তুমি সত্যে বা …. নেই।-ব্যাখ্যা

সত্যানুসরণ-এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

তুমি সত্যে বা আদর্শে মুগ্ধ থাক, হৃদয়ে ভাব আপনিই উথলে উঠবে, আর সেই ভাবে অনুপ্রাণিত হ’য়ে কত লোকের যে উন্নতি হবে, তার কিনারা নেই।

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

শ্রীশ্রীপিতৃদেব সুবীরকে আলোচনা করার আদেশ দিলেন।

সুবীর—সত্যে বা আদর্শে মুগ্ধ থাকলে আমার মনে সেই ভাব আপনিই উথলে উঠবে—আপনিই প্রকাশিত হবে। তখন আমার দেখাদেখি বহুলোক উন্নত হবে।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—’সত্য বা আদর্শ’ কেন বলা হ’ল?

সুবীর—সত্য আর আদর্শ একই জিনিস।

সুবীরের কথায় সম্মতি জানিয়ে শ্রীশ্রীপিতৃদেব বললেন—হ্যাঁ, সত্যই আদর্শ, আদর্শই সত্য। মুগ্ধ মানে কী?

সুবীর—মুগ্ধ মানে মূঢ়, মূর্খ।

উত্তর ঠিক হ’ল না দেখে শ্রীশ্রীপিতৃদেব বললেন—এখানে কি তা-ই বলা হচ্ছে। একজন ভাল ফুটবল খেলোয়াড়কে দেখে তুমি মূঢ় বা মূর্খ হ’য়ে যাবে নাকি? মায়ের ঘরে (শ্রীশ্রীবড়মার ঘর নির্দেশ ক’রে) শ্রীকৃষ্ণের একটা ছবি আছে। ছবিতে যশোদা শ্রীকৃষ্ণের কান ম’লে দিচ্ছেন। শ্রীকৃষ্ণ ৮।৯ বছরের বালক। কিন্তু তাঁর এত রূপ, দেখে মুগ্ধ হ’য়ে যেতে হয়। শ্রীকৃষ্ণের ছবি দেখতে সবারই খুব ভাল লাগে। ঠাকুরেরও ঐরকম। ঠাকুরের রূপ দেখেও লোকে মুগ্ধ হ’য়ে যায়। ঠাকুরের আশ্রম দেখেও মুগ্ধ হয়। বহুলোক বাইরে থেকে এখানে এসে বলে—যেতে ইচ্ছে করছে না। পরিবেশটা এত হৃদয়গ্রাহী— শান্তি পাচ্ছি, আনন্দ পাচ্ছি; তাই যাবার ইচ্ছেই হ’চ্ছে না। এই যে সবাই মুগ্ধ হয়, তারা কি মূঢ়, তারা কি মূর্খ? … তাহ’লে ‘মুগ্ধ’ শব্দের অর্থ কী? মুগ্ধ শব্দের অর্থ মোহিত, নিবিষ্ট বা বিভোর হ’য়ে থাকা। ইষ্টের প্রতি টান বা অনুরাগ থাকলে, ভক্তি থাকলে যে ভাবের সৃষ্টি হয় এখানে তার কথা বলা হ’চ্ছে। আমার সেই ভাব থাকলে আমি আদর্শে মুগ্ধ আছি বলা যায়। তখন ভাব অনুযায়ী কর্ম হবে—চাল-চলন, আচার-আচরণ, কথাবার্তা সব সেরকম হবে। তখন আমার সংস্পর্শে এসে কতলোকের যে উন্নতি হবে তার সীমা-সংখ্যা নেই। উথ্‌লে ওঠে মানে?

সুবীর—ফুলে ওঠে।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—চাল সেদ্ধ হ’তে তো দেখেছো। সেদ্ধ হ’তে-হ’তে ফুটতে থাকে, একসময় উথলে ওঠে। উথলে গেলে কী হয়?—পড়ে যায়। আধারের বাইরে বেরিয়ে আসে। তোমার মধ্যে যদি মুগ্ধ হওয়ার ভাব উথলে ওঠে, সেই ভাবের সংস্পর্শে এসে বহুলোকের উন্নতি হবে। কেন উন্নতি হবে?—তোমাকে দেখে বহুলোক সে-রকম হ’তে চেষ্টা করবে। ইষ্টের প্রতি তোমার টান থাকলে তার একটা বহিঃপ্রকাশ থাকবে তো!—তখন সবারই ভাল লাগবে তোমাকে। তাহলে বুঝতে পারলে, মুগ্ধ মানে কী?

পিতা-মাতার কাছ থেকে মানুষ আসে। পিতা-মাতার ওপর যার শ্রদ্ধা-ভক্তি আছে, ভালবাসা আছে, তার সেই ভালবাসাই পরে ইষ্টের ওপর পড়ে। তাঁদের ওপর যার তেমন টান নেই সে হতভাগা।

এরপর শ্রীশ্রীপিতৃদেব গোরা, ভবেশ, রানী, স্বপ্না ও শাশ্বতীকে জিজ্ঞাসা করলেন বুঝেছে কিনা।

সকলে সানন্দে জানাল, বুঝতে পেরেছে।

[ ইষ্ট-প্রসঙ্গে/তাং-১৬/৯/৭৬ ইং ]

শ্ৰীশ্রীপিতৃদেব গৌরকে আলোচনা করতে আদেশ দিলেন। গৌরকে নিরুত্তর দেখে শ্রীশ্রীপিতৃদেব বললেন—কী উথলে ওঠে গৌর? উথলে উঠতে দেখনি? দুধ, ভাত, ডাল তাপ পেয়ে উথলে ওঠে। সত্যে বা আদর্শে মুগ্ধ থাকতে গেলে নিষ্ঠা, আনুগত্য, কৃতিসম্বেগের প্রয়োজন। নিষ্ঠা, আনুগত্য, কৃতিসম্বেগে ইষ্টের ভাব উথলে ওঠে। ভাত যখন সেদ্ধ হয়ে আসে, মা ভাত নামান, সেই ভাত মা তোমাদের খেতে দেন। তা খেয়ে পেট ভরে যায় তোমাদের। ক্ষুধা মিটে যায়। গায়ে শক্তি হয়, বল হয়। দুধ যেমন তাপ পেয়ে উথলে ওঠে, তেমনি নিষ্ঠা, আনুগত্য, কৃতিসম্বেগ ইষ্টের ভাবের সাথে যুক্ত হলে ইষ্টের ভাব উথলে উঠবে। তুমি তা লাভ ক’রে বিতরণ করবে আমাদের। তোমার সেই ভাব দেখে আমরা আনন্দ পাব, শান্তি পাব। দুঃখ দূর হবে, সবার প্রাণেই আনন্দ সঞ্চারিত হবে। বুঝতে পারছ না?

গৌর ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল।

[ ইষ্ট-প্রসঙ্গে/তাং-১৬/১১/৭৭ ইং]

[প্রসঙ্গঃ সত্যানুসরণ পৃষ্ঠা ২৬৭ – ২৬৮]