কাৰ্য্যকুশলের চিহ্ন ….. নহে।-ব্যাখ্যা

সত্যানুসরণ-এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

কাৰ্য্যকুশলের চিহ্ন দুঃখের প্রলাপ নহে।

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

শ্রীশ্রীপিতৃদেব দীপদ্যোতককে আলোচনা করতে বললেন।

দীপদ্যোতক বাণীটি পুনরায় একবার পাঠ করে বলল—যে সুন্দর ভাবে এবং তাড়াতাড়ি কাজ সমাধা করতে পারে সে কার্যকুশল।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—আর প্রলাপ মানে?

দীপদ্যোতক—বাজে কথা।

—মানে অর্থহীন উক্তি। সবটা বুঝিয়ে বল।

দীপদ্যোতক—কার্যকুশল হলে সে দুঃখের প্রলাপ বলে বেড়াবে না।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—উদাহরণ দাও।

দীপদ্যোতক একটা জামা সেলাই এর উদাহরণ দিতে যাচ্ছিল, কিন্তু পরিষ্কার হল না।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—একটা জামা দিয়ে তোমার বাবা সেলাই করে রাখতে বললেন। তুমি ঠিক সময়ে সেলাই করে রেখেছ। দেখতে সুন্দরও হয়েছে। জামাটি তোমার বাবার হাতে দিয়ে বললে—সেলাই করতে কী কষ্ট! সুতো নেই, ছুঁচ ছিল না, ওদের বাড়ী থেকে নিয়ে এলাম, অনেক খোঁজার পর মা-র কাছে সুতো পেলাম। নানা ফিরিস্তি দিলে। কিন্তু জামাটা বেশ ধৈর্য দিয়েই করেছ। ঠাকুর বলছেন, তা সত্ত্বেও একে কার্যকুশল বলা যাবে না।

আমি একজনকে বললাম ৭/৮ জন ছেলেপেলে নিয়ে পাটনা চলে যাস্‌। ও যশিডি ট্রেন ধরতে গেল টাঙ্গায় করে। সঙ্গে দু-একজন ট্রেনে তুলে দিতে গেল, তারা বলল—এত ভিড়ে কি যাওয়া যায়? ও কিন্তু সবাইকে নিয়ে গেছে, অনেক অসুবিধা face করেছে, overcomeও করেছে। কিন্তু অত বেশী কথাবার্তা নাই, কষ্টের কথা বারে বারে বলে না। এই হল কার্যকুশলের চিহ্ন। আবার আমায় হয়ত একদিন ট্রেন ধরে যেতে বলা হল। আমি সকলকে নিয়ে গেলাম ঠিকই। কিন্তু একটা মোট ফেলে গেলাম; পকেটে ৫ টাকা ছিল, কোথায় পড়ে গেল খেয়াল নেই। এই রকম হলেও হবে না।

এরপর শ্রীশ্রীবড়মার জীবনের একটি ঘটনা তুলে ধরলেন পিতৃদেব।—একদিন পরমদয়াল শ্রীশ্রীঠাকুর ভোগে বসেছেন। মা বিভিন্ন ব্যঞ্জন সহ ভাত পরিবেশন করেছেন। আসনে বসে ঠাকুর বললেন—বড়বৌ! ঘিভাত খেতে ইচ্ছে করছে। মা সঙ্গে সঙ্গে বললেন—এনে দিচ্ছি।—উনুনে পাত্র চাপিয়ে মা ঘি, তেজপাতা, লবঙ্গ, হলুদ দিয়ে সুস্বাদু ঘি-ভাত তৈরী করলেন। সেই ঘি-ভাত পরমদয়াল শ্রীশ্রীঠাকুর পরমাগ্রহে খেলেন। কার্যকুশল ব’লে negative ভাবটা মার একদম মনে এল না। তিনি ঠাকুরকে সময়মত তৈরী করে দিতেও পারলেন।

