জ্ঞানাভিমান জ্ঞানের … নয়।- ব্যাখ্যা

সত্যানুসরণ -এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

জ্ঞানাভিমান জ্ঞানের যত অন্তরায় আর কোন রিপু তত নয়।

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

শ্রীশ্রীপিতৃদেব প্রীতিকণাকে বাণীর অর্থ করতে বললেন।

প্রীতিকণার আলোচনা পরিষ্কার না হওয়ায় শ্রীশ্রীপিতৃদেব শংকরদাকে (রায়) আলোচনা করার নির্দেশ দিলেন।

শংকরদা—আমি জানি, এর ফলেই অহঙ্কারের সৃষ্টি।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—আমি জানি গ্রীষ্মকালে গরম পড়ে, শীতকালে ঠাণ্ডা পড়ে, এটা জানা অন্যায় নাকি?

শংকরদা—আজ্ঞে না। আমি বেশি জানি বলেই অহংকার আসছে।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—তা কেন হবে? জ্ঞানাভিমান কি করে হল? বেশি জানা অন্যায় কি করে? আগে পাঠশালায়, তারপর স্কুলে, তারপর কলেজে পড়তে হয়—এটা জানা অন্যায় নাকি? আমেরিকায় সেভেন্থ্‌ ফ্লীট আছে, চালু করতে এত তেল লাগে, এত লোক লাগে—এটা জানা অন্যায় নাকি? জানলে দোষ কোথায়?

শংকরদা—জানার সঙ্গে অহংকার থাকলে দোষের।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—জানার সঙ্গে অহংকার কি করে হয় সেটা বলতে হবে।

শংকরদা—আমি পি-এইচ-ডি, আমি খুব শিক্ষিত, এজন্য অহংকার।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—আমি থিসিস সাবমিট করেছি, এতজন এগজামিনার ছিল, এতদিন পরিশ্রম করে পি-এইচ-ডি করেছি। এতে ভুল কোথায়? এতগুলো আছে, কোনটাকে ডেকে নিয়ে এলে অহংকার আসে?

শংকরদা—আমি যা জানি আর কেউ জানে না।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—সেটাই-ই তো বলবি। আমি বেশি জানি। এর বেশি-জানা কেউ দেওঘরে আছে নাকি? এইভাব পোষণ করে আমি আটকা পড়লাম । আর কারও কাছ থেকে আমি কিছু নিতে পারব না। জ্ঞানের অভিমান থাকায় জানার জন্য মনকে উন্মুখ রাখতে পারি না। আমি অনেক জানি, অনেক জ্ঞান আমার, তাই কারও কাছ থেকে কিছু শিখতে পারি না।

এরপর শ্রীশ্রীপিতৃদেব এক কাহিনী ব্যক্ত করলেন—একবার এক বড় পণ্ডিত নদী পার হচ্ছে। তার অনেক জ্ঞান। জ্ঞানের বড়াইও তার খুব। ভাবছে আমার মত জানে আর কে আছে? নৌকায় চেপে সে মাঝিকে তার বিদ্যার কিছু পরিচয় দিচ্ছে। পৃথিবী কত বড়, সূর্য কত বড়, পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে কেন ঘুরছে, পৃথিবীর গতিবেগ কত, সূর্যগ্রহণ চন্দ্রগ্রহণ কেন হয় ইত্যাদি। পণ্ডিত জিজ্ঞাসা করল মাঝিকে, এ-সব সে জানে কি-না । মাঝি বলল, এসব সে জানে না। মাঝি এসব কিছুই জানে না তা নিয়ে ঐ পণ্ডিত উপহাস করতে লাগল—মাঝির জীবনটা ফাঁকিতে ভরা। মাঝি সত্যি-সত্যি এসব জানে না,, অকপটে সে স্বীকার করল। পণ্ডিতের পরিহাসের মধ্য দিয়ে নৌকা তখন মাঝনদীতে পৌঁছে গেছে। আকাশে মেঘ দেখা দিয়েছে এক কোণে। ক্রমশ সেই মেঘ আকাশকে গ্রাস করছে। সেই পণ্ডিত তা দেখে জিজ্ঞাসা করল—এ কি মেঘ? মাঝি নৌকো চালিয়ে যেতে যেতে এই মেঘ কখনো কখনো দেখেছে। মাঝি বলল—বাবু, এ কিন্তু বৃষ্টির মেঘ নয়, প্রবল ঝড়ের সংকেত। অত্যল্পকালের মধ্যেই ঝড় উঠল। নৌকো ডোবার উপক্রম দেখা দিয়েছে। পণ্ডিত খুব বিপন্ন বোধ করতে লাগল । মাঝি জিজ্ঞাসা করল—’আপনি সাঁতার জানেন তো?’— ‘না, তা-তো জানি না।’—পণ্ডিতের এই উত্তর পেয়ে মাঝি বলল—’এত বিদ্যা আপনার, কিন্তু আপনার জীবন তো যোল আনাই ফাঁকি হতে চলেছে।’ নৌকাডুবি হল। মাঝি সাঁতার কেটে ডাঙ্গায় পৌঁছে গেল, সেই পণ্ডিতমশায়ের সলিল সমাধি হল।

