অভাবে পরিশ্রান্ত মনই …..না।-ব্যাখ্যা

সত্যানুসরণ-এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

অভাবে পরিশ্রান্ত মনই ধৰ্ম্ম বা ব্রহ্ম-জিজ্ঞাসা করে, নতুবা করে না।

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

শ্রীশ্রীপিতৃদেব কৃতিকে আলোচনা করার নির্দেশ দিলেন।

কৃতি—এক গৃহস্থ ছেলেপেলেদের খাবার জোটাতে পারে না। অভাব লেগেই থাকে। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে পরিশ্রম করেও অর্থ উপার্জন করতে পারে না।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—অভাব মেটাতে মেটাতে পরিশ্রান্ত হয়। পরিশ্রান্ত মানে? পরিশ্রান্ত মানে ক্লান্ত, অবসন্ন। খাওয়া, পরার অভাব থাকতে পারে। বাসস্থানের অভাব থাকতে পারে। পরিশ্রম করে একসময় মানুষ অভাবগুলো মিটিয়ে ফেলে । একসময় অভাব মিটে গেলেও নূতন অভাব হাজির হয়। অভাব মেটাচ্ছি, আরও নানান অভাব আসছে। অভাব মেটাতে-মেটাতে যখন পরিশ্রান্ত হয়ে পড়ি তখন মনে হয় অভাব মেটানোর পথ এটা নয়। তখন মনে করে তাহলে ধর্মের পথে অভাব মেটাবে।

লালাবাবুর কাহিনী জানো তো? একজন ধনাঢ্য ব্যক্তি ছিলেন লালাবাবু। একদিন জমিদারী পরিদর্শন করে পালকীতে চড়ে আসছেন এক গাঁয়ের পথ ধরে; তখন বিকালবেলা। এক ধোপার মেয়ে তার বাবাকে বলছে—“বাবা বেলা যে গেল, বাসনায় আগুন দিতে হবে যে।” কথাটা লালাবাবুর অন্তঃকরণকে স্পর্শ করল। ভাবলেন, আমারও তো দিন শেষ হয়ে আসছে। কিছু করা তো হ’ল না। সংসারে আর না ফিরে ধর্মকার্যে মন দিলেন। শ্রীকৃষ্ণের লীলাভূমি বৃন্দাবন যাত্রা করলেন।

বুদ্ধদেব ছিলেন রাজার ছেলে। সংসার অনিত্য। শরীর জরা, ব্যাধি, মৃত্যুর অধীন। তাই নিত্যবস্তুর সন্ধানে সংসারত্যাগ করে সাধনায় মন দিলেন।

সনাতন গোস্বামীর নাম শুনেছ?

কৃতি—আজ্ঞে শুনেছি।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—একজন গরীব বামুন খুব শিবভক্ত। নিত্য শিবের পূজা করে। আমরা যেমন ইষ্টভৃতি করি, সেও গুরুর জন্য করে থাকে। কিন্তু সংসারে তার খুব অনটন—ছেলেপুলেদের জন্য সময়মত অন্নসংস্থান করতে পারে না। শিবের কাছে প্রার্থনা জানাল—অভাব যেন দূর হয়ে যায়। শিব স্বপ্নে দর্শন দিয়ে বললেন—নদীতীরে গিয়ে এক সাধুকে দেখবি, তার কাছে অভাবের কথা জানাবি, ভাল হবে। নির্দেশ পেয়ে নদীতীরে গিয়ে সেই সাধুকে (সনাতন গোস্বামী) দেখতে পেয়ে মনে ভাবে এবার তার কামনার পূরণ হবে। সাধুর ধ্যানভঙ্গ হতেই সব জানাল। সাধু বললেন—একটা পরশমণি আছে, লোহাকে ছোঁয়ালেই লোহা সোনা হয়ে যাবে। জায়গা দেখিয়ে সেই সাধু বললেন—ওইখানটা খুঁড়লেই পেয়ে যাবে। লোকটি ভাবল, এই সাধুর কাছে পরশমণিও তাহ’লে তুচ্ছ! কি এমন পেয়েছে যার দরুণ পরশমণি তুচ্ছ হয়ে আছে? তখন সেই বামুন ঐ সাধুর সামনে নতজানু হয়ে করজোড়ে প্রার্থনা করল—তোমার কাছে পরশমণির চাইতেও বেশি ধন আছে; সেই ধন আমায় দাও।

তাই শুধু টাকাপয়সার অভাবই অভাব নয়। টাকাপয়সা অনেক থাকলেও অভাব থাকে। অভাবের লক্ষণই হচ্ছে চাওয়া। চাহিদা আছে, তাই বোঝা যাচ্ছে অভাব আছে। যার অভাব নাই, সে চায় না।

[ ইষ্ট-প্রসঙ্গে/তাং-২৮/৫/৭৬ ইং ]

শ্ৰীশ্রীবড়দা—এই দুটোরই সুন্দর উপমা দেওয়া যায়। চালে খড় নেই, ঘরে চাল নেই, এমন একজন শিব ভক্ত রাতে স্বপ্ন দেখলেন বৃন্দাবনে একজন ভক্ত আছেন—নাম সনাতন। তার কাছে গেলে সব দুঃখ কষ্ট চলে যায়। অভাবমোচনের জন্য ঐ ব্যক্তি গেলেন বৃন্দাবনে। সনাতন তখন নাম করছিলেন। সব শুনে সনাতন বললেন—হ্যাঁ, হ্যাঁ। বালির নীচে রাখা আছে একটা পরশ পাথর। যাও, নিয়ে যাও। সব অভাব যাবে। তখন ঐ পাথর নিয়ে ব্রাহ্মণ ভাবে এমন মাণিক যাঁর কাছে তুচ্ছ, তাঁর কাছে নিশ্চয় আরও বেশী কিছু আছে। (শ্রীশ্রীবড়দা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার বিখ্যাত পংক্তিগুলি উল্লেখ করলেন) “যে ধনে হইয়া ধনী / মণিরে মাননা মণি / তাহারি খানিক; মাগি আমি নতশিরে /এত বলি নদীনীরে / ফেলিল মাণিক।” মাণিক জলে ফেলে দিয়ে ব্রাহ্মণ দেখলেন, সনাতন একখানা বহির্বাস পরে, অথচ কি শান্ত! ঐ অভাবে পরিশ্রান্ত মন পেল পরশ পাথর। তারপর একদম মালিককেই পেয়ে গেল।

[‘যামিনীকান্ত রায়চৌধুরীর দিনলিপি/তাং-১৭/৮/৭৪ ইং]

[প্রসঙ্গঃ সত্যানুসরণ পৃষ্ঠা ১৯২-১৯৩]