বৃত্তিধর্ম্ম নিয়ে অনুশ্রুতি ১ম খন্ড (১০১-১৪৩)

অনুশ্রুতির ১ম খন্ডে “বৃত্তিধর্ম্ম” শিরোনামে পৃষ্ঠা ১৫৫ – ১৭৮ পর্যন্ত মোট ১৪৩ টি বাণী রয়েছে। ১০১ – ১৪৩ নং বাণীসমূহ নিচে দেয়া হলো।

কাম যেখানে কামিনী চায়
কামোদ্দীপ্তি নিয়ে,
লাঞ্ছনারই মাল্য তাহার
লাগে কণ্ঠে গিয়ে। ১০১।
প্রেষ্ঠ-সাশ্রয় গলা কেটে
নিত্য পূজো তোরই করিস্,
তা'রই ফলে ঘোর অনটন
তা' কি তুই এড়াতে পারিস্ ? ১০২।
পূর্ব্বঋষি স্বীকার অছিলায়
বলে পরবর্ত্তী নাই,
বোকা অন্ধকার আবাস তা'দের
ইহপরকালে ছাই। ১০৩।
বৃত্তি-ঠোকা উত্তেজনা
স্বার্থ সাধার তরে,
ঠোকরে সব ছিটকে দিয়ে
ক্রোধে ভাঙন ধরে। ১০৪।
স্বার্থ-কুটিল হামবড়াই যা'র 
অন্তরে দেছে হানা,
বৃত্তিতন্ত্রী বেকুব চালাক
সন্দেহে চোখ কানা। ১০৫।
ইষ্টার্থেতে ভিক্ষা ক'রে
ইষ্টে করে না নিবেদন,
দরিদ্রতায় হা ক'রে খায়
নিপাতে যায় ধন আর জন। ১০৬।
বৃত্তিগুলো সত্তাটাকে
টুকরো ক'রে ছিঁড়েই খায়,
প্রেষ্ঠপ্রাণ হ'লে কিন্তু
ও-সব হ'তে রেহাই পায়। ১০৭।
কামদীপনী হাবভাব আর
তেমনি অধ্যয়ন,
যতই রঙ্গিল হোক্ না জানিস
কামুকই সেই জন। ১০৮।
বাধ্য-বাধকতা যেথায়
ঝোঁকটি কাবু করে,
বৃত্তিটানের ডাইনী মায়া
অমনি চেপে ধরে। ১০৯।
আত্মমুখী উত্তেজনা
পূরে না অন্যেরে
নিজের চাওয়ায় পাগলপারা
অন্ধ ব্যর্থ সে রে। ১১০।
ব্যর্থ কামের তৃষ্ণা নিয়ে
ব্যথী অনুরাগ সুরে,
কুশ্রীবেশে ভূতের মত
ফিরিস্-বেড়াস্ ঘুরে,
সহানুভূতির উদ্দীপনায়
আনতে নজর লোকের,
নিঠুর-নিরাশ কাম ভজনায়
স্বভাব হ'ল প্রেতের। ১১১।
বৃত্তি-অহং পুষ্টি তরে
মতবাদের তুই তো জোঁক,
মতের প্রতীক পূজলি না রে
পূজলি বেকুব বৃত্তি-ঝোঁক;
পণ্ডিতী হীন হাতের নাড়ায়
করছিস্ বকছিস্ কত কী,
হারালি সব যতেক বিভব
নষ্ট হ'ল তোদের ধী। ১১২।
বৃত্তিরফায় জাত-গরিমা
ডোবালি আত্মপ্রতিষ্ঠায়,
দধীচি-অস্থি বজ্র-নিঠুর
ছাড়ে কি তাহারে? নিপাত দ্যায়! ১১৩।
পূর্ব্বতন আপ্তধারা 
না দেখে না পেয়ে তোর,
তাঁ'দের প্রতি টান-অছিলায়
বৃত্তিসেবায় রইলি ঘোর,
বৃত্তিধৰ্ম্ম দোহাই দিয়ে
কত রং-ঢং লাগিয়ে গায়,
বর্তমান প্রেরিত যিনি
পড়লি নাকো তাঁ'রই পায়;
হচ্ছিস্ সাবাড়, করছিস্ কাবার
পয়মালেতে যাচ্ছিস্ কত,
এখনও ফের, জীবনের জের
ভাঙ্গিস্ না রে, হ'স্ না হত। ১১৪।
বৃত্তি-রংএ রঙ্গিল যদি 
সপর্য্যায়ে অহঙ্কারে,
বৃত্তিগুলি বিন্যাসিত
দক্ষক্রিয় অহংভারে,
রজোগুণে দীপ্ত মানুষ
তা'কেই আদত জেনে রাখিস,
বৃত্তি-অহং-বিক্ষিপ্ত যা'
রজ নয় তা' ঠিকই বুঝিস্। ১১৫।
