কারো দুঃখের কারণ…. হবে না। – ব্যাখ্যা

সত্যানুসরণ -এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

কারো দুঃখের কারণ হ’য়ো না, কেহ তোমার দুঃখের কারণ হবে না।

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :


মুক্তি— চাওয়াটা না পাওয়াই দুঃখ। যেমন আমার কাছে কেউ কিছু চাইল, তাকে দিলাম না, তাই তার দুঃখ হ’ল।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—কি চাইছে তোমার কাছে?

মুক্তি—বই।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—বই চাইলেই যে তুমি তৎক্ষণাৎ তাকে দিতে পারবে, তা না-ও হতে পারে। বইটা যদি তখন তোমার কাজে লাগে তাহলে দেবে কেমন করে? তাকে বুঝিয়ে বললে—ভাই, বইটা তো আমি এখন পড়ছি, পড়া হলে তুই নিস্। তাহ’লে সেও বুঝল, তাইতো ওটা এখন ওর দরকার। তবে কোন জিনিস চাইতে গেলে বিবেচনা ক’রে চাইতে হবে, দেখতে হবে আমি জিনিসটা নিলে তার কোন অসুবিধা হবে কি না। আমায় দিতে গিয়ে সে কোন অসুবিধায় পড়বে কি-না। তার স্বার্থ আমার আগে দেখা দরকার। তোমার কথায় বলতে গেলে, যদি বইটা দেবার ইচ্ছা তোমার আদৌ না থাকে, সেও যদি বোঝে বইটা উপস্থিত তোমার কাজে লাগছে না—খামাখা দিচ্ছ না, তখন সে দুঃখ পাবে।

কেন দুঃখ পাবে? সে তোমার বন্ধু, তোমার সঙ্গে ভাব আছে ; বিশেষ প্রয়োজনে সে তোমার কাছে বই চাইল। যেমন তুমি হামেশাই তার কাছে চাও এবং পাও-ও। এরকম ক্ষেত্রে তুমি না দেওয়াতে সে দুঃখ পেতেই পারে। এখানে তুমি হ’চছ তার দুঃখের কারণ। এক্ষেত্রে শুধু নয়, সব ক্ষেত্রেই আমায় সজাগ দৃষ্টি দিয়ে চলতে হবে যাতে কেউ আমার জন্য দুঃখ না পায়, ব্যথা না পায়, আমি যেন কারও ব্যথা ও দুঃখের কারণ না হই।

মুক্তির দিকে তাকিয়ে শ্রীশ্রীপিতৃদেব বললেন—অনেক সময় আমি কারও অশান্তির কারণ না হয়েও অশান্তি পাই। ধর, পারিপার্শ্বিকের ছাগল এসে তোমার বাগানে ঢুকে শাকপাতা তরি-তরকারি সব খেয়ে গেল, তোমার ভারী দুঃখ হ’ল। তোমারও ছাগল আছে, কিন্তু তুমি তাদের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখ যাতে অন্যের ফসল না খেয়ে ফেলে। তাহ’লে সমাধানটা কোথায়?

শ্রীশ্রীপিতৃদেব এবার দাদাদের দিকে দৃষ্টি ফেরালেন।

গুরুকিঙ্করদা—আজ্ঞে, এরকম দেখা যায় বৈকি।

হরিপদদা—এখানে গরুতে খেয়েছে, সুতরাং কেউ তো খেয়েছে মনে করতে হবে।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—কিন্তু তোমার গরু আমারটা খায় না, তোমার এত পরিশ্রমের জিনিস আমার গরুতে একদিনেই সব শেষ করে দিল। এতে তো দুঃখ হতেই পারে। বাণীর সঙ্গে মিলিয়ে দিতে হবে তো।

সকলে নিরুত্তর। সময় উত্তীর্ণ হয়ে যাচ্ছে দেখে শ্রীশ্রীপিতৃদেবের নির্দেশে অন্য গ্রন্থ পাঠ হ’ল।

যথারীতি ৮টার পর শ্রীশ্রীপিতৃদেব যোড়শী-ভবন থেকে এসে বড় নাটমণ্ডপে পুনরায় উপবেশন করলেন। দাদারা ও মায়েরা প্রণাম করে বসেছেন। সকালের বাণীর আলোচনার প্রসঙ্গ উঠল।

শৈলেনদাকে (ভট্টাচার্য) সামনে দেখতে পেয়ে শ্রীশ্রীপিতৃদেব তা’কে বাণীটি আলোচনা করতে বললেন।ভেবে নিয়ে শৈলেনদা এর উত্তরে যা বললেন তাতে মীমাংসা হ’ল না।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—আমার ছাগল তোমার বাগানে ঢোকে না, কিন্তু তোমার ছাগলে আমার বাগানের শাকপাতা খেয়ে চলে গেল। এতে তো আমার দুঃখ হবারই কথা। আমি বাড়িতে নেই, প্রশান্তর ছাগল সব খেয়ে গেছে। বাড়ি ফিরতেই বৌ বলল—দেখছ, প্রশান্তর ছাগল সব মুড়িয়ে খেয়ে গিয়েছে। অসম্ভব দৌরাত্ম্যি শুরু করেছে। আমি তা’ শুনে বললাম—ছাগলে তো খাবেই, আমাদেরই সাবধানে থাকা দরকার । এই যে প্রশান্তর ছাগলে সব খেয়ে গেল, অথচ আমার মনে কোন দাগ কাটল না, এর একটা reaction (প্রতিক্রিয়া) হয় পারিপার্শ্বিকের মনে। পাড়াপড়শী দেখছে—অন্যের ছাগলে আমার বাগান নষ্ট করে, কিন্তু আমার মনে কোন দাগ কাটে না। আমার ছাগল বা গরু অন্যের বাগানের জিনিস যাতে না খায় সেদিকে আমার সজাগ দৃষ্টি থাকে, এর প্রভাব প্রশান্ত তথা পারিপার্শ্বিকের ওপর পড়ে আস্তে আস্তে। সকলেই আমার সঙ্গে ভাল ব্যবহার করার চেষ্টা করবে। কিন্তু আমার মনের যে এইভাব—ক্ষমাশীলতাই বল বা সহনশীলতাই বল তা’ কিন্তু আন্তরিক হওয়া দরকার । বিন্দুমাত্র উষ্মাভাব পোষণ করলে চলবে না। আগের ঘটনার উদাহরণের পরিপ্রেক্ষিতেই ধর—আমি প্রশান্তকে কিছুই বললাম না। কিন্তু খাবার সময় তরকারির অভাব। তা’ দেখে বললাম—সব শাকপাতা খেয়ে চলে গেল প্রশান্তর ছাগলে! বৌ বলল, এখন বলছ, কই প্রশান্তর সামনে তো বললে না। অর্থাৎ মনে-মনে আমি কিন্তু উম্মাভাব পোষণ ক’রে চলেছিই। এরকম হ’লেও চলবে না। আসল কথা যার মন যত সংকীর্ণ তার দুঃখের কারণও তত প্রশস্ত। কারও দুঃখের কারণ না হ’লে পারিপার্শ্বিকের ওপর তার reaction (প্রতিক্রিয়া) সঙ্গে সঙ্গে আমার কর্মের মধ্যে প্রকাশ পাবেই।

[ইষ্ট-প্রসঙ্গে/তাং-২১/৬/৮০ ইং]

[প্রসঙ্গঃ সত্যানুসরণ পৃষ্ঠা ২৪, ২৫]