অহংটা যখনই মিলিয়ে….নির্গুণ হয়।

সত্যানুসরণ -এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

অহংটা যখনই মিলিয়ে যায়, জীব তখনই সৰ্ব্বগুণসম্পন্ন-নির্গুণ হয়।

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

শ্রীশ্রীপিতৃদেবের আদেশে চানু আলোচনা শুরু করল।

চানু চ্যাটার্জী—যখন ‘আমি কর্তা’ ভাব চলে যায় তখন আমি ইষ্টের। তখন আমি ইষ্টের গুণগুলো নিতে পারি। অহং মিলিয়ে যাওয়া মানে ‘আমি কর্তা’ ভাব না থাকা।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—সর্ব্বগুণসম্পন্ন মানে কি?

চানু—সকলরকম গুণযুক্ত।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—সকলরকম গুণ হচ্ছে, আবার নির্গুণও হচ্ছে, তার মানে কী? কর্তা ভাব যখন থাকে না, আমি ইষ্টের দাসানুদাস হলাম, সর্ব্বগুণসম্পন্ন হলাম, আবার নির্গুণও হলাম—সোনার পিতলে ঘুঘুর মত মনে হচ্ছে না?

শ্রীশ্রীপিতৃদেবের আদেশে এবার হৃতি আলোচনা শুরু করল।—সর্ব্বগুণসম্পন্ন নির্গুণ মানে, সর্ব্বগুণসম্পন্ন হয়েও মনে করব আমি কিছুই জানি নে।

আদেশানুসারে অক্ষয় মিশ্র এবার শুরু করলেন—সর্ব্বগুণসম্পন্ন মানে সবগুণগুলোই আছে। অর্থাৎ সৎকর্মের যে গুণগুলো সেগুলো আছে।

আলোচনা পরিষ্কার হচ্ছে না দেখে শ্রীশ্রীপিতৃদেব বললেন—সহজ করে বলা দরকার যাতে সকলে বুঝতে পারে। গোড়ার দিকের আলোচনা তো ঠিকই হয়েছে—কর্তাভাব যখন থাকে না… ।

এবার শ্রীশ্রীপিতৃদেব হরিপদদাকে (দাস) বলতে আদেশ করলেন।

হরিপদদা—যখন আমার অহং ভাব আস্তে আস্তে মিলিয়ে যায় তখন দয়া, মায়া, প্রেম, ভক্তি, ভালবাসা আমার মধ্যে আসতে থাকবে। নিখুঁতভাবে সবগুণগুলিই আসবে।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—সর্ব্বগুণসম্পন্ন হওয়ার পর এমন একটা অবস্থা হবে যখন তাঁকে গুণ দিয়ে ধরা যায় না। তিনি সমস্ত গুণের অতীত। গুণাতীত। অর্থাৎ গুণের উপরে তিনি। অহংটা যখন মিলিয়ে যায় মানে?

হরিপদদা—আমার অহং যখন ইষ্টে সমর্পিত করছি।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—ঠিক-ঠিক বোঝা গেল না তো! লাল বল্‌।

লালদা (রামনন্দন প্রসাদ)—নিজের অহংটা যখন ইষ্টের সঙ্গে এক হ’য়ে মিলে যায়, তখন নিজের কোনও গুণ থাকে না। ইষ্টের গুণের সাথে এক হ’য়ে যায়। সব গুণই চলে আসছে, কিন্তু নিজের কোনও গুণ নাই।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—অহংটা মিলিয়ে যায় কখন? ভক্ত যখন সমস্ত সত্তা দিয়ে ইষ্টের ভজনা করে তখন তার আর নিজত্ব বলে কিছু থাকে না। তখনই অহং মিলিয়ে যাওয়ার কথা আসছে। চাঁদের আলো যেমন দুনিয়ায় বিতরণ হয়, সব জায়গায় আলো পড়ে। ভক্তেরও তখন ইষ্টের ইচ্ছামতন চলা হয়, তার মধ্যে ego-র (অহং-এর) খেলা নেই। ইষ্ট যেমন চান ভক্ত সেইরকম চলে। ইষ্টের will (ইচ্ছা) তাঁর মধ্যে ক্রিয়া করে। জীবজগৎ তা অনুভব করে। তাই সকলে আকৃষ্ট হয়। ভক্ত ইষ্টময় হয়ে গেলে সত্ত্ব, রজঃ, তম তার মত করে সব প্রকট হয়ে ওঠে। এগুলো নিয়ে সে লীলা করে। এগুলোর উর্ধ্বে থাকে সে। এগুলোর উর্ধ্বে না থাকলে সত্ত্ব, রজঃ, তম নিয়ে লীলা বা খেলা করবে কিভাবে?

