কামের মোহ…।-ব্যাখ্যা।

সত্যানুসরণ-এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

কামের মোহ—বাধায় ক্ষীণ, কামের অত্যাচারে বা যেরূপ চাওয়া যায় সেরূপ না পাইলে ঘৃণা, বিচ্ছেদে ভুল, মানুষকে কাপুরুষ ও মূঢ় করিয়া তোলে, ভোগেই তৃপ্তি ও বিষাদ, চিরদিন থাকে না—পরিবর্ত্তনীয়।

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

শ্ৰীশ্রীপিতৃদেব—দীপ সিং বল, কাম মানে কী?

দীপ সিং—কামনা, বাসনা।

—ক্ষীণ মানে কী?

—দুর্বল, রোগা।

—আত্মতৃপ্তি কাকে বলে?

নিজেই উত্তর দিলেন তিনি—যে ভোগ দ্বারা নিজের প্ৰবৃত্তি চরিতার্থ হয় তাকেই আত্মতৃপ্তি বলে। ব্যক্তিগত সুখশান্তির জন্য যা করা যায় তার উপর যে টান তা-ই মোহ। যে সুখ-শান্তি সকলের জন্য তা-ই মঙ্গলের।

“আত্মেন্দ্রিয় প্রীতি ইচ্ছা তারে বলে কাম।
কৃষ্ণেন্দ্রিয় প্রীতি ইচ্ছা ধ’রে প্রেমনাম ॥”

চতুর্দশ ইন্দ্রিয় আছে। যথা—চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, ত্বক্‌, বাক্‌, পাদ, পাণি, পায়ু, উপস্থ। আরও চারটি ইন্দ্রিয় আছে—মন, বুদ্ধি, চিত্ত, অহঙ্কার এদের সকলের (১৪টি ইন্দ্রিয়ের) রাজা মন। মন যা’ অর্ডার করে অন্যান্য ইন্দ্রিয়গুলি তা-ই পালন করে।

বালক-বালিকাদের যাতে মনে থাকে সেজন্য তিনি আবার ইন্দ্রিয়গুলির নাম বললেন এবং তাদের মুখ থেকে শুনতে চাইলেন। দীপ সিং-এর চতুর্দশ ইন্দ্রিয় মুখস্থ হওয়ার পর শ্রীশ্রীপিতৃদেব সুখেনকে জিজ্ঞাসা করলেন—মোহ মানে কী?

সুখেন—টান বা আকর্ষণ।

—ক্ষীণ মানে?

—দুর্বল।

একটা উদাহরণ দিয়ে বোঝাও ক্ষীণ বা দুর্বল কী রকম?

সুখেনের বলতে দেরী দেখে তিনি নিজেই বললেন—যেমন ঝর্ণার ক্ষীণ জলধারা প্রবাহিত হচ্ছে। তাকে যদি কোন কিছু দিয়ে আটকে দেওয়া যায় তাহলে তা’ আরও ধীর হ’য়ে আসে। ধারা আরও দুর্বল হ’তে থাকে। আর যদি জলধারা প্রবল হয়, তখন বাধা মানে না। বাধাকে ঠেলে চলে যায়। আর অত্যাচারে ঘৃণা কী-রকম? মনে কর, তোমায় আমি ভালবাসি কিছু পাব বলে, তোমার উপর আমার প্রকৃত ভালবাসা নেই, মোহ আছে, সেখানে কী হয়? তোমার জন্য সামান্য কষ্টও স্বীকার করতে রাজী থাকি না। ধর, একদিন তুমি আমার বাড়ী এলে, আমার মানিব্যাগে টাকা আছে দেখে এ টাকায় কলম কেনার ইচ্ছায়, না ব’লে তুমি তা’ নিয়ে গেলে। কিংবা আমার বিছানা থেকে বালিশটা নিয়ে গেলে তোমার বাড়ীতে, আমার অসুবিধা সৃষ্টি হ’ল, তখন তোমার উপরে আমার ঘৃণা আসবে, আমি বলব—সুখেনের অত্যাচার আর সহ্য করা যায় না—অসহ্য ইত্যাদি। এবারে দীপ্তী বল—’বিচ্ছেদে ভুল’ কী?

দীপ্তি—বিচ্ছেদ মানে বিবাদ।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—বিচ্ছেদ মানে ছাড়াছাড়ি। তাহলে বিচ্ছেদে ভুল কী-রকম? তোমার সঙ্গে এখন আমার ভাব আছে, দু’দিন পর তুমি যেই দূরে চ’লে গেলে, কিছুদিনের মধ্যে তোমাকে একেবারে ভুলে গেলাম। আমি এখানেই থাকলাম। আরেকজনের সঙ্গে আমার ভাব হ’ল। তোমার সঙ্গে কোন যোগাযোগ রাখলাম না, তোমায় একদম ভুলে গেলাম। নিজের স্বার্থের জন্য যদি ভালবাসা হয় তাহলে এরকমই হয়—কিছুদিনের অদর্শনেই ছাড়াছাড়ি হ’য়ে যায়। নিজের ইন্দ্রিয় চরিতার্থের জন্য যে-টান যে- ভালবাসা তাতে এমন হ’তে পারে। এর ফলে মানুষ কাপুরুষ ও মূঢ় হয়। কাপুরুষ মানে ভীরু, সাহস থাকে না, চোখে উজ্জ্বলতা থাকে না, ভয় পায়, চোখের দিকে তাকালেই মুখ ফিরিয়ে নেয়, মুখ ফুটে কিছু বলতে পারে না। আর মূঢ় মানে নির্বোধ।

“ভোগেই তৃপ্তি ও বিষাদ” মানে?—মনে কর, তোমার রসগোল্লা খাওয়ার খুব লোভ। মিনতি খাওয়াল—তুমি পেট ভরে খেলে, আর খেতে পারবে কী?—পারবে না। তার মানে রসগোল্লা খেয়ে তৃপ্তি হয়েছে, আরও যদি খাও বদহজম হ’বে, চোঁয়া ঢেকুর উঠবে তখন বিষাদ আসবে। মেয়েরা সকলে বুঝেছো তো?

মেয়েরা—আজ্ঞে।

ছেলেদের জিজ্ঞাসা করায় তারাও সম্মতি জানাল।

[ ইষ্ট-প্রসঙ্গে/তাং-২১/১০/৭৬ ইং]

[প্রসঙ্গঃ সত্যানুসরণ পৃষ্ঠা ২৮৭-২৮৮]