কপট ব্যক্তি ….. প্রবঞ্চিত হয়।- ব্যাখ্যা

সত্যানুসরণ -এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

কপট ব্যক্তি অন্যের নিকট সুখ্যাতির আশায় নিজেকে নিজেই প্রবঞ্চনা করে, অল্প বিশ্বাসের দরুন অন্যের প্রকৃত দান হ’তেও প্রবঞ্চিত হয়।

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

নানা ভাষায় বাণীটি পাঠের পর শ্রীশ্রীপিতৃদেব জিজ্ঞাসা করলেন—কে আলোচনা করবে?

গুরুকিঙ্করদা—রাধাকৃষ্ণদা।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—বল্‌ রাধাকৃষ্ণ।

রাধাকৃষ্ণদা বাণীটি একবার পাঠ ক’রে বলতে শুরু করলেন—ননীদা বাড়িতে একদিন আমায় নিমন্ত্রণ করলেন। আমি বলেছি কম খাই। তাই ননীদা নানান খাদ্যসামগ্রীদ্বারা আপ্যায়িত করতে চাইলেও কম খেয়ে উঠলাম। পেটও ভরল না। শেষে দোকানে বসে খেতে হ’ল। উপাদেয় খাদ্যসামগ্রী থেকে বঞ্চিত হ’তে হ’ল।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—তুমি আগে থেকে ননীদাকে ‘কম খাই’ বলেছিলে কেন? নিশ্চয়ই তোমার ধারণা ছিল—কম খাওয়া ভাল, কিংবা ননীদা কম খাওয়া পছন্দ করেন; অথচ তোমার আহারের পরিমাণ অনেক বেশি। তুমি ‘কম খাও’ এই কথাটা ব’লে ননীদার বাড়িতে নিজের আহার থেকে প্রবঞ্চিত হলে । আবার যেদিন রামনন্দনের বাড়িতে ভোজের দিনে তুমি খুব ক’রে খেলে, সেদিন ননীদা তোমার আসল রূপ দেখলেন।

ননীদার দিকে তাকিয়ে শ্রীশ্রীপিতৃদেব বললেন—কপটতা মানে মুখে একরকম, মনে আর একরকম । আমি আপনাকে বলছি—আমি ঠাকুরের অনুশাসন সব ঠিক-ঠিক পালন করি, ঊষানিশায় মন্ত্রসাধন করি, দু’বেলা নিয়মিত প্রার্থনা করি। একবার আপনি আমাকে বাইরে সঙ্গে করে যাজন-কার্যে নিয়ে গেলেন। তখন দেখলেন আমার ঘুমই ভাঙ্গে না। প্রার্থনার সময় ডেকে তুলতে হ’ল। তখন আপনি বুঝলেন—নাম-ধ্যানের কথা দূরে থাক, সময়মত প্রার্থনা করি কি-না সন্দেহের । ও-সব শুধু আমি কথায় বলেছি। আমি যদি নিজের ত্রুটি স্বীকার করতাম, আমি ঊষানিশায় মন্ত্রসাধন করতে পারি না—এটা যদি স্বীকার করতাম তাহলে আপনার কিছু মনে হ’ত না। আর নিজের সম্বন্ধে ভাল-ভাল কথা ব’লে নিজের সুখ্যাতি বিস্তার করা যায়। কিন্তু সত্য কথায় যে মঙ্গল হয়—তার মুল্য অনেক-অনেক বেশি।

যে কপট সে ধরা পড়বেই পড়বে । নিজের কাছে ধরা তো পড়েই। অন্যের কাছেও শীঘ্রই ধরা পড়ে। ঠাকুর বলেছেন—

 “উষানিশায় মন্ত্রসাধন 
                        চলাফেরায় জপ
 যথাসময় ইষ্টনিদেশ
                        মূর্ত করাই তপ।” 

আমি ঠাকুরের দীক্ষা গ্রহণ করেছি, কিন্তু উষানিশায় মন্ত্রসাধন করি না। কেন করি না?—না, আমার ঠিকমত বিশ্বাস নেই আর যখন তাঁর প্রতি অবিশ্বাস তখন আর-আর সবার প্রতিই অবিশ্বাস আসে, তখনই কপটতা এসে স্থান নেয়। কপট ব্যক্তির উন্নতির দ্বার রুদ্ধ। তখন সে (যে কপট) মনে ভাবে এক, করে আর এক। যার মন-মুখ এক তার পথ পেয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। …. সাধুসম্তদের কাছে সর্বদা সত্যকথা বলতে হয়, তার ফলে যে কি অমূল্য সম্পদ লাভ করতে পারি সে-কথা কে বোঝে?

[ ইষ্ট-প্রসঙ্গে/তাং-১/১২/৭৫ ইং]

[প্রসঙ্গঃ সত্যানুসরণ পৃষ্ঠা ২৯, ৩০]