তাঁকে দাও …. হ’য়ো।-ব্যাখ্যা

সত্যানুসরণ-এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

তাঁকে দাও—চেও না—পেলে আনন্দিত হ’য়ো।

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

শ্রীশ্রীপিতৃদেব বিজনকে (মণ্ডল) আলোচনা করতে আদেশ করলেন।

বিজন—এখানে তাঁকে মানে ইষ্টকে। সবসময় ইষ্টকে দিতে চেষ্টা করব।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—দেওয়াটা কেমন? দোকানদারকে টাকা মেটাই। এই দেওয়াটা কেমন? কখন দিই?

বিজয়—জিনিস কিনতে গিয়ে দোকানদারকে দিই। কোন জিনিসের পরিবর্তে।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—তাহলে দোকানদারকে দিচ্ছি কোন বস্তু বা জিনিসের বিনিময়ে। ইষ্টকেও কি কোন জিনিসের বিনিময়ে দেব?

বিজন—আজ্ঞে না।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—তাহলে বল নিঃস্বার্থভাবে দেব। ঠাকুরের জন্য দেব আমার যা সম্বল। কোন প্রত্যাশা না রেখে।

দাদাদের দিকে তাকিয়ে শ্রীশ্রীপিতৃদেব বললেন—বিজন তো ভাল বলেছে।

‘পেলে আনন্দিত হ’য়ো’ বাণীর এই অংশটি আলোচনা করতে গিয়ে শ্রীশ্রীপিতৃদেব বললেন—এক শ্রেণীর মানুব আছে যারা ঈশ্বর মানে, ভগবান মানে; তারা জানে তাঁর দয়াতেই চলছি, তাঁর দয়ায় বেঁচে-বর্তে আছি, স্বাভাবিকভাবে তাঁর উপর আনুগত্য। আর এক শ্রেণীর লোক ঠেকে গেলে মানে। তৃতীয় শ্রেণীর লোকেরা মানে না। সবাই জানে এরা মানে না। যারা মনে করে ঈশ্বরের দয়ায় আছি তারা সহজভাবেই ঈশ্বরের জন্য করে। তাঁর প্রীত্যর্থে নানারকম সামগ্রী নিবেদন করছি। প্রীত্যর্থে মানে তাঁর প্রীতির জন্য; এমন জিনিস নিবেদন করছি যাতে তিনি প্রীত হন। আবার লোকে গরীব-দুঃখীকে দান করে, দুঃস্থদের ফল পথ্যাদি দান করে। কোন আশা না করে দানকে নিঃস্বার্থ দান বলা হয়। আমরা ইষ্টের জন্য বা ঠাকুরের জন্য করে যাব। কোন আশা না রেখে দেব। তাঁর ভোগের জন্য অনেক জিনিস নিয়ে এসেছি—যেগুলো তাঁর ভোগে ব্যবহার করা যায়। একটা আপেল তিনি আমায় দিলেন। প্রসাদস্বরূপ পেলাম। সেইটুকুতেই আনন্দ। তাঁর জিনিস তাঁকে দিচ্ছি। তাঁর দয়াতেই তো পেয়েছি। তাই তাঁকে দিচ্ছি কোন প্রত্যাশা না রেখে। দেওয়াতে বাহাদুরিও নেই।

আমি একশ টাকা উপায় করছি। সতীশ হাজার টাকা করে। ভাববো তাঁর দয়ায় একশ টাকা পাচ্ছি। যদি ভাবি কেন হাজার টাকা পাচ্ছি না। তখন অশান্তি। এরকম না ভেবে আনন্দে থাকতে হয়। যা পাচ্ছি তাতেই সুখ, শান্তি । ভাবতে হবে এতো তাঁরই দান। জীবনবৃদ্ধিই ধর্ম। উদরপূর্তির জন্য ডাল, ভাত, আর লজ্জা নিবারণের জন্য বস্ত্র, আর একটা বাসস্থান এই তো চাই। কতলোক ডাল-ভাত-আলুসেদ্ধ খেয়ে কত শান্তিতে আছে। আর সতীশের উপার্জন বেশি, হয়ত পাঁচটা সব্জি দিয়ে খায়—তাতে কী হয়েছে? এমনও দেখা যায় পাঁচ-তরকারি দিয়ে খাচ্ছে, কিন্তু অশান্তি লেগে আছে। যা পায় তাতেই খুশি থাকলে সে বাড়িতে শান্তি বিরাজ করে। যে বাড়িতে শান্তি আছে আনন্দ আছে তা দেখেই আনন্দ। একবার গ্রীষ্মকালে তৃষ্ণার্ত হয়ে এক গৃহস্থ বাড়িতে এক গ্লাস জল চেয়েছিলাম। বাড়ির কত্রী দুটো বাতাসা দিয়ে আমায় জল দিয়েছিলেন—এখনও মনে আছে। সেই বাড়িতে ঢুকেই আমার আনন্দ হয়েছিল।

[ ইষ্ট-প্রসঙ্গে/তাং-৩০/১০/৭৬ ইং ]

শ্রীকন্ঠদা—’তাঁকে দাও’ মানে নিজেকেই দিতে হবে। তাঁকে খুশী করার জন্য—তন্‌, মন, ধন সব-ই দিতে হবে।

শ্রীশ্রীবড়দা—দেবো কি জন্যে?

শ্রীকন্ঠদা—তাঁকে খুশি করবার জন্য। যখন সবই হ’ল—আর চাইব কি?

শ্রীশ্রীবড়দা—আমার মন বলছে, তোমাকে সাধ্যমত সেবা করি—তুমি যখন কিছু দাও খুশী হই। কিন্তু প্রশ্ন হ’ল—চাইব না কেন? দেব-ই বা কেন? দিলে বা চাইলে কি হবে?

শ্রীকন্ঠদা—তাঁকে দেবার জন্যই তো আসা।

শ্রীশ্রীবড়দা—দেবার জন্য আসা, এটা যে বোঝে—তার তো হ’য়েই গেছে।

শ্রীকন্ঠদা—যদি কিছু করা না থাকে তবে চেয়ে পাব না—তাতে তো দুঃখ আসবে।

শ্রীশ্রীবড়দা—’দেবতা ভুলিলে, ধৰ্ম্ম ভুলিলে, দুঃখ আসিয়া ধরে।’ ‘দুঃখ আসিয়া ধরে’—কথাটা বুঝিয়ে বলতে হবে।

তারাপদ বিশ্বাস—তিনি তো দিয়েই রেখেছেন।

শ্রীশ্রীবড়দা—বুঝিয়ে দিতে হবে তো, আমি যখন বুঝলাম তখন আনন্দ। আমাদের অহং আছে। অহং থাকলে তা’ পরমপিতার দীন সেবক তাই। ‘আমি করি’—এই অহংকার ক’রে যখন করি, তখন অহংকারকে তুষ্ট করবার জন্য করি। ‘আমি তাঁর’—এই ভাব নিয়ে যখন করি, তখন কিছু চাইবার থাকে না। সর্বদা তাঁর সেবাতেই ব্যস্ত থাকতে হয়।

[‘যামিনীকান্ত রায়চৌধুরীর দিনলিপি/তাং-১৫/১২/৭৪ ইং]

[প্রসঙ্গঃ সত্যানুসরণ পৃষ্ঠা ২৯৭-২৯৮]