ভগবান্ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেব..কামিনী-কাঞ্চন….তফাৎ থাক। – ব্যাখ্যা

সত্যানুসরণ -এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

ভগবান্ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেব সবাইকে বিশেষ ক’রে বলেছেন, কামিনী-কাঞ্চন থেকে তফাৎ—তফাৎ— খুব তফাৎ থাক।

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

শ্রীকন্ঠদা প্রশ্ন তুললেন—তফাৎ মানে?

গুরুকিংকরদা—কামিনী-কাঞ্চন থেকে দূরে থাকা।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—কামিনী-কাঞ্চন থেকে দুঃখ কিভাবে আসে আলোচনা করা যাক্‌। লোকে তো ভাবে টাকা-পয়সা না হ’লে সুখই হয় না।

গুরুকিংকরদা—টাকা-পয়সায় ইন্দ্রিয় চরিতার্থ হয়।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—টাকা-পয়সা, কামিনীতে ইন্দ্রিয় চরিতার্থ তো হয়ে থাকেই। ইন্দ্রিয়াদির দ্বারাই শরীর পরিচালিত হচ্ছে। ইন্দ্রিয়ের রাজা মন। টাকা-পয়সা নিজের সুখের জন্য ব্যয় করব, ইন্দ্রিয় চরিতার্থ করব—সেইটাই লোকে সুখ ভাবে। কিন্তু শরীরের তো একটা ধর্ম আছে। এই ইন্দ্রিয়গুলিকে পরমপিতা সৃষ্টি করেছেন কি জন্য?—উপভোগ করার জন্যই তো। কিন্তু ক্রমাগতই ইন্দ্রিয় দ্বারা পরিচালিত হলে শেষপর্যন্ত ক্ষমতাগুলি লোপ পেয়ে যায়, fine sensitiveness (সূক্ষ্মানুভূতি) লোপ পায়। প্রবৃত্তিপরায়ণতার মাধ্যমে ইন্দ্রিয়-তৃত্তি হচ্ছে, আনন্দ হচ্ছে ভাবছি, কিন্তু উপভোগ করার ক্ষমতাই লোপ পেয়ে যাচ্ছে; তাই এ-থেকে সাবধান হওয়ার কথা বলা হচ্ছে।

লোকে বিয়ে করে। ছেলেপিলে হয়। ছেলেপিলে হ’লে কি হবে? যদি ইস্টের প্রতি ব্যাকুলতা থাকে, স্ত্রীর প্রতি যতই টান থাক না কেন স্বামী-স্ত্রী উভয়েই উচ্চে উঠে যায়। আবার ছেলেপিলে বেশী হ’লেই সে কামাচারী হবে তা’ও না। আমাদের দেশে শাস্ত্রে বিধান আছে, এমন এক সময় আছে যখন স্বামী-স্ত্রীতে উপগত না হ’লেই মহাপাপ। ‘পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভার্যা’। ইতর প্রাণীর মধ্যে প্রকৃতিই এ জিনিসটা ঠিক করে দিয়েছে। ঠিক সময়ে তারা মিলিত হয়। মানুষকে পরমপিতা এত স্বাধীনতা দিয়েছেন কেন? ইচ্ছা করলে তুমি মঙ্গলের পথে যেতে পার। অধঃপাতেও যেতে পার। পরমপিতা চান তুমি তোমার ইন্দ্রিয়ের দাস হয়ো না।

যেটা লাভ করলে capital সবচেয়ে বেশী—যেটা পরম লাভ, সেটা বাদ দিয়ে ইন্দ্রিয় চরিতার্থ করার জন্য চরম ক্ষতি নিয়ে থাকলাম। এ-নিয়ে মজে আছি, ভাবছি বেশ আছি। কিন্তু এ-থেকেই যত গণ্ডগোল, যত অশাস্তি। স্বামী-স্ত্রীতে ঝগড়া, হৈ-চৈ—এটাই কি আনন্দের লক্ষণ? যারা শুধু নিঃস্বার্থভাবে করে তারাই আনন্দ পায়। ঠাকুর বলেছেন, ‘মানুষ আপন,টাকা পর’— আমরা ঠিক উল্টোটা করি। আমরা ভাবছি তোমার কম থাক, আমার বেশী হোক। একজন হয়তো টাকা চাইল, তার যা দরকার তুমি দিয়ে দিলে। আমি কাছে ছিলাম, বললাম—এত দিলে কি জন্য? তুমি তো কম বোকা না। তুমি তখন বললে—হ্যাঁ, আমি বোকাই। অনেকে দেওয়া সহ্যই করতে পারে না।

[ ইষ্ট-প্রসঙ্গে/তাং-২১-১১-৭৫ ইং]

[প্রসঙ্গঃ সত্যানুসরণ পৃষ্ঠা ১৪]