একটা চাইতে গিয়ে … পাবে।

সত্যানুসরণ-এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

একটা চাইতে গিয়ে দশটা চেয়ে ব’স না, একেরই যাতে চরম হয় তাই কর, সকলগুলিই পাবে।

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

শ্রীশ্রীপিতৃদেব ভবেশকে বাণীটি উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দিতে বললেন।

ভবেশ—ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হয়েছি। এরপর শ্রীশ্রীঠাকুরের কাছে প্রার্থনা জানাই, ভাল ডাক্তার হতে চাই।

বসওয়ানদা (সিং) শোনা মাত্র ভবেশকে বললেন—এটা কোনও উদাহরণ হল? শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীতে আছে চাওয়া হবে একটা, একাধিক নয়।

এরপর ধৃতব্রতকে উদাহরণ দিয়ে বোঝাতে বললেন শ্রীশ্রীপিতৃদেব।

ধৃতব্রত—বিষ্ণু আমাকে ভালবেসে একটা পেন দিল। পেনটা ভালই। আমি আরও কয়েকটা পেন বিষ্ণুর কাছে চাইলাম।

বসওয়ানদা—বাণীতে আছে—’একটা চাইতে গিয়ে দশটা চেয়ে বস না’, তুমি তো আরও চেয়ে বসলে। উদাহরণ হল না।

ঠিক এই সময়ে জনৈকা বোন কিছু বলার জন্য উৎসুক দেখে শ্রীশ্রীপিতৃদেব বলার জন্য অনুমতি দিলেন।

ওই বোন—এক রাজা তার সব কর্মচারীদের ডেকে বললেন, তোমাদের কার কি প্রয়োজন আমায় বল। একথা শুনে কর্মচারীরা যার যা প্রয়োজন—জমি, বাড়ি, টাকা চাইল। কেবল এক কর্মচারী কিছু চাইল না। তা দেখে রাজা মহাশয় বললেন—কি, তোমার কি কিছু চাহিদা নেই? কর্মচারী বল্লে—আজ্ঞে আছে, আপনি যদি দয়া করে আমার গৃহে পদধূলি দেন, ধন্য মনে করব নিজেকে। এই আমার চাহিদা। এই আমার প্রার্থনা। রাজা মহাশয় মনে মনে খুশী হয়ে বললেন—তাই হবে। তখন মন্ত্রী বললেন—তা কি করে হয়? ওর বাড়িতে রাজা মহাশয় যাবার মত ভাল রাস্তা নেই, রাজা মহাশয়ের সঙ্গে যাঁরা যাবেন, তাঁদের বসার মত জায়গা নেই। রাজা মহাশয় বললেন—ভাল রাস্তা তৈরি করে দাও। আর আমি যেতে পারি সেইভাবে বাড়ি বানিয়ে দাও।

সতীশদা (পাল) বাণীর ব্যাখ্যা শুনে বললেন ঠিকমত আলোচনা হল না।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—আমিও তাই ভাবছি। ঠিকমত আলোচনা কর। সময় চলে যাচ্ছে।

সতীশদার দেরী দেখে বসওয়ানদা বললেন—আমার একটা জিনিস তাঁর কাছে চাওয়া—আমি তাঁকেই চাই। অন্য কিছু চাই না। কোনও জাগতিক সম্পদও নয়। সমাজে বাস করতে গেলে, জীবনে চলার পথে সামান্যতম প্রয়োজন ছাড়া আর কিছুই চাই না, প্রয়োজনও নেই। কেবল তাঁকেই পেতে চাই।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব বসওয়ানদার আলোচনায় সম্মতি দিয়েও বললেন—সাধারণ মানুষ কি চায়? অর্থ, মান, যশ—এই সবই তো চায়! ঠাকুর বলছেন—এতসব না চেয়ে, একটা চাইতে; আর একেরই যাতে চরম হয় তাই করতে। তা কেমন জান! ধর, তুমি তোমার ইষ্টের কাছে অর্থই চাইলে ব্যবসা করার জন্য। ছোট ব্যবসা আরম্ভ করলে। ব্যবসা তখন তোমার ধ্যান-জ্ঞান। কিভাবে ব্যবসায় উন্নতি হয় সেই চিন্তায় ডুবে আছ সবসময়। ফলে, ব্যবসায় লাভ হতে থাকল । বড় ব্যবসায়ী হলে, অনেক টাকা হল, লোকজন, কর্মচারী অনেক জুটে গেল। এইভাবে চলতে গিয়ে বৃহত্তর সমাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লে। যেখানে স্কুল ছিল না, সেখানে স্কুল করে দিলে। শিক্ষার বৃহত্তর প্রয়োজনে কলেজ করে দিলে । সরকারের হাত শক্ত করতে খরাত্রাণে, বন্যাত্রাণে তোমার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলে। এর ফলে সমাজে তোমার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল। চারিদিকে মানুষ তোমার প্রশংসা করতে লাগল। অনেক বিদ্বান ও গুণীজন তোমার দর্শনে কৃতার্থ হল—এরকম হয় না?

উপস্থিত অনেক দাদা একসাথে— আজ্ঞে, এরকম হয়।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—সেই সবচেয়ে বড় চতুর যে প্রথমেই পরমপিতাকে চায়। তাঁকে পেলে সব পাওয়া হয়। কোনও পাওয়া বাকি থাকে না। তিনি তো নিখিল ব্রহ্মাণ্ডের অধীশ্বর।

[ তাঁর সান্নিধ্যে/তাং-১৯/৪/৭৭ ইং]

আজ মেয়েদের আলোচনায় উমারাণী চক্রবর্তী বাণীটি আর একবার পাঠ করে বললেন—এখানে ঠাকুর বলছেন, একটা চাও—একেরই যাতে চরম হয় তাই কর। আমি যদি ইস্টকে ধরে চলি তাহলে আমার সবগুলিই পাওয়া হবে।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব তার সমর্থনে বললেন—আমি যদি ইষ্টকে ধরে চলতে পারি, তাহলে সকলগুলিই পাওয়া হবে—ইষ্টকে মুখ্য করে চললেই সবগুলি পাওয়া হয়।

[ পিতৃদেবের চরণপ্রান্তে/তাং-৫/৮/৭৯ ইং]

[প্রসঙ্গঃ সত্যানুসরণ পৃষ্ঠা ১১৩ – ১১৪]