অনুরোধ কর..হুকুম…না।-ব্যাখ্যা

সত্যানুসরণ -এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

অনুরোধ কর, কিন্তু হুকুম ক’রতে যেও না।

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

আশ্রমের ছেলেরা তাঁর আসনের সামনে বসে রয়েছে। সেদিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে শ্রীশ্রীপিতৃদেব বললেন—ধৃতিদীপী পড়।

ধৃতিদীপীর (বক্সী) পাঠের পর তিনি ধৃতিসুন্দরকে (ভট্টাচার্য) বাণীটি বুঝিয়ে দিতে বললেন।

ধৃতিসুন্দর—ধৃতিদীপীর কাছে বই আছে, আমি চাইলাম। বললাম—বইটা এনে দেবে?

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—বইটা কার? তোমার তো!

ধৃতিসুন্দর—আজ্ঞে, আমার বই।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—তাহলে তো চাইবেই। তোমার বই, কেমন করে চাইলে আদেশ হবে, আর কেমন করে বললেই বা অনুরোধ হবে?

এবার শ্রীশ্রীপিতৃদেব ভবেশকে (সরকার) বাণীটি বুঝিয়ে বলতে বললেন।

ভবেশ—হুকুম করা চলবে না। ঠাকুর বলছেন, অনুরোধ ক’রে বল। আমার বন্ধুকে দিয়ে কিছু করাতে গেলে অনুরোধ ক’রেই বলব।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—বন্ধুর কাছে তো অনুরোধ করতেই হয়। ধৃতিসুন্দর যেমন বলল—বইটা এনে দেবে? বইটা ধৃতিসুন্দরের। ধৃতিদীপীর কাছে রয়েছে। এখানেও অনুরোধ করেই বলতে হবে। (ক্ষণিক থেমে) আমরা কাউকে অনুরোধ করি, কাউকে হুকুম করি। আমরা হুকুম করি কাদের? রিক্সাওয়ালাকে হুকুম করি, তরকারিওয়ালাকে হুকুম করি। পয়সা দিয়ে কিনছি, তরকারিওয়ালাকে বলছি—“এই এক কেজি আলু দে।” বাড়িতে যে কাজ করে দেয়, তাকে বলছি—“দো বালতি পানি লেয়াও জলদি।”—এরকম বলা ঠিক নাকি? যে বয়সে বড়, তাকে সম্মান দিয়ে কথা বলতে হয়। যে বাড়িতে কাজ করে—বাড়ির চাকর, তাকেও সম্মান দিয়ে কথা বলতে হয়। বড়দের ‘দাদা’ সম্বোধন করে বলতে হয়। তুমি (ধৃতিসুন্দর) আমার চাইতে বয়সে ছোট, তোমায় যদি আমি সর্বদা হুকুম ক’রে বলি তোমার ভাল লাগবে না, একটা বাচ্চা ছেলেকে জোর গলায় বললাম—’এই, এক পয়সার মুড়ি নিয়ে আয় তো!’ সে আমার কথা শুনতে পেয়ে আমার মুখের দিকে একবার তাকিয়েই ছুট দেবে। আজকাল আবার অনেক ছেলে বলে বসবে—আমি চাকর নাকি?

প্ৰসঙ্গক্ৰমে শ্রীশ্রীপিতৃদেব বললেন—আমাদের পাবনা আশ্রমে রাধাবিনোদ বোস ছিলেন, সবসময়ই তিনি আদেশের সুরে বলতেন—’এই, এক গাড়ু জল নিয়ে আয়—!’—তা শুনে কেউ এগিয়ে আসত না। যদি ওই কথাটাই ভাল করে বলতেন তাহলে হয়ত বলত—যাই।

ননীদা—ঠাকুর-প্রণামীর টাকা আমার কাছে থাকত। টাকার দরকার পড়লে ঠাকুর বলতেন “ননী, টাকা দিবি?—কত সোহাগের সুর, যেন আমি দিলে তবে তিনি পাবেন !

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—যিনি দিনদুনিয়ার মালিক তিনি এভাবে চাইতেন।

ননীদা—বাইরের লোক শুনে ভাববে ঠাকুর ননীদার কাছে টাকা চাইছেন।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—জ্ঞানগর্ভ আলোচনার পরও ঠাকুর আদর করে বলতেন—যাও মণি তামাক সেজে নিয়ে এস, খাওয়া যাক্‌।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব কথাশিল্পী শরৎচন্দ্রের ‘নিষ্কৃতি’ বই-এর উল্লেখ করে বললেন—সেখানে ছোট বৌ হুকুম, অনুরোধ সবই করছে। ছোট বৌ হচ্ছে সেবার প্রতিমূর্তি। তার বলাগুলো সব অনুরোধ হয়ে যাচ্ছে। তাই তার হুকুমও ছেলেপুলে মনপ্রাণ দিয়ে মানছে। ছোট বৌ ধমক দিক বা যাই বলুক, সব অনুরোধ হয়ে যাচ্ছে। ছেলেগুলোও বড়-বড়, বাচ্চা নয়। মেজবৌকে দেখলেই সব সরে যেত। মেজবৌ অনুরোধ করেই বলত, কিন্তু তার মতলব খারাপ ছিল।

আসল ব্যাপার হচ্ছে, যে বলবে তার আন্তরিকতা থাকা চাই। আন্তরিকতা না থাকলে হুকুম ক’রে পাঁচ-সাতবার কাম সারা যায়। তারপর আর পারা যাবে না। এমনি করতে-করতেই কিছুদিনের মধ্যেই পাড়াসুদ্ধ জানাজানি হয়ে যায়।

[ ইষ্ট-প্রসঙ্গে/তাং-১৯/১/৭৬ ইং]

বাণীটি নির্দিষ্ট পাঠকবৃন্দের দ্বারা বিভিন্ন ভাষায় ও তিনজন করে ছেলেমেয়েদের পাঠের পর ছেলেদের মধ্যে দিব্যদ্যুতি রায়চৌধুরীর উপর আলোচনা করার ভার পড়ল। দিব্যদুতি বাণীটি আর একবার পড়ে বলল— এখানে ঠাকুর বলেছেন—যদি কোন কাজ করতে যাও তাহলে বিনীতভাবে করো, কিছু বল তো বিনীতভাবে বল। কাউকে জোরজবরদস্তি করে বলো না।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—হ্যাঁ।

[ পিতৃদেবের চরণপ্রান্তে/তাং-২৩/৬/৭৯ ইং ]

[প্রসঙ্গঃ সত্যানুসরণ পৃষ্ঠা ৭৬, ৭৭]