ঠাকুর হয়ত আমায় বললেন—যা’ ২৫টা টাকা নিয়ে আয় দেখি। ১ ঘন্টার মধ্যে চাই। আমি ভাবছি—এত শিগগির হবে কি করে? ঠাকুরকে বললাম, ঠাকুর কেউ স্নান করছে, কেউ খেতে যাচ্ছে, এখন হবে কি করে, ব’লে মাথা চুলকাতে লাগলাম। ঠাকুর তখন সামনে যে ছিল, তাকেই বললেন—এই একে দুটো টাকা দিতে পারবি? সে তৎক্ষণাৎ পকেট থেকে দুটো টাকা বের করে দিল। তারপর ঠাকুর বললেন, যা বেরিয়ে পড়। এইভাবে শুরু করে দিতেন। যে negative ভাব পোষণ করত তাকে হাতে-হাতে করিয়ে ছাড়তেন। ঠাকুরের উপর বিশ্বাস করে যে করত সে-ই সফল হ’ত।

‘একটা ঘটনা বলি’ বলে, শ্রীশ্রীপিতদেব বলতে শুরু করলেন—

পরম দয়াল শ্রীশ্রীঠাকুর তখন গঙ্গার এপারে ঘুসুড়িতে অসীম দত্তের বাড়ীতে অবস্থান করছেন। কেষ্ট-কাকার (ঋত্বিগাচার্য কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য) সাথে অসীম দত্তের Friendship (ঘনিষ্টতা)। কেষ্টকাকাই ব্যবস্থা করেছিলেন ঐ বাড়িতে ওঠার। তেতলা বাড়ী—ঠাকুর ছিলেন দোতলায়। ঠাকুরের সাথে অনেকেই ছিলেন মায়ামাসীমা, দুর্গামাসীমা ইত্যাদি অনেকে। আমিও ছিলাম। ভক্তরা রকমারি সামগ্রী নিয়ে আসত ঠাকুর ভোগের জন্য। একদিনের ঘটনা। রাত তখন দশটা সাড়ে দশটা হবে। ঠাকুর স্মরজিৎদাকে (ঘোষ) বললেন, কলকাতা থেকে ভাল সন্দেশ নিয়ে আসতে। ঠাকুরের আদেশ পেয়েই স্মরজিৎদা ready (প্রস্তুত) । আমাদেরই কে যেন জিজ্ঞাসা করলেন—এত রাতে পাবেন? স্মরজিৎদা উত্তর করলেন—ঠাকুর যখন আদেশ করেছেন নিশ্চয়ই পাব।—বলেই তিনি বেরিয়ে পড়লেন। তখন হাওড়ার ব্রীজ হয়নি। ভাসা পুল থাকত—তাই দিয়ে যাত্রী যাতায়াত হ’ত। যাই হোক, স্মরজিৎদা গঙ্গা পার হ’য়ে গেলেন কলকাতা । গিয়ে দেখেন বাজারে একটা দোকানই খোলা—গাঙ্গুরামের না কার দোকান যেন। উৎকৃষ্ট মিষ্টির দোকান। তারপর ঐ দোকান থেকে উৎকৃষ্ট সন্দেশ কিনে নিয়ে এলেন স্মরজিৎদা।

সকলে মুগ্ধ দৃষ্টিতে শ্রীশ্রীপিতৃদেবের পানে তাকিয়ে শুনতে থাকেন পরমদয়ালের দিব্য জীবনের ঘটনাবলী। শ্রীশ্রীপিতৃদেব পুনরায় বললেন—কুশল যে সে যত অসুবিধাই আসুক face করে—বাধাকে স্বাগত জানায়। তার সঙ্গে যারা থাকে তারা তা enjoy করে (উপভোগ করে)। আর যারা দুঃখের প্রলাপ বকে তার সঙ্গের লোকেরা অস্বস্তি বোধ করে।

কুশল হ’তে হলে দু’ সাইডই কভার করতে হয়। দুঃখের কথা কাজের আগেও বলবে না, পরেও বলবে না।

[ইষ্ট-প্রসঙ্গে/তারিখ-৩০/৬/৭৭ ইং]

[প্রসঙ্গঃ সত্যানুসরণ পৃষ্ঠা ১৭৮-১৭৯]