ (কুঠুরিতে) একা থাকলেই যদি মানুষ পাগল হয়ে যায়, তাহলে বনে গেলেও তা’ হয়। বাঁচতে হলে মানুষের পরিবেশ চাই-ই। আমার চাহিদা কী? আমি বেঁচে থাকব, সবাইকে নিয়ে বেঁচে থাকব। এর মধ্য দিয়ে উপভোগ করব আমার পরমপুরুষকে। এমনতর হয়ে উঠলে তুমি scientist (বৈজ্ঞানিক) হওয়ার প্রথম ধাপে আসবে।

পারিজাতদা—এ করলে কি পরমপুরুষ আমাকে shelter (আশ্রয়) দেবেন?

শ্রীশ্রীঠাকুর—(সস্নেহ ভর্ৎসনার সুরে) পাগল—! পরমপুরুষ মানে the best fulfiller (সর্বোত্তম পরিপূরক)। এই প্রফুল্ল! ইষ্টভৃতি সম্বন্ধে রবি ঠাকুরের কথাগুলি পারিজাতকে শোনালে হয়।

প্রফুল্লদা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শান্তিনিকেতন’ বইটা নিয়ে এলেন এবং সেখান থেকে ‘ত্যাগের ফল’ প্রবন্ধটা পড়ে শোনালেন। শোনার পরে পারিজাতদা প্রশ্ন করলেন—ইষ্টভৃতি করলে আমরা অনেক আপদ থেকে যে রক্ষা পাই, সেটা কি আমাদের ভেতরের intuition (প্রজ্ঞা) জাগ্রত হওয়ার জন্য, না বাইরের কোন factor (ব্যাপার) আছে এর মধ্যে?

শ্রীশ্রীঠাকুর—ভেতরে হয় বলে বাইরেও তার ক্রিয়া দেখা যায়। অনুরাগসহ ইষ্টভৃতি করলে energetic volition (উদ্যমী ইচ্ছাশক্তি) জাগে, আসে discerning capacity (নির্ব্বাচনী দক্ষতা)। তখন তুমি একটা বিষয় টক ক’রে ধরে ফেলতে পার, কী দিয়ে কী হতে পারে তার মরকোচটা তোমার বোধের মধ্যে এসে যায়। কিন্তু ঐরকমটা পাওয়ার বুদ্ধি ক’রে ইষ্টভৃতি করতে যেও না। ছেলেকে যেমন ক’রে খাওয়াও, তেমন টান নিয়ে ইষ্টভৃতি করতে হয়।

পারিজাতদা—কিন্তু ঠিকমত ইষ্টভৃতি ক’রে হয়তো কেউ কোথাও কোথাও ভুল করে ফেলছে, এমনও তো হয়!

শ্রীশ্রীঠাকুর—এক জায়গায় পারল, আর এক জায়গায় পারল না কেন, সেটা তুমি বের কর। তুমি তো scientist (বিজ্ঞানী)। তোমার উপরেই ওটা থাক্।

পারিজাতদা—আপনি যদি কারণটা বলে দেন—।

শ্রীশ্রীঠাকুর—দেখ, প্রফুল্ল যদি তোমার সব অঙ্ক কষে দেয়, তুমি কি তাতে কখনও অঙ্ক শিখতে পারবে? আমার কথাও তাই। তুমি অনুসন্ধান ক’রে বের কর। তাতে তোমার জানাটা হবে, তোমার intelligence (বোধ) বাড়বে। Pupil (ছাত্র) মানেই ঐরকম হওয়া। তখনকার দিনের ছাত্ররা গুরুর কাছে থাকত, তাঁর নির্দ্দেশ মেনে চলত। যে education-এর (শিক্ষার) কথাই ধর না কেন, সবার মূলেই আছে পরাক্রমী ইষ্টনিষ্ঠা, আনুগত্য ও কৃতিসম্বেগ।
…..