তেজ মানে …. দৃঢ়তা।- ব্যাখ্যা

সত্যানুসরণ-এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

তেজ মানে ক্রোধ নয়কো, বরং বিনয়-সমন্বিত দৃঢ়তা।

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

শ্রীশ্রীপিতৃদেব নিত্যানন্দদা (মন্ডল)কে আলোচনা করতে বললেন।

নিত্যানন্দদা—’তেজ’ মানে রাগ নয়।

গুরুকিঙ্করদা—তা তো বাণীতে পরিস্কার লেখা আছে।

নিত্যানন্দদা আমতা আমতা করছেন।

গুরুকিঙ্করদা—রাগ তো নয়, তা হলে কি হবে, সেটাই বলতে হবে।

নিত্যানন্দদা—যা কল্যাণকর ।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—তা কি ঠিক? উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দাও।

নিত্যানন্দদাকে চুপ করে থাকতে দেখে, শ্রীশ্রীপিতৃদেব হরিপদদা (দাস)কে উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দিতে বললেন।

হরিপদদা—’তেজ’ মানে— প্রভাব, বিক্রম।

এক স্বাস্থ্যবান যুবক ভিক্ষা করতে এসেছে এক বাড়ীতে। ঐ বাড়ীর বয়স্ক জ্যাঠামণি ঐ ভিক্ষুককে দেখে বললেন—স্বাস্থ্য এত ভাল, কচি বয়স; কাজ করে খেতে পার না! কি-না ভিক্ষা করতে বেরিয়েছো! না, ভিক্ষা পাবে না। ফাঁকি দিয়ে দিন চালাতে চাও ইত্যাদি। যিনি ঐ বাড়ীর কর্ত্তা তিনি বাড়ীর ভিতর থেকে সব কথা শুনছিলেন। সব শুনে তিনি বললেন—তাতে কি হয়েছে, যখন ভিক্ষা করতে বেরিয়েছে তখন কম করে চারটে পয়সা নিয়ে যাক। বলেই পয়সা দিলেন।

রেগে ভিক্ষুককে তাড়িয়ে দিলেন না বা অযথা বকাবকি করলেন না। কিংবা জ্যাঠামণিকে একথা বললেন না যে—এ বাড়ীর কৰ্ত্তা আমি। যাকে যা বলার আমি বলব, তুমি বলার কে? এত কথা বলার কি আছে। আমি যা ভাল বুঝব তাই করব ইত্যাদিও বললেন না। এই হল বিনয়-সমন্বিত দৃঢ়তা। শ্রীশ্রীপিতৃদেব গুরুকিঙ্করদাকে জিজ্ঞাসা করতে বললেন—নিত্যানন্দ বুঝতে পেরেছে কিনা। বা বুঝতে কোনখানে অসুবিধা হচ্ছে।

গুরুকিঙ্করদা কিছু বলার আগেই নিত্যানন্দদা বললেন—আজ্ঞে, এখন বুঝতে পেরেছি।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব ঘড়ি দেখেন ৬-২০ মিনিট। এখনও কিছুটা সময় আছে আলোচনা করা যায়। বলেই গুরুকিস্করদার দিকে তাকালেন। গুরুকিঙ্করদা—আজ্ঞে, হ্যাঁ।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—আমার নিজের চোখে দেখা ঘটনা বলব। একবার ট্রেনে করে যাচ্ছি। সন-তারিখ কিংবা কোথায় যাচ্ছিলাম তা আজ আর মনে নেই। তবে ঘটনাটা মনে আছে। ঐ ট্রেনের একই কামরায় বিশিষ্ট সাধক যাচ্ছেন তাঁর কর্মস্থলে। ঐ সাধকের বিপরীত দিকের আসনে এক ব্যক্তি খুব কাশছেন, আর কফ্‌ তুলে ট্রেনের মধ্যে ফেলছেন ইচ্ছা করেই। তা’ দেখে ঐ সাধক বললেন—এটা কি করছেন! কফ বাইরে ফেলুন। এইভাবে কি কেউ নোংরা করে, আর কফ্‌ ফেলে রোগ জীবাণু ছড়িয়ে আমাদের অপকার করছেন। ঐ ব্যক্তি হঠাৎ বললেন—বেশ করেছি, ফেলেছি।

সাধক খবরের কাগজ পড়ছিলেন—এই কথা শুনে কোন কথা না বলে, খবরের কাগজের একটা টুকরো ছিঁড়ে ঐ কফ্‌ তুলে জায়গাটা পরিষ্কার করে দিলেন, আর বেসিন থেকে হাত পরিস্কার করে এলেন।

এরপরও ঐ ব্যক্তি আট থেকে দশবার একইভাবে কফ্‌ ফেললেন কামরার মধ্যে। আর ঐ সাধক একইভাবে কোনও কথা না বলে কাগজ দিয়ে পরিষ্কার করে দিলেন।

শেষে ঐ ব্যক্তি আর পারলেন না সাধকের কাছে, কাশি পেলে বাইরে গিয়ে কফ্‌ ফেলে আসছেন।

অবশেষে আমরা সবাই দেখলাম, ঐ সাধক ওঁনার গন্তব্যস্থানে আসতেই; ওঁকে নিতে স্টেশনে কয়েক’শ লোক এসেছে। ওঁকে মালা পরিয়ে ট্রেন থেকে নামাল জয়ধ্বনি দিতে দিতে। এই হচ্ছে বিনয়-সমন্বিত দৃঢ়তা।

[তাঁর সান্নিধ্যে/তাং- ১১/৪/৭৬ ইং]

বাণীটি বেণু সাহা আলোচনা করার নির্দেশ পেয়ে পুনরায় পাঠ করে বলল—ঠাকুর বলছেন—তেজ মানে ক্রোধ নয়। সে বিনয়ী হবে কিন্তু দৃঢ় হবে। ইষ্টস্বার্থপ্রতিষ্ঠার জন্য যা করার করবেই।

আলোচনায় প্রীত হয়ে শ্রীশ্রীপিতৃদেব বেণুর দিকে তাকিয়ে বললেন—ভাল বলেছিস্‌।

[পিতৃদেবের চরণপ্রান্তে/তাং-২২/৯/৭৯ ইং]

[প্রসঙ্গঃ সত্যানুসরণ পৃষ্ঠা ১৫৪ – ১৫৫]