অমৃতময় বারি কপটের…… হয় না। – ব্যাখ্যা

সত্যানুসরণ -এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

অমৃতময় বারি কপটের নিকট তিক্ত লবণময়, তীরে যাইয়াও তার তৃষ্ণা নিবারিত হয় না।

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

শ্রীশ্রীপিতৃদেব উপস্থিত সকলের পানে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন—কি,ঠিক আছে?

শ্রীকন্ঠদা—আজ্ঞে, না। আলোচনা করা দরকার।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—কে আলোচনা করবে?

তাঁর নির্দেশ পেয়ে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জ্জীদা আলোচনা শুরু করলেন।

শ্যামাপ্রসাদদা—এখানে কপটের স্বভাব কী—তাই বোঝান হচ্ছে।

হরিপদদা (দাস)—এখানে প্রশ্ন হ’ল, অমৃতময় বারি কপটের নিকট তিক্ত হয় কী ক’রে? কপটই বা কাকে বলব?

শ্যামাপ্রসাদদা—কপট হ’ল সেই, যে তার নিজের স্বরূপ প্রকাশ করে না। সে নিজে ভাল তা’ সে দেখাতে চায়। তার মনের ভেতর এবং বাহির সম্পূর্ণ আলাদা। সে মুখে যা’ বলে, করে তা’র অন্য। নিজেকে সবসময় আড়াল দিয়ে চলে। সেজন্য সে কোন বস্তুর স্বরূপ বুঝতে পারে না। যা’ কল্যাণপ্রদ, যা’ মঙ্গলপ্রদ—তা’ বুঝতে পারে না। তাই অমৃতময় বারি তার নিকট লবণময়।

গুরুকিঙ্করদা—এখানে প্রথমে প্রশ্ন ওঠে, কপট কে? . . . মন মুখ যার এক নয় সেই কপট । যার বলা ও করার মধ্যে ফাঁক থাকে সেই কপট।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—মন, মুখ এক না হওয়া কেমন?

উত্তর দিলেন হরিপদদা—মনে হচ্ছে সত্য কথা বলব; কিন্তু মুখে মিথ্যা কথা বলছি। মনের expression (প্রকাশ) হচ্ছে না। এটাই কপটতা।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালেন।

হরিপদদা—তাহ’লে যেখানে মনে যা’ হচ্ছে, তা’ যখন মুখে বলছি সেখানে কপটতা থাকে না।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—হ্যাঁ। কপটতা কেমন? যেমন ধর, কেমন ক’রে আমাদের ইষ্টভৃতি ক’রতে হবে, কেমনভাবে কোথায় পাঠাতে হবে সে-সব ঠাকুর আমাদের ব’লে গেছেন। শুধু বলেই যাননি, দীর্ঘদিন ধ’রে আমাদের বাস্তবে অভ্যস্ত করিয়ে গেছেন। আমি জানিও তাই; কিন্তু করি অন্যরকম কিংবা অন্যদের ঐভাবে (আমি যেভাবে করি) করার প্ররোচনা দিই—এটাই কপটতা।

গুরুকিঙ্করদা—আজ্ঞে, কপটতার হাত থেকে উদ্ধার পাওয়ার উপায় কী হবে?

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—সবচেয়ে ভাল দাওয়াই হচ্ছে আমি তাঁর (ইষ্টের) এই বোধ। আমার ঘর-সংসার সবই তাঁর। আমার যা-কিছু আছে—ভাল মন্দ সবই তাঁর। তাঁর প্রতিষ্ঠার জন্য আমার জীবন। যেমন, হনুমান। হনুমান যেখানে যা’ করেছে—ভাল-মন্দ সে-সব ইষ্টস্বার্থপ্রতিষ্ঠার জন্য । এতেই সব মঙ্গলপ্রসূ হয়ে দাঁড়িয়েছে তার কাছে।

গুরুকিঙ্করদা—যারা ও-রকম (হনুমানের মতো) তাদের ব্যক্তিত্বেরও তুলনা হয় না।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব— ঠাকুরের বলা আছে,
“ইষ্টার্থপরায়ণতায় জেদী যা’রা
তা’দের ব্যক্তিত্ব অটুট থাকে।”

