তুমি ভক্তিরূপ তেলে …ধ’রেছে।-ব্যাখ্যা

সত্যানুসরণ-এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

 তুমি ভক্তিরূপ তেলে জ্ঞানরূপ প’লতে ভিজিয়ে সত্যরূপ আলো জ্বালাও, দেখবে কত ফড়িং, কত পোকা, কত জানোয়ার, কত মানুষ তোমাকে কেমন ক’রে ঘিরে ধ’রেছে।

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

শ্রীশ্রীপিতৃদেব ধৃতিবল্লভকে আলোচনা করতে বললেন।

ধৃতিবল্লভ—ভক্তিরূপ মানে ভক্তি-শ্রদ্ধা দিয়ে, জ্ঞানরূপ পলতে ভিজিয়ে সত্যরূপ আলো . . . .

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—একটা-একটা বল। ভক্তি মানে?

—ভক্তি মানে অনুরাগ, শ্রদ্ধা।

—আর জ্ঞান মানে?

—জ্ঞান মানে অভিজ্ঞতা।

—তাহ’লে কী হবে? সবটা কী হবে?

ধৃতিবল্লভ কোন উত্তর দিতে না পারায় তিনি প্রদীপকে আলোচনার নির্দেশ দিলেন। প্রদীপকে নির্বাক থাকতে দেখে তিনি নীরদাসুন্দরীকে একই আদেশ করলেন। নীরদাসুন্দরী আর একবার বাণীটি পাঠ করল।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—কী আছে বাণীটায়? ভক্তি আগে, না জ্ঞান আগে?

নীরদাসুন্দরী—ভক্তি আগে।

—ভক্তি কিসের মত?

—তেলের মত।

—তাহ’লে গোটা বাণীতে কী আছে বল।

নীরদাসুন্দরী উত্তর দিতে না পারায় তিনি ঐ প্রশ্ন শুভাকে করলেন।

শুভা—এখানে ঠাকুর ভক্তির সাথে তেলের তুলনা করেছেন। ঠাকুর বলছেন, তোমার ভেতরে যদি ভক্তি না থাকে, তাহ’লে জ্ঞানও আসতে পারে না।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—তাহ’লে ভক্তি হ’লে জ্ঞানও থাকে?

—আজ্ঞে।

—তারপর কী?

—ভক্তি ও জ্ঞান দিয়ে ইষ্টের সেবা করতে হবে।

—হ্যাঁ। ভক্তি চর্চা করলে ক্রমে জ্ঞান হবে। তারপর জ্ঞান ও ভক্তি দিয়ে সত্যকে জানা যাবে—তাই তো?

—আজ্ঞে, হ্যাঁ।

—তখন কী হবে? তখন সেই সত্য দেখে ভাল-মন্দ কত মানুষ তোমার কাছে এগিয়ে আসবে। . . . তাহ’লে কী হ’ল—গুছায়ে বল।

শুভা—আমার যদি ভক্তি না থাকে তাহলে জ্ঞান অর্জন করতে পারব না। আর যখন ভক্তি জ্ঞান দুই-ই থাকে তখন সত্যরূপ আলো জ্বলে ওঠে।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—হ্যাঁ, ভক্তি যদি থাকে তাহ’লে তাঁর (ইষ্টের) সেবা করতে করতে জ্ঞান আসবে—ভক্তিরূপ তেলে জ্ঞানরূপ পলতে ভিজে যাবে। এ থেকে সত্যরূপ আলো জ্বলে উঠবে। পোকামাকড় যেমন আলো পেয়ে জমা হয়, তেমনি মানুষও আসে। কত মানুষ আসে সত্যের সন্ধানে—যাঁদের হৃদয়ে সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যাঁরা সত্যকে জেনেছেন—তাঁদের কাছে। অনুরাগের সঙ্গে তাঁর (ইষ্টের) সেবা করতে হয়। অনুরাগের সঙ্গে তাঁর সেবা করতে-করতে অভিজ্ঞতা হয়, তখন জ্ঞানও হয়। যত বেশি নিষ্ঠাসহকারে তাঁর সেবা করা যায়, জ্ঞানও তত নিখুঁত হয়। এই করতে-করতে অহঙ্কার দূরীভূত হয়, ইষ্ট আমার ভিতর উজ্জ্বল হ’য়ে ওঠেন। আমি তাঁর দীন সেবক—এই ভাব এসে যায়। তখন সত্য উদঘাটিত হয়। সত্য মানে ইষ্ট। তিনিই সত্য। তাই সত্যরূপ আলো জ্বালাও মানে ইষ্টের প্রকাশ হোক তোমার ভিতর। ইষ্টের প্রকাশ হ’লে কী হবে? তখনই অজ্ঞানতারূপ অন্ধকার দূরীভূত হবে। আলো জ্বললে যেমন অন্ধকার দূর হয়, তেমনি ইষ্ট অন্তরে জাগ্রত হ’লে অজ্ঞানতা চলে যায়। আলো জ্বাললে যেমন কত পোকা, কত জানোয়ার, কত মানুষ আসে,—তেমনি অন্তরে সত্য প্রকাশিত হ’লে, ইষ্ট প্রতিষ্ঠিত হ’লে, ভাল-মন্দ কত মানুষ ঘিরে ধরবে। বাণীটা কার জন্য?—আমার জন্য। তাই আমার ভিতর সত্য জ্বললে অর্থাৎ আমার ভিতর ইষ্ট প্রতিষ্ঠিত হ’লে আমাকে কেন্দ্র করেই কত মানুষ এগিয়ে আসবে। আর মানুষের মধ্যে সবসময় ভাল-মন্দ দুই-ই আছে।

