তোমার মন ….ভেসে উঠবে। – ব্যাখ্যা

সত্যানুসরণ -এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

তোমার মন যত নির্ম্মল হবে, তোমার চক্ষু তত নির্ম্মল হবে; আর, জগৎটা তোমার নিকট নিৰ্ম্মল হ’য়ে ভেসে উঠবে।

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

শ্রীপিতৃদেব বাণীটি আলোচনা করার নির্দেশ দিলেন।

হরিপদদা—আমি যা’ দেখছি তার মধ্যে ভালটাই দেখছি। এভাবে সবকিছুর ভাল দিকটা দেখতে-দেখতে গোটা জগৎটাই নির্মল দেখছি।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—আমি ভাল দেখায় অভ্যস্ত হব কেন? ভাল বলতে কী বুঝব? যে কাপড়টা দেখতে ভাল, যে গরুটা দেখতে ভাল, যে ছেলেটা দেখতে ভাল, সেইগুলো দেখব শুধু—এইরকম নাকি?ব্যাপারটা clear (পরিস্কার) হচ্ছে না। আলোচনা করবি তো! অবশ্য short cut (সংক্ষেপ) করেও বলা যায়। (একটু থেমে) কী হ’লে মন নির্মল হবে?

হরিপদদা—সু-এর সাথে যুক্ত হ’লে।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—যুক্ত তো আমরা সকলেই আছি। কেমন ভাবে যুক্ত থাকলে মন নির্মল হবে?

হরিপদদা—কোন জিনিসেরই কু না দেখে।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—কেমন হ’লে কু দেখে না? মন কি সব সময় কু-ই দেখে? গতকাল তো আলোচনা হ’ল।

হরিপদদা—বাঁচাবাড়ার প্রতিকূল যা’ তা-ই কু। আমাদের প্রকৃতি সু-কেই দেখতে চায়।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—মন নির্মল না হ’লে ইষ্টের সাথে যুক্ত থাকা যায় না?

পরমেশ্বরদা—আজ্ঞে, ময়লা মন নিয়েও তো যুক্ত থাকা যায়।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—হ্যাঁ, তা হ’তে পারে। কিন্তু যুক্ত থাকতে-থাকতে মন পরিষ্কার হয়ে আসবে ক্রমশঃ ।

পরমেশ্বরদা—সাধন-ভজনের ক্ষেত্রেও যুক্ত আছি, জ্যোতিদর্শনও হচ্ছে, তখনও ইতরামোর চরিত্র যাতে স্বভাবগত না হয় সে-বিষয়ে সাবধান হওয়া দরকার।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—ইতরামোর চরিত্র স্বভাবগত হচ্ছে, তখন আসলে ও-সব দেখে না, ও-সব গল্প। ঠাকুরের নাম-ধ্যান ও সাধন- ভজন করলে, তার একটা প্রকাশ থাকবে তো!

পরমেশ্বরদা ক্ষমতাবলে জনৈক তপস্বীর কাক ভস্ম করার কাহিনীটি বললেন। সেই কাহিনীরই সূত্র ধ’রে শ্রীশ্রীপিতৃদেব বললেন—যে বাড়িতে সেই তপস্বী ভিক্ষার জন্য গেছেন সেই বাড়ির গৃহিণী বলল—দাঁড়াও সাধু, আগে আমি স্বামীসেবা করি। আমি তো আর কাক নই যে ভস্ম হয়ে যাব।

ননীদা—পুণ্যপুঁথিতে ঠাকুরের বলা আছে, পাঁচ মিনিট মন সংযোগ হ’লে জ্যোতিদর্শন হয়, দশ মিনিট হ’লে শব্দশ্রবণ হয়।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—ওগুলো তো সব by-product, ওগুলো অনেকসময় প্রাপ্তিকে ব্যাহত করে। মনঃসংযোগ অভ্যাসটা কারো এক নিমেষেও হতে পারে, কারো দীর্ঘ অভ্যাসের ফলেও হয়, কারো সারাজীবনেও হয় না। এমনিতেই তো দেখি ১ ঘন্টার মধ্যে ৫৯ মিনিটই মন এদিক-ওদিক করে, ১ মিনিটও মনঃসংযোগ করা যায় না।