পরমেশ্বরদা প্রশ্ন করলেন— আজ্ঞে, ব্যবহারিক জীবনে কিভাবে কপটতা লুকিয়ে থাকে?—হয়তো নিত্যানন্দদাকে (মন্ডল) আমি দেখতে পারি না, তার নিন্দাই করি; কিন্তু নিত্যানন্দদার নিকট তা’ মোটেই প্রকাশ করি না, তার প্রশংসাই করি—এটাই কি কপটতা?

শ্রীশ্রীপিতৃদেব পরমেশ্বরদার কথায় সম্মতি জানিয়ে কপটতার হাত থেকে মুক্ত হওয়ার উপায় প্রসঙ্গে বললেন—হ্যাঁ, এজন্যই ইষ্টকে কেন্দ্র ক’রে চলতে হয়। তাহ’লে আর ঐ ভাব আসে না। আমাদের ইন্দ্রিয়গুলোও ইষ্টকে কেন্দ্র ক’রে পরিচালিত করা উচিত। এটাই হ’ল সুখ ও শান্তি লাভের একমাত্র উপায়। তখন এমনই ঘটে—হয়তো তোমার সাথে আমার মতের অমিল, কিন্তু বিরোধ হচ্ছে না। এতে (যখন মানুষ ইষ্টার্থপরায়ণ হয়) ভালবাসার span (পরিধি)-ও বেড়ে যায়। কেউ হয়তো তোমাকে আর একজন সম্বন্ধে কিছু বলল; তুমি বললে—ধ্যাৎ, ও অমন মানুষই না—এরকম হয়। তখন সবাই আপন হ’য়ে ওঠে। ‘বসুধৈব কুটুম্বকম্‌’ হয়—সহজভাবেই।

এ’-অবস্থায় কোন ক্ষতি (নিজের কোন ক্ষতি) ক্ষতি বলেই মনে হয় না। কিন্তু তাই ব’লে অন্যের ক্ষতি কেউ করল অথচ তুমি দেখেও প্রতিবিধান করলে না, তা’ হয় না।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব বলে চলেছেন—নিজেকেই আমরা বুঝতে পারি না, নিজের বৃত্তি-প্রবৃত্তির টানে চলি সবসময়। ফলে নিজেকেই নিজে বঞ্চনা করি। এটাই কপটতা।

আসল কথা হ’ল ইষ্টকেন্দ্রিক হওয়া । এটাই রক্ষাকবচ। কপট যে সে যত শিক্ষিতই হোক ধরা পড়বেই। পাড়া-প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধব, পরিবার-পরিজনদের কাছে তার স্বরূপ একদিন কি একদিন প্রকাশ পাবেই। আর যে প্রকৃতই অকপট কেউ তাকে কপট মনে করলেও তার কিছু এসে যায় না। অকপট ব্যক্তির দ্বারা কখনও কারো অমঙ্গল ঘটে না। যেমন, প্রাচীন মুনি-ঋষিরা কখনও কারো কৃতকর্মের জন্য অভিশাপ দিতেন। আপাতদৃষ্টিতে তাতে ক্ষতি মনে হলেও অনুসন্ধান করলে দেখা যায় সব ক্ষেত্রেই মঙ্গল সাধনই হয়েছে। অন্ধক মুনি রাজা দশরথকে শাপ দিলেন—তুমি পুত্রশোকে প্রাণ হারাবে। রাজা দশরথ অপুত্রক ছিলেন। শাপে বর হ’ল। স্বয়ং নারায়ণ দশরথের পুত্ররূপে জন্ম নিলেন। এ-রকম মুনি-ঋষিদের অভিশাপে সুফলই ফলে।

[ ইষ্ট-প্রসঙ্গে/তাং-৪/১২/৭৫]

[প্রসঙ্গঃ সত্যানুসরণ পৃষ্ঠা ৩১, ৩২]