[ ইষ্ট-প্রসঙ্গে/তাং-৮/৯/৭৬ ইং ]

শ্ৰীশ্রীপিতৃদেব পূর্ব কথার সূত্র ধ’রে বললেন—আমরা যাজন করি, কারও যাজন শুনতে খুব ইচ্ছা করে। আবার কেউ এমন যাজন করে যে তার যাজন ছেড়ে চলে আসতে মন চায়। কেউ শুধু ইষ্টের কথা বলছে, মনে হচ্ছে না যে, সে আমাকে উপদেশ দিচ্ছে। আবার কেউ হয়তো ঠাকুরের কথাই কইছে, ঠাকুরের বাণী পাঠ করছে, নিজের কথা কইছে না কিন্তু নিজেই উপদেষ্টার আসনে ব’সে এমনভাবে ঠাকুরের বাণীগুলি প্রকাশ করছে যেন আমিও ঠাকুর হয়ে গেছি।….. শুধু-শুধু তুমি যদি আমায় গীতার শ্লোক শোনাও আমার কি ভাল লাগে? …., সদগুরু লাভ করতে হ’লে সংস্কার চাই, কর্ম চাই। চাই জন্মজন্মান্তরের কর্মফল, জন্মজন্মান্তরের সুকৃতি।

শ্যামসুন্দর (রক্ষিত)—আজ্ঞে, এই বাণীতে ভক্তি রূপ তেলে জ্ঞানরূপ পলতে ভিজিয়ে সত্যরূপ আলো জ্বালার কথা বলা হয়েছে। তা’ ভক্তিরূপ তেলে জ্ঞানরূপ পলতে না ভিজিয়ে যদি জ্ঞানরূপ তেলে ভক্তিরূপ পলতে ভিজানোর কথা বলা হ’ত তাহ’লে কী হ’ত?

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—ইষ্টের প্রতি যত ভক্তি হবে তত জ্ঞান বাড়বে। তখন তোমার ভেতর সত্য ফুটে বেরুবে। তিনি জ্ঞানস্বরূপ, আনন্দস্বরূপ। তাই তাঁর প্রতি ভক্তিতে জ্ঞান আসে, আনন্দ আসে।

বিষয়টা পরিষ্কার করার জন্য তিনি আবার বললেন—শ্রদ্ধা থেকেই জ্ঞান আসে। ইস্কুলে গেলে তোমার শিক্ষকমশাইকে শ্রদ্ধা করতে হয়, তাঁর কথা মেনে চলতে হয়; তবেই তো তোমার জ্ঞান হয়, তোমার জানা হয়।

—আবার জানার পরও তো ভক্তি বাড়ে।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—হ্যাঁ। তা তো হয়। (একটু থেমে) ভক্তি যত বাড়তে থাকে ততই জ্ঞানের পলতে পাকা হয়। তখন মানুষ জ্বলে ওঠে। ঐ যে আগের বাণীতে আছে—তখন সত্য ফুটে ওঠে।

আলোচনা-প্রসঙ্গে এবার শ্রীশ্রীপিতৃদেব বললেন—যাদের সদগুরু লাভ হয়, তাদের ভক্তিমার্গের সাধনা করতে বলা হয়। এই হ’লেই তখন all round (পুরোপুরি) সাধনা হয়।

যেমন স্বামী নিগমানন্দ—অনেক রকমে সাধনা শেষ করে ভক্তিমার্গের সাধনা শুরু করেন। আর যখন প্রথম থেকেই কেউ ভক্তিমার্গের সাধনা করে তখন তার মধ্যে জ্ঞান, ভক্তি, বিবেক, বৈরাগ্য সব আসে।

হরিপদদা—পলতে ও তেল তো আলাদা। তাহ’লে ভক্তি থেকে জ্ঞান কী ক’রে আসে? তেল থেকে তো পলতে হয় না।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—পলতে আলাদা, তেল আলাদা—এ-ভাবে বোঝা যায় নাকি? সবই আলাদা, না-হ’লে সবই এক।…. ভক্তি যত বাড়তে থাকে জ্ঞানের পলতে তত পাকা হয়। এ-সব অনুভূতির ব্যাপার।

[ ইষ্ট-প্রসঙ্গে/তাং-১০/১১/৭৪ ইং ]

[প্রসঙ্গঃ সত্যানুসরণ পৃষ্ঠা ২৬২ – ২৬৪]