অনেক সময় সাধক সমাধিস্থ হতে-হতে তাঁতে মিলিয়ে যায়। এটা হয় আধার অনুযায়ী, সাধকের state (অবস্থা) অনুযায়ী। মীরাবাঈ-এর জীবনে ঘটেছে এরূপ ঘটনা। স্বামী ভোজরাজের মৃত্যুর পর মীরাবাঈকে কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। অনেকে শত্ৰুতা করতে থাকে। তাঁর প্রাণনাশের চেষ্টা হয়। তারপর তিনি গিরিধারীজীর লীলাধাম বৃন্দাবন চলে যান। মীরার কৃষ্ণপ্রেম, ব্যাকুলতা ও আত্মনিবেদনের কথা প্রচার হতে থাকে দিকে দিকে । এদিকে মীরার মেবার ত্যাগ করার পর থেকেই রাজ্যের উপর দিয়ে বইতে থাকে নানা প্রাকৃতিক ও রাজনৈতিক দুর্দৈব—দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধবিগ্রহ। মেবারের রাণা উদয়সিংহের ধারণা মেবারের রাজলক্ষ্মী মীরা দেশত্যাগী হওয়ায় রাজ্যের এই দুরবস্থা। রানা উদয়সিংহ মীরাকে ফিরিয়ে আনার জন্য কয়েকজন বিশিষ্ট ব্রাহ্মণকে পাঠালেন, যাদের কথা মীরা অমান্য করতে পারবেন না। মীরার পক্ষে আর সংসারে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। স্থির করলেন, শ্রীকৃষ্ণের শ্রীবিগ্রহের সমুখে নিমীলিত করবেন নয়নযুগল। প্রার্থনা জানালেন—আমি তো তোমার চরণ ছেড়ে যেতে পারি না, আমায় গ্রহণ কর। মন্দিরের শ্রীবিগ্রহের সমুখে ভজনানন্দে দীর্ঘসময় গভীর ধ্যানে মগ্ন হলেন। ঐ ধ্যানরত অবস্থাতেই তাঁর দেহাবসান হয়।

শ্রীশ্রীঠাকুরের এক ভক্ত ছিল জ্যোতিষ ঘোষ। পরম ভক্ত। জাতিতে গোয়ালা। খুব তেজ ছিল তার। ঠাকুরের এতটুকু নিন্দা সে সহ্য করতে পারত না। সঙ্গে-সঙ্গে অভিশাপ দিয়ে বসত। সে অভিশাপ ফলেও যেত সঙ্গে-সঙ্গে। একাধিক ব্যক্তিকে একই কারণে তার অভিশাপে পড়তে হয়েছে। এজন্য পরে অনুতপ্ত হতে হয়েছে জ্যোতিষ ঘোষকে। সেই অনুতাপে সে ঠাকুরের চরণে প্রাণ বিসর্জন দেয়। তখন তার বয়স মাত্র ২৭-২৮। ভক্ত কায়মনোবাক্যে ইষ্টের চরণে সমর্পিত। ভক্তের ইচ্ছা তিনি পূরণ করেন। তাই ভক্তের ইচ্ছায় সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয় হতে পারে। ঠাকুর সত্যানুসরণে বলেছেন, হাজার শক্তি তুমি লাভ করতে পার, চন্দ্র-সূর্য কক্ষচ্যুত করতে পার, পৃথিবী ভেঙ্গে টুকরা-টুকরা করতে পার, কিন্তু হৃদয়ে প্রেম না থাকলে তোমার কিছুই হয়নি। ভক্তের মধ্যে প্রেম থাকে। সেই জন্যই তাঁর চরণে থাকতে চায়, নিজেকে সঁপে দেয় তাঁর চরণে, সত্ত্ব, রজঃ, তম এর চরম প্রকাশ ঘটে তার মধ্যে।