পরের পুষ্টি কেড়ে নিয়ে
শোষণ-নীতির আত্মপোষণ,
প্যাঁচোয়া জালে লোক-সমাজে
ইষ্টভ্রষ্ট ক'রে যখন,
আপদ-বিপদ-উচ্ছৃঙ্খলা
গজিয়ে তেমনি বিশৃঙ্খলে,
একগাট্টায় মরিয়া হ'য়ে
ধায়ই 'যুদ্ধং দেহি' ব'লে । ১১৬।
জীবন-স্বপন ফস্কে গেল
লাভ হ'ল কী তোর,
ভাবনা-মাফিক করলি নে কাজ
রইলি রে বিঘোর ! ১১৭।
খামখেয়ালী ধরলি খেয়াল
সার্থকতায় চললি না,
করণ-প্রবণ ধরন-ধারণ
উৎসাহকে ধরলি না;
ঠগীর ঝুলে ঠকলি কেবল
পেলি শুধুই বঞ্চনা,
চলতিস্ যদি সৎ-চলনে
অভাব-টভাব রইত না। ১১৮।
করবি নাকো, চাইবি শুধুই
করবি আপসোস্ নাইকো কেউ,
পেঁচি বেকুব স্বার্থ-অন্ধ
বেড়াল ডাকিস্ মেউ-মেউ । ১১৯।
দক্ষ যা'রা অহঙ্কারে
ফুলে-ফেঁপে নিত্যদিন,
লোকগুলি সব পেলে-পুষে
ভাবছে মনে খুব প্রবীণ। ১২০।
তক্ষকী ঐ তকতকে ডাক
লকল'কে চায় প্ররোচিতে,
ছলছলে তোর উপচোলো লাল
ছুটলি দরণ বরণ দিতে;
বিষের ছুরি ওই দেখিস্ না
লুকিয়ে রেখে আড়ালফাঁকে?
হানবে বুকে মরবি ওরে
প্রাণটা দিবি দুর্ব্বিপাকে ! ১২১।
মান-গরবে অহংবশে 
ধরলি রে ধাঁজ বেকুব চতুর,
চলনে তোর দিগগজী ভাঁজ
দেখতে যেন ক্ষিপ্ত কুকুর। ১২২।
আপন মায়ে ভক্তি ফোটে না
ভক্তি পরের মায়ে,
ভক্ত জানিস্ কারুর ন'স্ তুই
ফিরিস বৃত্তিদায়ে। ১২৩।
মা-মাসী-বোন নিজের যা'রা
টান মোটে নাই তা'র প্রতি,
পরের মা-বোন, পরের মাসী
নিয়েই যাহার সঙ্গতি,
মত্ত অলীক অজান বেকুব
বুঝেও বুঝতে চায় না যে,
অবাধ্যকাম অজানভাবে
ধরছেই, টের পায় না সে। ১২৪।
বৃত্তি-নেশায় বেভুল অহং
ওতেই ভরা কল্পনা,
ওইটি জানিস্ তমোগুণের
নিপট নিঠুর লক্ষণা। ১২৫।
পরের কওয়া চর্চ্চা-কুটিল
রোধেই যাহার প্রেষ্ঠানতি,
বৃত্তিরতির কৃতঘ্নতার
বেড়াজালেই তাহার গতি। ১২৬।
বেগোছাল জিনিসপত্র 
ঢিলে ব্যবস্থিতি,
এই দেখলেই বুঝতে পারবি
কেমন বৃত্তিরীতি। ১২৭।
মেয়ে দেখলেই ভিড়ে পড়ে
দরদ-সেবায় কাটায় দিন,
পুরুষ-সঙ্গের নাইকো সময়—
সন্দেহের সে, মতিহীন । ১২৮।
হীন যা'রা সব চক্র-কুটিল
স্বার্থ-নেশায় শেয়াল ডাকে,
বিষ হানি' ঐ মৃত্যু তা'দের
ছিটকিয়ে আন্ আর্য্যী হাঁকে । ১২৯।
বৃত্তিগুলি ব্যক্তিত্বে তোর 
হর খেয়ালে খেলছে ভাটা,
কত নাচনে নাচছিস্ রে তুই
হিসেব ক'রে দেখলি সেটা?
বাঁদর-নাচন নাচলি কত
বাহাবাও কত পেলি বাতুল,
ভাবছিস্ তুই মস্ত মানুষ
কেউ কি আছে তোর সমতুল?
পাগল-বেকুব ওরে দিগগজ
খতিয়ে কি দেখলি তায়,
প্রেষ্ঠস্বার্থী টান ছাড়া কি
অখণ্ডতা তোর গজায় ? ১৩০।
নারীর খেয়াল করতে তামিল
চলছিস্ কি ক'রে নিয়ত,
ইষ্টনীতি চুলোয় গেল
করতে তা'রেই অনুগত?
