কপট হ’য়ো না… ঠকিও না। – ব্যাখ্যা

সত্যানুসরণ -এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

কপট হ’য়ো না, নিজে ঠ’ক না, আর অপরকে ঠকিও না।

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

প্রশ্ন উঠল—কিভাবে কপট নিজেকে ঠকায় এবং অপরকেও ঠকায়?

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—ঐ যে বললাম, একজন হরিকথা শুনছে (বাহ্যত) কিন্তু প্রকৃতপক্ষে শুনছে না কিছুই। মন পড়ে আছে অন্য জায়গায়। এ-তো নিজেকে ঠকানোর ব্যাপার । আবার ধর, আমরা অনেকে প্রার্থনা করি। কিন্তু প্রার্থনায় যা’ বলি তা’ কি মনে-মনে চিন্তা করি? ঠিক-ঠিক প্রার্থনা করলে ফল পাওয়া যায়ই। প্রার্থনা করি, মুখে মন্ত্র বলি, কিন্তু মন বিশ্বদুনিয়া সম্বন্ধে চিন্তা করছে। ফলে যে ফল পাওয়ার কথা তা’ পাই না।

প্রশ্ন—অপরকে ঠকানো হয় কিভাবে?

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—আমি নিজেকে ঠকালাম তো! আসল প্রাপ্তি থেকে ঠকে যাচ্ছি। আমি সে-রকম পেলাম না, আমি তা’ হলাম না। ফলে আমার থেকে অন্যেরা যা’ পাবার তা’ পাচ্ছে না; আমার কাছ থেকে যা’ পেত তা’ না পেয়ে তারা ঠকে যাচ্ছে।

প্রশ্ন—কপট হওয়ার সঙ্গে দৈহিক বিধানের পরিবর্তন হওয়া কি সম্ভব?

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—আমাদের শরীর কতকগুলো cell (কোষ) দিয়ে তৈরি। যেমন ভাববে, চিন্তা করবে, cell-গুলিও সেভাবে গঠিত হবে।

কথাপ্রসঙ্গে মনের চিন্তার সাথে বাইরে জগতের ঘটনার কি প্রভাব সে’ সম্পর্কে এবার শ্রীশ্রীপিতৃদেব বললেন—এক ঘটনা বলি, প্রায় বিশ বছর আগে—দেওঘরেরই ঘটনা। চান করার আগে তেল মাখতে বসেছি। একজন একটা কাঁকড়াবিছে ধরেছিল। কালো, বেশ বড় কাঁকড়া বিছে—বয়সও খুব বেশিই হবে। আমাকে দেখাতে নিয়ে এসেছিল সুতোয় ঝুলিয়ে—হুলে সুতো বাঁধা। আমি ওটা হাতে নিয়ে উরুর ওপর ছেড়ে দিলাম। (আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে) ওটা এদিক-ওদিক ঘুরতে লাগল। কিছুক্ষণ পর সুতো টেনে উঠিয়ে ওটা যে নিয়ে এসেছিল তাকে ফিরিয়ে দিলাম বিরাট বিছে, ভীষণ বিষাক্ত। আমায় কিন্তু ও কিছুই করল না। লোকে ভাবতে পারে বড়দার বড় সাহস, যাদু জানে! আসলে তা’ নয়। আমার কোন দ্রোহভাব ছিল না এ বিছার ওপর। তাই আমার ওপর তারও কোন দ্রোহভাব নেই।

আর এক ঘটনার কথা বলি—আমার বয়স তখন এগারো-বার বছর। আমার একবার একটা গরু পোষার খুব ইচ্ছা হ’ল। আমাদের বাড়িতে তখন রমজান নামে এক চাকর ছিল। কালো রঙের সুন্দর স্বাস্থ্যবতী গরু মাত্র ৩০ টাকায় বিক্রী হচ্ছে—আমাকে সে জানাতেই আমি ঠাকুমার কাছে ছুটে গেলাম। সকালবেলা । ঠাকুমা বারান্দায় চৌকির ওপর ছিলেন—ঠাকুরও কাছেই বসেছিলেন। আমার কথা শুনে ঠাকুমা একটু ইতস্ততঃ করছেন দেখে ঠাকুর বললেন, দে না, ও বলছে—কিনে দে। ঠাকুর জীবজন্তু বরাবর ভালবাসতেন । আমার মনে আছে—যখন আরও ছোট ছিলাম, ৫ বছর বয়স তখন আমাদের বাড়িতে একটা কুকুর ছিল। ঠাকুরের সঙ্গে আমিও তাকে আদর করতাম। যাই হোক, ঠাকুমা গরুটা আমায় কিনে দিলেন। সত্যি-সত্যিই গরুটা সুন্দর, স্বাস্থ্যবতী, কালো কুচকুচে রঙ। দ্বিতীয় বা তৃতীয় বিয়ান হবে। গরুটা দেখতে খুবই ভাল কিন্তু তার বিশেষ দোষ হচ্ছে, ভীষণ গুঁতোয় । কেউ তাকে খাওয়াতে পারে না। যে যায় তাকেই গুঁতোয়। রমজান খেতে দিতে গেলে তাকেও গুঁতোয়। কিন্তু আমি খাওয়াতে গেলে সে চুপচাপ থাকে। গা শুঁকে, গায়ে গা দেয়। আমিও তার গায়ে হাত বুলাই। আমার মনে হয়, আমি অন্তর থেকেই তাকে ভালবাসতাম, সে’জন্য সে-ও আমাকে প্রথম থেকেই ভালবাসত। ভালবাসায় সবাই বশীভূত হয়।

[ ইষ্ট-প্রসঙ্গে/তাং-৬/১২/৭৫ ইং]

[প্রসঙ্গঃ সত্যানুসরণ পৃষ্ঠা ৩৩, ৩৪]