[ইষ্ট-প্রসঙ্গে/তাং-২/৪/৭৮ইং ]

সুস্মিতা স্বামী আলোচনা করার সুযোগ পেয়ে বাণীটি পুনরায় পাঠ করে বলল—মানুষের অহংকার যখন মিলিয়ে যায় তখন সমস্ত গুণ থাকা সত্ত্বেও সে ভাবে আমার কোন গুণ নাই।

সুম্মিতার এ-কথা শুনে শ্রীশ্রীপিতৃদেবও বললেন—হ্যাঁ। অহংকার মানে আমি কর্তা এই ভাব। আমি কর্তা এই ভাব যখন মিলিয়ে যায়, তখনই সে ভাবে আমার কোন গুণ নাই, সব গুণ থাকা সত্ত্বেও।—এই বলছিস্‌ তো?

সুম্মিতা—আজ্ঞে।

[ পিতৃদেবের চরণপ্রান্তে/তাং-২৫/৫/৭৯ইং]

শ্রীশ্রীপিতৃদেব বাণীটির প্রকৃত অর্থ দয়া করে বুঝিয়ে বললেন—জীব অর্থাৎ মনুষ্যজাতিকে বোঝাচ্ছে। ইষ্টার্থপ্রতিষ্ঠাই জীবের একমাত্র করণীয় ও কর্তব্য। মানুষের চলার পথে অহংটা বাধাস্বরূপ হয়ে দাঁড়ায়। আর এই বাধাই মানুষকে ইষ্টস্বার্থপ্রতিষ্ঠার পথে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। আমার যা কিছু আছে সব কিছু নিয়ে যখন ইষ্টস্বার্থ ও তাঁর প্রতিষ্ঠার কাজে নিয়োজিত করছি, তখন আমার নিজস্ব বলে অহংকার কিছু নেই। যেটুকু অহংকার আছে সেটুকু তাঁরই জন্য (যেমন ‘ঠাকুর’ আছেন, কোন ভয় নেই) পাতলা আকারে।

সর্ব্বগুণসম্পন্ন হওয়া মানে, সত্ত্ব, রজঃ, তম গুণের অধিকারী হওয়া বোঝায়। আমার মধ্যে এ-সবগুলি থাকলেও, যেহেতু আমি তাঁর সেবক, তখন তাঁকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে এগুলি যতখানি তাঁর কাজে লাগে ততখানি এগুলি হতে মুক্ত হতে পারব। নইলে আলাদাভাবে আমার রজঃভাব যাক তবে তাঁর সেবক হব, তমভাব যাক তবে তাকে প্রতিষ্ঠা করব—এইরূপ মনোভাব থাকলে হয়তো বা সারাটা জীবন কেটে যাবে, তবু এ ভাবগুলি যাওয়া সম্ভব হবে না। মাঝ থেকে ইষ্টগুরু পুরুষোত্তমের সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত হব, ফলে হবে না কিছুই। বরং তাঁকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে, তাঁকে খুশী করতে গিয়ে নানা রকম পরিবেশ ও পরিস্থিতির চাপে পড়ে যতখানি বা যতটা অসৎ বা মন্দ নিরোধ হয় ততই ভাল। আর এইভাবে যাওয়া সম্ভব, নইলে আলাদাভাবে যাওয়া সম্ভব নয়।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব ননীদা (চক্রবর্তী)-কে জিজ্ঞাসা করলেন—কি, বোঝা যাচ্ছে?

ননীদাআজ্ঞে হ্যাঁ, বোঝা যাচ্ছে।

[তাঁর সান্নিধ্যে/তাং-২১/১১/৭১ ইং]

[প্রসঙ্গঃ সত্যানুসরণ পৃষ্ঠা ৫০, ৫১, ৫২]