কখনও নিন্দা … না। – ব্যাখ্যা

সত্যানুসরণ -এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

কখনও নিন্দা ক’রো না, কিন্তু অসত্যের প্রশ্রয় দিও না।

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

পাঠের পর সতীশদা ইতস্ততঃ করছেন, কী প্রশ্ন তুলবেন। শ্রীশ্রীপিতৃদেব তাকে বললেন—আমরা কী করি তা-ই বল্‌-না!

সতীশদা—আমরা নিন্দা করি।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—নিন্দা করি কিজন্য?—কেউ-কেউ নিন্দা করে অপরকে ছোট করার জন্যই, আবার কেউবা অসত্যের প্রশ্রয় না দেবার জন্যও নিন্দা করে বা অপ্রিয় সত্য বলে থাকে।

এরপর শ্রীশ্রীপিতৃদেব স্বপ্নাকে (চৌধুরী) বাণীটি পাঠ করতে বললেন । স্বপ্না পাঠ করল। এরপর স্বপ্নাকে জিজ্ঞাসা করলেন—অসত্য কী?

স্বপ্না—যা’ সত্য নয়।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—তাহ’লে সত্য কী? সতীশ বল্‌।

সতীশদা—অসত্য-এর অর্থ হ’ল যা’ সত্য নয়। সত্য=সৎ+য প্রত্যয়। সত্য আসছে সৎ থেকে। সত্য = অস্‌ ধাতু+শতৃ প্রত্যয়। অস্‌ ধাতুর অর্থ বিদ্যমানতা। যাতে অস্তিত্ব রক্ষা হয় তা-ই সৎ।

সতীশদা অভিধান খুলে সৎ শব্দটির অর্থ পড়লেন—বিদ্যমান, উত্তম, সাধু, নিত্য ইত্যাদি। এবার সতীশদা পড়লেন—অস্তিত্ব রক্ষার পরিপন্থী যা’ তা-ই অসৎ।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—জীবনবৃদ্ধির বিরোধী যা’ তা-ই অসৎ। যা’ জীবনবৃদ্ধি রক্ষা করে, জীবনবৃদ্ধির সহায়ক যা’ তা-ই সৎ। জীবনবৃদ্ধির অন্তরায়কে প্রশ্রয় না দিতে বলেছেন ঠাকুর। বসে রয়েছি, মুখে আঙুল দিলাম, ভাবছি কেউ দেখছে না, কিন্তু এত লোকের কারু-না-কারু চোখে পড়বেই; আর মুখে আঙুল দেওয়ার ফলে আঙুল থেকে অনেক জীবাণু মুখে গেল আবার মুখ থেকে বহু জীবাণু আঙুলে লাগল। এইভাবে একই সঙ্গে আমার এবং অন্যের ব্যাধি-সংক্রমণের কারণ হ’য়ে উঠতে পারি আমি।

পরমেশ্বরদা (পাল)—আমার ব্যাধি আছে, ব্যাধি নিয়েই আমি গুরুকিংকরদার ঘরে যাই, বিছানায় বসি। একদিন গুরুকিংকরদা আমাকে বিছানায় বসতে না দিয়ে আলাদা আসন পেতে দিলেন। বললেন—বিছানায় বসবেন না। ওই যে অন্যদিন থেকে আলাদা ক’রে বসতে দিলেন এটা কি নিন্দার পর্যায়ে পড়বে?

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—এটা নিন্দার পর্যায়ে পড়বে কেন? কলেরা না হওয়ার জন্য আমরা ইন্জেকসন নিই, পক্স্‌-এর জন্যও টিকা নিয়ে থাকি। এগুলো তো সবই প্রতিরোধক হিসাবে ব্যবহৃত হয়। আর, যখনই কোন কথা অপরকে শুধু ছোট করার জন্য বলি তখনই তা’ নিন্দা হয়। জীবনবৃদ্ধির সহায়ক যা’ তা-ই সৎ। আমাদের লক্ষ্য জীবনবৃদ্ধি। জীবনবৃদ্ধির বিরোধী যা’—এরূপ আচার, ব্যবহার, অভ্যাসকে প্রশ্রয় না দিতে বলেছেন ঠাকুর।

[ ইষ্ট-প্রসঙ্গে/তাং-২০/১/৭৬ ইং]

—আজ মেয়েদের আলোচনায় কৃতিদেবতা (চৌধুরী) পুনরায় বাণীটি পড়ে বলল—এখানে ঠাকুর বলছেন—কারো সম্পর্কে নিন্দা করা উচিত নয়। কেউ হয়ত খারাপ কাজ করল না, আমি নিন্দা করলাম—এটা ঠিক নয়।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—মিথ্যা কথা বললে নিন্দা করলি? আর যদি সত্যি সত্যি খারাপ কাজ করে?— নিন্দা করা মানে কি?

কৃতিদেবতা—কেউ যদি অন্যায় কাজ করে, সেটা যদি আমি অপর কাউকে বলি তাহলে নিন্দা করা হয়। নিন্দা করা মানে দোষের কথা বলা।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—তাহলে কি করতে হবে?

—তখন তাকে ভাল করে বুঝিয়ে বলতে হবে।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—হ্যাঁ। লোকের কাছে নিন্দা না করে তাকেই ভাল করে বুঝিয়ে বলতে হবে।

[ পিতৃদেবের চরণপ্রান্তে/তাং-২৪/৬/৭৯ ইং ]

[প্রসঙ্গঃ সত্যানুসরণ পৃষ্ঠা ৭৮, ৭৯]