দুলালদা—অনেকে তো অনেক অনুভূতির কথা ব’লে বেড়ায়।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—যাদের হয় তারা কখনো কয় নাকি? শব্দ-জ্যোতি যাই দেখুক না কেন চিত্ত নির্মল না হ’লে কিছুই হয় না। নাম ক’রলে মনের মলিনতা দূর হয়। চিত্ত নির্মল হয়। কিন্তু নির্মল হ’লে আত্মকেন্দ্রিকতা থাকে না। তাই নিষ্ঠাসহ নাম করা অভ্যাস করতে হয়। যারা নিষ্ঠাসহ নাম-ধ্যান করে তাদের কোন দোষ আমার দোষ ব’লে মনে হয় না।

একদিন ঠাকুরের কাছে এসে দেখি সরোজিনীদির (দত্ত) নামে অভিযোগ—পায়খানায় জল দেয় না, বাথরুম অপরিষ্কার রাখে ইত্যাদি। এ-সব শুনে ঠাকুরেরও ভাল লাগছিল না, অস্বস্তিবোধ করছিলেন। আমি বললাম, ‘আজ্ঞে, একটা কারণে ওকে আমার খুব ভাল লাগে!’ ঠাকুর জিজ্ঞাসুনেত্রে আমার দিকে চাইলেন। বললাম, ‘আমি রাত একটা-দু’টায় যখনই আপনার কাছে আসি রোজই দেখি, অন্যেরা সব ঘুমাচ্ছে, সরোজিনীদি মশারির মধ্যে বসে নাম করছে।’ ঠাকুর একগাল হেসে সরোজিনীদিকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুই ভজন নিসনি ?’ ‘আজ্ঞে হ্যা’, সরোজিনীদি উত্তর দিলেন। ‘কার কাছ থেকে নিয়েছিস্‌ ?’ ‘দয়া ক’রে আপনিই তো দিয়েছেন।’ ‘ভজন করিস্‌ নে?’ ‘আজ্ঞে না, শুধু নাম করি।’ শুনে ঠাকুর বললেন, ‘দূর পাগল! ভজন নিয়ে ভজন না করলে গরু হয়।’

এবার শ্রীশ্রীপিতৃদেব পূর্বপ্রসঙ্গের সূত্র ধ’রে বললেন—আত্মকেন্দ্রিকতায় মন মলিন হয়, নিঃস্বার্থ সেবায় মন পবিত্র হয়। আমি ভাল-মন্দ সব নিয়ে তাঁর সেবা করি এটাই হ’ল ইষ্টকেন্দ্রিকতা। বৃত্তি-প্রবৃত্তি সব রেখে দিয়ে তাঁর সেবা করি এটা কোনদিন হয় না। তাঁর সেবা করতে-করতে বৃত্তি প্রবৃত্তি সব adjusted (সুনিয়ন্ত্রিত ) হয়।

পরমেশ্বরদা—কি করে বুঝব যে আমি ইষ্টকেন্দ্রিক ?

পরমেশ্বরদার প্রশ্নের উত্তরে শ্রীপ্রীপিতৃদেব একটা ঘটনা বললেন—একবার দুটো কুকুরের breeding time-এ আমি যাচ্ছি তাদের কাছ দিয়ে। আমাকে দেখেই তারা দৌড়ে এল আমার কাছে। আমাকে ঘিরে ধরল। জীবমাত্রেরই আহার, নিদ্রা, মৈথুন স্বভাবতঃই মুখ্য। কিন্তু এখানে প্রভুর প্রতি ভালবাসা বৃত্তিপ্রবৃত্তির টানকে ছাপিয়ে গেল। হিন্দু ধর্মের শিক্ষাও ওরকম। ‘পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভার্যা’, আমরা বিবাহ করি যাতে সৎপুত্র পৃথিবীতে জন্মায়। তাঁকে কেন্দ্র ক’রে স্ত্রী, স্বামী, সবাই। আমরা চাই সন্তান যাতে বড় হ’য়ে তাঁরই সেবা করে।

ননীদা—গর্ভাধানের মন্ত্র দেখলেই তা’ বোঝা যায়।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—আমার বাবা, মা, স্ত্রী, পুত্র, বিষয়-আশয় সবই আছে। কদ্দিন আছে, কিছুই ঠিক নেই। তাই ভাবতে হয় সবই তাঁর।. .. এমনিতেই দেখবে হাত, পা, নাক, মুখ কেউই আমার কথা শোনে না, অসুখ হয়। কিন্তু আমি চাই আমার ছেলে আমার কথায় ওঠা-বসা করবে,আমরা সকলেই ক্যাসাবিয়াঙ্কার মত ছেলে চাই। আবার দেখ, দাঁত আমার কথা শোনে না, দাঁতে ব্যথা হয়। কিন্তু ঠাকুরের কাছে দাঁতে ব্যথার কথা জানাতেই ব্যথা সেরে গেল। আমার কথা শোনে না কিন্তু ঠাকুরের কথা শোনে । হজরত মহম্মদের কাছে এক মা তার ছেলেকে নিয়ে গিয়ে জানাল, আমার ছেলে খুব মিষ্টি খেতে চায়, কথা শোনে না। মহম্মদ যখন মিষ্টি খেতে নিষেধ করলেন, সেই থেকেই ছেলেটি আর মিষ্টি খায়নি।

