তোমার নজর…সৎ হয় না।- ব্যাখ্যা।

সত্যানুসরণ -এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

তোমার নজর যদি অন্যের কেবল কু-ই দেখে, তবে তুমি কখনই কাউকে ভালবাসতে পারবে না। আর, যে সৎ দেখতে পারে না, সে কখনই সৎ হয় না।

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

হরিপদদা—পৃথিবীতে ভাল, মন্দ দুই-ই আছে। আমি যা’ই দেখছি তার খারাপটাই যদি দেখি আর এই দেখাতে অভ্যস্ত হয়ে উঠি তবে ক্রমশঃ শ্রদ্ধা-ভক্তি হারিয়ে ফেলব।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—বাণীতে কী আছে? যে সৎ…


হরিপদদা—যে সৎ দেখতে পারে না।


শ্রীশ্রীপিতৃদেব—মানে সৎ দেখতে পায় না। পায় না কেন?—খোঁজে না বলেই পায় না। এবার বল্‌, সৎ মানে কী, সু-ই কী,কু-ই বা কী?


হরিপদদা—যা’ জীবনবৃদ্ধির সহায়ক তা-ই সু; যা’ বেঁচে থাকা ও বেড়ে ওঠায় বাধা সৃষ্টি করে তা-ই কু। আর বেঁচে থাকার ও বেড়ে ওঠার ভাব যেখানে বিদ্যমান তা-ই সৎ।


শ্রীশ্রীপিতৃদেব—শেষের লাইনটা পড়্‌।

হরিপদদা—’যে সৎ দেখতে পারে না সে কখনই সৎ হয় না।’

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—সু যদি চরিত্রে মূর্ত হয়ে ওঠে তখন বলি লোকটা সৎ। তার মানে জীবনবৃদ্ধির সহায়ক নীতিগুলি মেনে চলার ফলে তার মধ্যে সু-আচার মূর্ত হ’য়ে উঠেছে। যার দৃষ্টি সবসময় সু-এর দিকেই, সৎ আচরণগুলি যে মূর্ত ক’রে তুলেছে, তার সংস্পর্শে অন্যেও সৎ হয়ে পড়ে। কেমন ক’রে হয়? যেমন, তুমি সৎ লোক, সু-আচরণ তোমার মধ্যে মূর্ত হ’য়ে উঠেছে, তোমার হাব-ভাব, কথাবার্ত্তা, চাল-চলন এমনই যা’ চোখে পড়ার মত। তুমি যে আমায়ও ভালবাস এটা যখন আমি feel (অনুভব) করব, তখন তোমার liking (পছন্দ) অনুযায়ী আমার liking (পছন্দ) হয়। আমরা ঠাকুর-দর্শনে আসি, ঠাকুর যা’-যা’ ভালবাসেন সেইসব তাঁর ভোগের জন্য নিয়ে আসি। ঠাকুর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা পছন্দ করেন। আমার জামা-কাপড় ময়লা, তাই সঙ্গে-সঙ্গে কাপড়-চোপড় পাল্টে ঠাকুর-ঘরে গেলাম।

একবার এক মা ছেলেকে নিয়ে ঠাকুরের কাছে নিবেদন করল—ছেলে কথা শোনে না, সারাদিন খেলাধূলা করে, পড়াশুনায় মন নেই। ঠাকুর বললেন, মা’র উপর যাতে টান হয় তাই করো। ছেলেকে খেলাধূলা করতে নিষেধ করলেন না, বা অন্য কোন উপদেশও দিলেন না। ছেলে যেদিন থেকে মা’র উপর টান অনুভব করবে, সেদিন থেকে খেলুক আর যা’ই করুক— মা’র কথা না শুনে পারবে না।

যেটা খারাপ ব’লে মনে হচ্ছে সেটাও কিন্তু ভাল—স্থান-কাল-পাত্র অনুযায়ী। আবার অনেক সময় মানুষের কু-স্বভাব নিজে-নিজেই সংশোধিত হ’য়ে যায়। এ-প্রসঙ্গে আমার একটা কাহিনী জানা আছে।

এক বাড়ির একটা ছোট্র সুন্দর ফুটফুটে মেয়েকে অভিভাবক এক কিন্ডার গার্ডেন ইস্কুলে ভর্তি করে দিলেন। ইস্কুলটা বেশ বড়। চারধার প্রাচীরবেষ্টিত। মধ্যে ফলফুল দ্বারা সুসজ্জিত বাগান। ইস্কুলে যাবার সময়ই বাড়ি থেকে মায়েরা বাচ্চাদের টিফিনের কৌটায় টিফিন দিয়ে থাকেন। ইস্কুলের টিফিন আওয়ারে তারা তা’ খায়। এই মেয়েটি ইস্কুলে নতুন ভর্তি হয়েছে। ইস্কুলে পৌঁছেই যথাস্থানে বসে টিফিনের বাক্স থেকে খাবার বের ক’রে খেয়ে নেয়। ইস্কুলের দিদিমণিরা, সহপাঠিনীরা সবাই তা’ দেখে। কিন্তু কেউই তাকে কিছু বলে না। দিদিমণিদেরই এ-রকম নির্দেশ দেওয়া থাকতে পারে তাই সহপাঠিনীরা কিছু বলেনি। দিন যায়, সপ্তাহ যায়,—হঠাৎ মেয়েটি দেখল অন্যান্য মেয়েরা নির্দিষ্ট একটা সময়ে টিফিন খায়, সে-ই শুধু আগে-ভাগে খেয়ে নেয়। তারপর থেকে সে সকলের সঙ্গেই টিফিন খাওয়া আরম্ভ করল।

এরকম সংশোধনই প্রকৃত সংশোধন—যা’ নাকি ভেতর থেকেই হয়।

কাহিনী শেষ ক’রে শ্রীশ্রীপিতৃদেব বললেন—এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের সবকিছুই পরমপিতা সৃষ্টি করেছেন। তাঁর জগতে কু বলতে কিছু নিই। তিনি চিরসুন্দর। তাই তাঁর সৃষ্টিও চিরসুন্দর। আমাদের জ্ঞানের অভাবে, বুঝের অভাবে, বুদ্ধির অল্পতার দরুণ কু দেখি।

[ ইষ্ট-প্রসঙ্গে/তাং-৯/১২/৭৫ ইং]

[প্রসঙ্গঃ সত্যানুসরণ পৃষ্ঠা ৩৫, ৩৬]