আমাদের মধ্যেও অনেকের এরকম ভাব থাকতে পারে। হয়ত আশ্রমের বিভিন্ন দ্রষ্টব্য দেখাতে দেখাতে কোনও ভিজিটারকে বলছে—এরকম পরিকল্পনা আমারও ছিল। সেই ভিজিটারও অহংকারের গন্ধ পায়, তাই তার যাজনে তেমন কাজও হয় না। আবার এমন লোকও আছে, জ্ঞানী গুণী হয়েও সকলের সাথে অকপটে নিরহংকার হয়ে মিশতে পারে। সতুদাকে (সান্যাল) দেখেছি, কোথাও কোনো জ্ঞানী-গুণী এসেছে শুনলেই পায়ে হেঁটে চলে যেতেন। কারও মধ্যে কোনও সদগুণ দেখলেই সে টাঙ্গাওয়ালা বা কুলি-মজুর যা-ই হোক তার কাছে চলে যেতেন। কোনও জ্ঞানাভিমান নেই তাঁর। তাছাড়া তথাকথিত ধর্মজগতের লোককে সে যতই সঙ্গ করার বড়াই করুক গ্রাহ্যের মধ্যে আনতেন না। অনেক অহংকারী আছে আগে জেনে নেয় কতদূর লেখাপড়া শিখেছে। যার ডিগ্রী কম তাকে ছোট চোখে দেখতে থাকে। মানুষের জ্ঞান লাভের অনন্ত দিক। স্কুল কলেজের ডিগ্রী ছাড়াও জানার কত বিষয়, কত দিক! এই যে সুরেন লেখাপড়া জানে না, কিন্তু খেজুর গাছের রস কিভাবে সংগ্রহ করতে হয়, কিভাবে গাছ কামাতে হয়, কিভাবে হাঁড়ি বাঁধতে হয়, রস কেমন করে রাখতে হয় এসব জানে। অনন্ত জ্ঞানভাণ্ডারের তুলনায় মানুষ কত ক্ষুদ্র! কত ক্ষুদ্ৰ তার জ্ঞানের পরিধি! ঘাসের আগায় শিশির-বিন্দু দেখা যায়, তা দিয়ে সূর্যের প্রতিচ্ছবি দেখা যায়, সারা জগৎ দেখা যায়। তাই, হৃদয় বিস্তারের কতরকম উপায় রয়েছে। ঐ পণ্ডিত নদী পেরোতে পেরোতে মাঝিকে হেয় করার চেষ্টা করল। আবার অনেক পণ্ডিত আছে মাঝির কাছ থেকে অনেক জিনিস জানার চেষ্টা করবে,—সে এসব জানে না অকপটে নিজের দৈন্য প্রকাশ করবে। তারাই পরমপিতার করুণা লাভ করে থাকে।

পন্ডিতদা— রত্নেশ্বর শর্মাদার কাছে একবার নৌকোয় করে নদী পার হওয়ার কাহিনী শুনেছিলাম। রত্নেশ্বরদা বাংলাদেশের এক নদী পার হচ্ছেন। নৌকো ভর্তি যাত্রী—শিশু, যুবক-যুবতী, প্রৌঢ়-প্রৌঢ়া, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা নানান বয়সের নরনারী। নৌকোর চালক এক বৃদ্ধ মাঝি। মাঝনদীতে যেতেই উঠল কালবৈশাখীর প্রবল ঝড়। ঝড়ের মুখোমুখি হয়ে নৌকো কাৎ হয়ে পড়েছে। এই বুঝি যাত্রীসমেত নৌকো ডুবে যাবে নদীগর্ভে। যাত্রীদের ত্রাহি ত্রাহি আর্তনাদ শুরু হল। রত্নেশ্বরদা অবিরাম ঠাকুরকে স্মরণ করে চলেছেন। মাঝিও সাধ্যমত চেষ্টা করে চলেছে। রক্ষা পাবে সে ভাবতে পারছে না। কারণ সে তো নিজের ক্ষমতা জানে। প্রচণ্ড আশংকার মধ্যে শেষপর্যন্ত নৌকো অপরপারে পৌঁছাল। মাঝি বার বার বলতে লাগল, এই নৌকোয় নিশ্চয়ই কোনো গুণী ছিল যার জন্য প্রবল ঝড়ের মুখে পড়েও নৌকো রক্ষা পেয়ে গেল। মাঝি বলল—গুণী থাকলে কিভাবে সাক্ষাৎ মৃত্যুর হাত থেকে এতগুলি লোক রক্ষা পায় এক অভিজ্ঞতা লাভ করলাম।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—সাধারণ লোকদের মধ্যে যেমন আছে, পণ্ডিত লোকদের মধ্যেও কত বিনয়ী আছে। দেখে বোঝাই যায় না এত বিদ্বান!

[ইষ্ট-প্রসঙ্গে/তাং-৩০/৩/৭৮ইং ]

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—কৃতিদীপ্তকে (বিশ্বাস) জিজ্ঞাসা করলেন—জ্ঞানাভিমান কি রে? জ্ঞানাভিমান মানে কি?

কৃতিদীপ্ত—জ্ঞানের যে অভিমান।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—সেটা কি?

—আমি খুব জ্ঞানী এই ভাব।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—অন্তরায় মানে কি?

—বাধা।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—এবার সুরদীপকে (চ্যাটার্জী) আলোচনা করার নির্দেশ দিলেন।

সুরদীপ—আমি জানি এই ভাবটা আমার জ্ঞানলাভের পথে বাধার সৃষ্টি করে।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—রিপু মানে কি?

সুরদীপ—কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ ইত্যাদি।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—রিপু কেন?

সুরদীপ—ক্ষতি করে তাই। জীবনবৃদ্ধির পথে বাধার সৃষ্টি করে, তাই ঠাকুর বলেছেন—জ্ঞানাভিমান জ্ঞানের যত অন্তরায় অন্য কোন রিপু তত নয়।

[ পিতৃদেবের চরণপ্রান্তে/তাং- ২২-৫-৭৯ ইং]

[প্রসঙ্গঃ সত্যানুসরণ পৃষ্ঠা ৪৭, ৪৮]