প্রসঙ্গক্রমে শ্রীশ্রীপিতৃদেব দ্রৌপদীর বন্ত্র-হরণের কাহিনী বললেন—দুঃশাসন সভামাঝে দ্রৌপদীর বন্ত্র হরণ করছে—শ্বশুর, ভাশুর, দেবর সবার সামনেই। দ্রৌপদী এমতাবস্থায় সভাস্থ সকলের শরণাপন্ন হল। তাতে যখন কোন ফল হ’ল না তখন নারায়ণের শরণ নিল। নারায়ণের দয়ায় দ্রৌপদীর বস্ত্র শেষ হয় না। মলিনতা গেলে তাঁর দয়ায় এসব প্রাপ্তি ঘটে। মলিনতা গেলে শব্দ জ্যোতি-দর্শন হয়। আর যার সে-ভাব নাই তার সে-প্রাপ্তি হবে কী ক’রে? শব্দ, জ্যোতিই বা দর্শন হবে কী করে? ক্ষমতাবলে দৃষ্টিশক্তির সাহায্যে পাখীকে মেরে ফেলতে পারে, কিন্তু তা’ পেরে লাভ কী? ঢিল দিয়েই তো মেরে ফেলা যায়। একজন হননের ক্ষমতা অর্জন করেছে, আর একজন বাঁচানোর ক্ষমতা অর্জন করেছে। কা’র ক্ষমতা সার্থক বুঝতেই পারছ।

পূর্ব-প্রসঙ্গের সূত্র ধ’রে বললেন—শব্দ, জ্যোতি যারা দেখে ঠাকুর ছাড়া তাদের ভালই লাগে না কিছু। আমার ইষ্টকে যদি আমার ভাল না লাগে তাহ’লে ও-সবে আমার লাভ কী? কাঁচকলা হবে ও-সবে। তাঁকে পেতে ইচ্ছা করে, তাঁকে যারা ভালবাসে তাদের সঙ্গ পেতে ইচ্ছা করে—এ যদি না হয়, তাহ’লে এ-সবে লাভ কী আমার? আমি তাঁকে চাই ব’লে এগুলি পাচ্ছি by-product (উপজাত) হিসেবে। আর তাঁকে পেতে হ’লে তাঁর প্রতি গভীর টান দরকার, তীব্র ব্যাকুলতা দরকার।

জনৈক দাদা—যোগভ্রষ্ট কাকে বলব?

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—ঠাকুরের দীক্ষা নিলাম, ছেড়ে দিলাম, করলাম না।—এটাই যোগভ্রষ্ট। out and out (সর্বাস্তঃকরণে) যখন তাঁকে ভালবাসতে পারি না তখন যে-কোন মুহূর্তে তা থেকে বিচ্যুত হতে পারি। যে ইষ্টের সাথে যুক্ত আছে সে-ই যোগী।

পরমেশ্বরদা—অনেক অকাম-কুকাম চুরিটুরি করেও তো ঠাকুরকে ভালবাসতে পারে।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—তাতো হতেই পারে। সে ঠাকুরকে ভালবেসে চুরি ছেড়ে দেবে একদিন। আমার মধ্যে ভাল মন্দ দুই-ই আছে। দুই নিয়েই তাঁকে ভালবাসি। মন্দগুলি তাঁর ভাবে প্রভাবিত হয়ে ভাল হয়ে যাবে। এটা ভালবাসার ফলে হয়। ভক্তিভাব আনার জন্য একজন হয়তো স্নান করে গঙ্গাজল নিয়ে ইষ্টভৃতি করল, আর একজন হয়তো বিছানায় বসেই ইষ্টভৃতি করল। যে বিছানায় বসেই করেছে সে-ও ঐ ভাব নিয়েই করতে পারে। তিনি তো ভাবটাই দেখেন। তা বলে গঙ্গাজল ছিটানোর যে কোন মূল্য নেই, তা বলছি না।

[ইষ্ট-প্রসঙ্গে/তাং-৯/১২/৭৫ ইং]

[প্রসঙ্গঃ সত্যানুসরণ পৃষ্ঠা ৩৬, ৩৭, ৩৮]