“এতটুকু দুর্ব্বলতা ……. হাতই পড়বে না।” – ব্যাখ্যা

সত্যানুসরণের বাণীটি হলোঃ

এতটুকু দুর্ব্বলতা থাকলেও তুমি ঠিক-ঠিক অকপট হতে পারবে না; আর, যতদিন তোমার মন-মুখ এক না হচ্ছে, ততদিন তোমার মলিনতার গায়ে হাতই প’ড়বে না।

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক প্রদত্ত ব্যাখ্যা :

শ্রীশ্রীপিতৃদেব সপ্তর্ষিকে আলোচনা করার আদেশ দিলেন।

সপ্তর্ষি — দুর্বলতা থাকলে আমি অকপট হ’তে পারব না। অকপট হওয়া মানে মন-মুখ এক হওয়া।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব— মন-মুখ এক হ’লে দুর্বলতা চলে যায়। মন-মুখ এক হওয়া দুর্বলতা চলে যাওয়ার main factor (প্রধান উপকরণ)।

অতঃপর শ্রীশ্রীপিতৃদেব পুনরায় প্রশ্ন তুললেন—তাহলে দুর্বলতার সঙ্গে মন-মুখ এক হওয়ার কী সম্পর্ক?

হরিপদদা— সব প্রকাশ করতে না পারলে ভিতরে গলদ জমে থাকে। তাই সব প্রকাশ করতে হবে। তাতে দুর্বলতা চলে যাবে।

ক্ষিতীশদা (সেনগুপ্ত)—সব প্রকাশ করা ঠিক নাকি? সব জিনিস সকলের কাছে প্রকাশ করা তো ঠিক না।

পণ্ডিতদা— যেখানে যতটুকু দরকার সেখানে ততটুকু প্রকাশ করতে হবে।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—সব প্রকাশ করতে পারে নাকি? মন-মুখ এক না হওয়া এমন এক অবস্থা যখন প্রকাশ করতে পারে না—বিক্ষিপ্ত অবস্থা, চঞ্চল অবস্থা।

লালদা—চেপে রাখছি কেন?

হরিপদদা—অবগুণ বেরিয়ে পড়বে।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব— হ্যাঁ, ওটাই দুর্বলতা।

গুরুকিংকরদা—অনেকে সাধু সাজে, কিন্তু সাধু নয় সে জানে মনে-মনে। এটাও কপটতা। এখানে গলদ জমে থাকে।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—সাধু হওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে সাধু সাজা ভাল। সাধুতা দেখাচ্ছি অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য সেটাই খারাপ।

এরপর শ্রীশ্রীপিতৃদেব বিষ্ণুকে জিজ্ঞাসা করলেন—মলিনতা কখন আসে?

বিষ্ণুকে নিরুত্তর দেখে তিনি বললেন—প্রবৃত্তির টানে আবদ্ধ হয়ে গেলে মলিনতা আসে। মলিনতাই দুর্বলতা । মন-মুখ এক না হ’লে তো প্রকাশ পাবে না। প্রকাশ পেলে বাঁচোয়া।

[ইষ্ট-প্রসঙ্গে/তাং-১১/২/৭৮ইং]

শ্রীশ্রীপিতৃদেব দীপ সিংকে আলোচনা করার আদেশ দিলেন।

দীপ সিং পুনরায় বাণীটি পাঠ করলে শ্রীশ্রীপিতৃদেব জিজ্ঞাসা করলেন— দুর্বলতা কাকে বলে?

দীপ সিং—দুর্বলতা মানে মন ভেঙে পড়া।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—কিসে মন ভেঙে পড়ে?

দীপ সিং—দুঃখ-কষ্টে, পড়লে।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—কপটতা কাকে বলে?—সুখেন বল।

সুখেন—ভাবছি একরকম, করছি অন্য।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—উদাহরণ দাও।

সুখেন—মনে ভাবছি বেড়াতে যাব, মুখে বলছি পড়ব।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—এর নাম কপটতা। তাহ’লে অকপট কিরকম?

সুখেন—যা’ ভাবছি তা-ই বলছি।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—বল, মন-মুখ এক হওয়া। আর, দুর্বলতা মানে কি?

সুখেন—মনের ভয়।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—কিসে মনে ভয় হয়?

সুখেন—কপটতা থাকলে, দুর্বলতা থাকলে মনে ভয় হয়।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—দুর্বলতা কোথা থেকে আসে?

সুখেন—কোথাও গেলে খারাপ হ’তে পারে জেনেও যখন যাই।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—তুমি বলতে চাচ্ছ ওখানে গেলে পরে ক্ষতি হ’তে পারে, অমঙ্গল হ’তে পারে,—তা জেনেও যদি সেখানে যাই, তার মানে জেনে-শুনেই অমঙ্গলকে আলিঙ্গন করছি। এখন বল, দুর্বলতার ভাব আসছে কোথা থেকে?

সুখেন—কপটতা থেকে।

উত্তর ঠিক হচ্ছে না দেখে শ্রীশ্রীপিতৃদেব বললেন—ইষ্টমুখী মনে দুর্বলতা থাকে না। কিন্তু মনে রিপু prominent (মুখ্য) হওয়ার জন্য দুর্বলতা আসে, আমরা দুঃখ পাই। ষড়রিপুর চাপে মানুষ দুঃখ-কষ্ট পায়। এখন বল—ষড়রিপু কী কী?

সুখেন—কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য্য।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—তাহ’লে মন যখন এই রিপু দ্বারা পরিচালিত হয় তখন দুর্বলতা আসে। ইষ্টকেন্দ্রিক মনে দুর্বলতা বাসা বাঁধতে পারে না। ইষ্টকেন্দ্রিক মন হ’লে রিপুর ওপর আধিপত্য আসে। আর যদি তা’ না হয় তখন মন রিপু দ্বারা চালিত হয়। লোভের বশে চুরি করেছি। ভাবছি পাছে লোকে জেনে ফেলে তাই ভাল লোকের (সৎ লোকের) pose (ভান) করি। এই হ’ল কপটতার আশ্রয় নেওয়া । রিপু দ্বারা তাড়িত মন কপট হয়। তখন মানুষ সব দিক থেকেই দুর্বল হ’য়ে পড়ে; ক্রমশ কপটতার আশ্রয় নিতে থাকে। আর মানুষের মন যত ইষ্টকেন্দ্রিক হয় তত অকপট হয়, মলিনতার গায়ে তখন হাত পড়ে । মলিনতা মানে মনের কু- ভাব। কিভাবে চললে হাত পড়বে? ঠাকুর যেভাবে বলেছেন সেভাবে চললে; যত ইষ্টকেন্দ্রিক হব—মানে ইষ্টকে জীবনের কেন্দ্র ক’রে চলব তত মলিনতা দূরে সরে যাবে।

[ইষ্ট-প্রসঙ্গে/তাং-১৪/১২/৭৬ ইং ]