কলুর বলদ হ'য়ে নারীর
তুষ্টি-সেবায় মন দিলি,
নিজেরে তুই করলি খতম
তা'কেও সাবাড় ক'রে নিলি। ১৩১।
কামপ্রার্থী হ'য়ে জানিস্ 
বৃত্তিবিনোদী যা'রা,
তা'দেরই বলে কোটনা লম্পট
ঘৃণ্য পুরুষ-ধারা। ১৩২।
সাশ্রয়ী স্বাবলম্বী হয়ে 
রাখ সবারে বৃদ্ধিতে,
রক্তচোষা বৃত্তি বাদুড়
তাড়িয়ে দে, তাড়িয়ে দে। ১৩৩।
জীবন-জনম মুহ্যমান
নীতির পথে রইলি ভোর,
তাড়া ওরে নেকড়েগুলো
হিংস্র-লোলুপ ওরাই চোর। ১৩৪।
স্বীকার করা দূরে থাকুক
ভাল চাওয়ায় চললি কেউ?
বিবর্দ্ধনের ভয়েই বুঝি
হ'পকে ডরে ডাকিস্ ফেউ। ১৩৫।
জীবন-জোয়ার এলো রে তোর
স্নান ক'রে নে যত পারিস,
বৃত্তিবাদী হাঙ্গর-কুমীর
কামঠগুলোয় খেয়াল রাখিস্ । ১৩৬।
নিজের ছেলে-মেয়ে আরও
তা'দেরই সন্তান-সন্ততি
পুষছিস্ কিন্তু চাপে ও সুখে
ও হ'তে নাই অব্যাহতি;
প্রেষ্ঠ-প্রয়োজনের বেলায়
দিতে তাঁ'রে শিথিল হ'লি
সব অভাবেই চলছিস্ যদি
তাঁ'র বেলাতেই থমকে র'লি;
এতেও ভাবিস্ পাবি রে তুই
লক্ষ টাকা মাণিক-হীরা,
লক্ষ্মীরে তুই ঠেললি দূরে
রইলি তা'তেই হাভাতঘেরা। ১৩৭।
ইষ্টপ্রতীক জড়প্রতীকে 
চেতনপ্রতীক রাখলি ক'রে,
প্রতীক ছাড়া প্রতিভা কি
উৎসৃজি' গুণ রাখে ধ'রে?
চেতন প্রতীক থাকলে তবেই
প্রতীক তাহার প্রতিভা পায়,
চিত্তহারা জড়প্রতীকে
তাঁ'য় কি কভু পাওয়াই যায়?
বন্ধপাগল সৃষ্টিছাড়া
ওরে অবোধ নিপট পাপ,
বৃত্তিবাধায় নিরোধ ক'রে
বীর্য্য হেঁকে ভাঙ্গ প্রলাপ। ১৩৮।
এলোমেলো বইছে হাওয়া
তরঙ্গ কী নাচছে ছলে,
ছুটলি ওরে দিতে পাড়ি
নাই ধ'রে হাল যুক্তি-বলে;
তরণী তোর তাল-বেতালে
হাওয়া-জলের আঘাত খেয়ে,
ডুবেই যাবে ভাব্ এখনও
কী নিয়ে তুই যাবি বেয়ে!
ছলাৎ ঝলাৎ ঘূর্ণী জলের
বৃত্তিপাকের তল্ছা টান,
পারবি না রে সামাল দিতে
ফের্ রে যদি রাখবি প্রাণ। ১৩৯।
প্রেষ্ঠস্বার্থের নাইকো ধান্দা
পূরণ-প্রবণ নয়,
দেখতে দক্ষ নিপুণ কৰ্ম্মী
আড়ম্বর-বাক্ কয়;
ভাঁওতা দিতেই বুদ্ধিমত্তা
খরচ বহুল, স্বল্প আয়,
সাশ্রয়ী সুন্দর নয় প্রকৃতি
লভো নিছক ক্ষয় ঘটায়;
দেখলে এমন দূরেই থাকিস্
থাকতে যদি চাস্ বজায়,
কথার হাওয়ায় রক্ত চোষে
যাসনে রে তুই ওর ছায়ায় । ১৪০।
সুখ-সুবিধা ভোগ-বাসনা
বৃত্তিস্বার্থ সেবার তরে
ফাঁকি দিয়ে গুরুর জিনিস
যে-জন গোপন হরণ করে,
দৈন্য-ব্যাধি ঘৃণ্যাকারে
বিপাক নিয়ে ঘেরেই তা'রে,
ব্যাধির প্রকোপ অপমানে
বংশে অকাল মরণ ধরে । ১৪১।
নারীর পায়ে মাথা বিকিয়ে
গুরুর দায়টি দিয়ে চলে,
কপট উদ্যোগী এমনদেরই
দৈন্য বিপাক ফলেই ফলে। ১৪২।
হৃদয় যদি আশ্রয় পায় 
প্রিয়-প্রীতির কোলে,
সব-কিছু তার সার্থকে ধায়
উল্লাস-পায়ে চলে । ১৪৩।