অনুভব কর, …ঈশ্বরপ্রেমে।-ব্যাখ্যা

সত্যানুসরণ -এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

অনুভব কর, কিন্তু অভিভূত হ’য়ে প’ড় না, তা’ হ’লে চ’লতে পারবে না। যদি অভিভূত হ’তে হয় তো ঈশ্বরপ্রেমে।

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

প্রদীপ পাল আলোচনা করার নির্দেশ পেয়ে বাণীটি আর একবার পাঠ করে বলল—অভিভূত মানে আকৃষ্ট। ঠাকুর কারো দুঃখ দেখে আকৃষ্ট হতে বারণ করছেন।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—কক্ষনো না। কারো দুঃখ দেখে আকৃষ্ট হতে বারণ করেছেন?

প্রদীপ নিরুত্তর। শ্রীশ্রীপিতৃদেব—অনুভব মানে কি?

প্রদীপ ঠিক মত বলতে না-পারায় বললেন—আর কে পড়েছে?

সুনীলদা (বিশ্বাস) জানালেন—গোবিন্দ (বিশ্বাস)।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব (গোবিন্দকে)—অনুভব মানে কি?

—পশ্চাতে হওয়া।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—সেটা কেমন?

—আমি কোন কাজ করলাম। সে কাজটা অনুভব করলাম, বুঝলাম।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—কী কাজ, কী অনুভব করলি? আগুনে হাত দিলি, পুড়ে গেল, সেটা অনুভব করলি?

—আজ্ঞে, বই পড়লাম, বই পড়ে জানলাম। তাতে যদি অভিভূত হয়ে পড়ি, আকৃষ্ট হয়ে পড়ি—

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—বই পড়ে, ভাল বই—আকৃষ্ট হলাম, তাতে কী হল? পাশে রাখা অভিধান থেকে অভিভূতের অর্থ দেখিয়ে বললেন—অভিভূত মানে পরাভূত হওয়া, বিহ্বল হওয়া, আচ্ছন্ন হওয়া ।এমনই Strong অনুভব—যাতে অভিভূত হয়ে গেল। দেখিস না অনেকে রক্ত-টক্ত দেখে হতাশ হয়ে যায়। ইঞ্জেকশন দিতে দেখে মনে করে আমাকেই দিচ্ছে। একটা সাপ দেখল, যাচ্ছে হয়তো। মনে করল আমাকে কামড়াল, ভাবতে-ভাবতে আর যেতে পারল না, আর নড়তেই পারল না। বাঘ, ভালুক দেখলেও ও-রকম হয়, ভয় আসে। এত অনুভব করে যে সমস্ত শরীর আচ্ছন্ন, অভিভূত হয়ে পড়ে। সেজন্য ঠাকুর বলছেন, যদি অভিভূত হতে হয় তো ঈশ্বরপ্রেমে।

আবার এই প্রসঙ্গেই বললেন—তোর বন্ধুর বাড়ি গেলি, দেখলি বন্ধুর মাথায় জল দিচ্ছে—মা, বাবা কাঁদছে। তখন এত অভিভূত হয়ে পড়লি আর ডাক্তার ডাকতে গেলি না। তেমনি ভূত আছে কিনা তার ঠিক নাই, ছায়া দেখে ভূতের আগমন মনে করে ফিট্‌ হয়ে পড়ল। সেইজন্য ঠাকুর বলেছেন—অনুভব কর, কিন্তু অভিভূত হয়ো না। ঠাকুর বলছেন—ঈশ্বরকে অনুভব কর, আর তাতেই অভিভূত হও। এতে দীর্ঘায়ু হয়, অবোধের বুদ্ধি খোলে ও nerve (স্নায়ু) শক্ত হয়। বাজে জিনিসে অভিভূত হলে শক্তি বাড়ে না, ক্ষয় হয়—আর বাড়তে পারে না।

[ পিতৃদেবের চরণপ্রান্তে/তাং-২১/৬/৭৯ ইং ]

রতন বৈদ্যদা—অভিভূত কথার মানে মোহগ্রস্থ হওয়া?

শ্রীশ্রীবড়দা—অনুভব করা মানে আমার senseটা develop করা। সমাধি হল কারও, তা’তে বাহ্যিক চৈতন্য লোপ পেয়ে যায়। আর একজন সৎভাবে সারাদিন পরিশ্রম করল, সেও বাহ্যিক জ্ঞান হারাল। Sound Sleep হল তার। বাহ্যিক চেতনা থাকল না। একজন অন্ধকারে বিলীন হল। আর একজনের অন্তর আলোকিত হল। আবার কেউ হয়ত কাউকে কাঁদতে দেখে অজ্ঞান হয়ে গেল।

সতীশদা—ঈশ্বরে অভিভূত হলে কি হয়?

শ্রীশ্রীবড়দা—জ্ঞান রাজ্যে, চির চৈতন্যময় রাজ্যে গেলাম, ঈশ্বরপ্রেমে যা’ যা’ হয়। আমি রসগোল্লা খাইনি, তুমি অনেক ব্যাখ্যা করলে রসগোল্লার। আমি খাই-নি, তা কি করে বুঝবো? ঈশ্বর প্রেমে অজ্ঞানতা নেই, আনন্দের রাজ্য।

সতীশদা—তা’তে কি লক্ষণ দেখব?

শ্রীশ্রীবড়দা—অনুরাগ যার লেগেছে সে মশগুল হয়ে আছে, প্রদীপ্ত হয়ে থাকে। অলসতা নেই। খুব active; লোকে বলে না আহার নিদ্রা সব কল্পনার বাইরে। তারা যে আহার্য্য গ্রহণ করে তা আমরা কল্পনা করতে পারি না।

পরমেশ্বরদা—পরমহংসদেব বলেছেন চোখের দৃষ্টির পরিবর্তন হয়ে যায়।

শ্রীশ্রীবড়দা—যারা সহজ ভাবে অকপট তারাই এটা উপলব্ধি করতে পারে। কপটতা যে আমাদের কি ক্ষতি করে, সব সময় বঞ্চিত করে দেয়।

[‘যামিনীকান্ত রায়চৌধুরীর দিনলিপি/তাং-১৭/১/৭৬ ইং]

[প্রসঙ্গঃ সত্যানুসরণ পৃষ্ঠা ৭৩, ৭৪]