অপরের মঙ্গল-কামনাই …।-ব্যাখ্যা

সত্যানুসরণ-এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

অপরের মঙ্গল-কামনাই নিজ মঙ্গলের প্রসূতি।

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

আজ মেয়েদের আলোচনা। তদনুযায়ী নির্দেশক্রমে অর্চনা আলোচনা শুরু করল।

অর্চনা—আমি যদি অন্যের মঙ্গল দেখি তাহলে নিজেরই মঙ্গল হবে।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—অপরের মানে বল। মঙ্গল কামনা কী—বল। প্রসূতি মানে কী—বল।

অর্চনা—অপরের মানে নিজ ছাড়া আর সকলের। সকলে সুখে থাকুক, ভাল থাকুক—সেই ইচ্ছা পোষণ করা হ’ল অন্যের মঙ্গল দেখা।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—প্রসূতি মানে?

অর্চনা—প্রসব করা।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—যে প্রসব করে তাকে প্রসূতি বলে। ঠাকুর অপরের মঙ্গল কামনা করার কথা বলেছেন। মানে কায়মনোবাক্যে অপরের মঙ্গল কামনা। Intellectually (নিজের বুঝ অনুযায়ী) বা মনে মনে শুধু ভাবলাম—তা না। কায়মনোবাক্যে অপরের মঙ্গল কামনা কেমন?—প্রদীপকে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন।

প্রদীপ—সবকিছু দিয়ে অপরের মঙ্গল করা।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—হ্যাঁ। দেহ, মন, বাক্য—সব দিয়ে অপরের মঙ্গল করা। দেহ দিয়ে অপরের সেবা দিতে পারি, মন দিয়ে অপরের কথা চিন্তা করতে পারি, বাক্যের সাহায্যে অপরের সুখ্যাতি করতে পারি। সকলের সুখ হোক, শান্তি হোক—এরকম ভাবতে হয়, প্রয়োজনে তা বাস্তবে করতে হয় এবং ক্ষেত্রবিশেষে তা প্রকাশও করতে হয়। এভাবে কায়মনোবাক্যে অপরের মঙ্গল কামনা করলে কী হয়?

প্রদীপ—নিজের মঙ্গল হয়।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব সম্মতি জানিয়ে বললেন—যে ওভাবে অপরের জন্য করে তার মঙ্গল হয়। তার নিজের মঙ্গল হয় কেন? অপরের জন্য করলে তার নিজের মঙ্গল আসে কিভাবে?—তিনি পুনরায় প্রশ্ন করলেন।

ছেলেমেয়েরা কেউ ঠিকমত উত্তর দিতে পারছে না দেখে তিনি বললেন—যেমন ধর, তুমি (প্রদীপ) এখানে বসে আছ। কৃষ্ণানন্দ এখানে বসতে চাইল। তুমি ভিড়ের মধ্যেও একটু সরে বসলে বা পিছিয়ে গিয়ে ওর বসার জায়গা করে দিলে, ওর যাতে সুবিধা হয় তাই করলে। এভাবে করতে থাকলে কী হবে? কৃষ্ণানন্দ তোমার আপন হয়ে উঠবে। হয়তো তোমার পকেটে পয়সা নাই, কৃষ্ণানন্দের আছে। কৃষ্ণানন্দ ঐ পয়সা নিয়ে টিফিন খেতে বেরিয়েছে। হঠাৎ তোমাকে দেখতে পেয়ে তোমাকে দোকানে নিয়ে যাবে, তোমাকে খাইয়ে আনন্দ পাবে। কিংবা, হয়তো তোমার ছাতা নেই, কৃষ্ণানন্দের আছে। রাস্তায় দু’জনে বেরিয়েছো। কৃষ্ণানন্দ তখন তোমাকে আপনার মনে করলে তোমাকেই ছাতাটা দিয়ে দেবে। তুমি নিতে না চাইলে বলবে—না না, এই তো নিকটেই আমার বাড়ী, আমি এসে পড়েছি, তুমি নিয়ে যাও। তখন তোমার জন্য কিছু করেই কৃষ্ণানন্দের সুখ—তাতেই শান্তি। আর তোমার ঐ আচরণ তোমার পাশাপাশি যারা আছে তাদেরও আকৃষ্ট করবে, তখন তারাও তোমাকে ভালবাসবে।—এরকম হয় না?

সমুখে উপবিষ্ট সকলে ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব এবার প্রদীপ, কৃষ্ণানন্দ প্রভৃতি সমুখের বালকদের জিজ্ঞাসা করলেন—তোমরা তা-ই কর তো?

প্রদীপ—আজ্ঞে করব।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—করব কী? বল, করি। তা’ করতে হয়। ঠাকুরের বাণীগুলি কিজন্য?

মন্টু—আজ্ঞে, চরিত্রগত করার জন্য।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—হ্যাঁ, যা করলে তা চরিত্রগত হয় তা-ই করতে হয়।

[ইষ্ট-প্রসঙ্গে/তারিখ-২৩/৬/৭৭ ইং]

[প্রসঙ্গঃ সত্যানুসরণ পৃষ্ঠা ১৭২]