দুর্ব্বলতার সময় সুন্দর…।-ব্যাখ্যা

সত্যানুসরণ-এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

দুর্ব্বলতার সময় সুন্দর ও সবলতার চিন্তা ক’রো, আর অহঙ্কারে প্রিয় ও দীনতার চিন্তা ক’রো—মানসিক স্বাস্থ্য অক্ষুণ্ণ থাকবে।

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

স্বপ্না—এই বাণীতে ঠাকুর বলেছেন দুর্বলতা এলে কি করতে হবে, অহংকার এলে কী করতে হবে। দুর্বলতার সময় সুন্দর ও সবলতার চিন্তা করতে হবে। অহংকারে প্রিয় ও দীনতার চিন্তা করতে হবে।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—ব্যাখ্যা করবে তো—দুর্বলতার সময় সুন্দর ও সবলতার চিন্তা করা কেমন, আর অহংকারের সময় প্রিয় ও দীনতার চিন্তাই বা কেমন—?

স্বপ্নাকে নিরুত্তর দেখে শ্রীশ্রীপিতৃদেব ছেলেদের দিকে তাকিয়ে বললেন—অহংকারের সময় প্রিয় ও দীনতার চিন্তা করবে কেমন করে? ‘আমি কর্তা’ ভাব, অহংকারের ভাব সবার মধ্যেই আসতে পারে। গৌরের গায়ে জোর আছে, কমল ওর পাশ দিয়ে এগিয়ে গেল, তখন গৌর হয়ত ভাবছে কমলকে এক ঘুসিতেই ঠিক করে দেব। আপনি (তপোবন বিদ্যালয়ের ইংরাজীর শিক্ষক ক্ষিতীশ মাস্টারমশায়ের উদ্দেশ্যে) হয়ত ভাবতে পারেন গুরুপ্রসাদ কী জানে! (গুরুপ্রসাদ হালদারদা তপোবন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক)। ঋকু হয়ত মনে-মনে ভাবে আমার মত গান ক’জন জানে! এখানে কেউ এমন জানে না। রেডিও আর্টিস্ট হয়ে গেছি।

অতঃপর ঋকুর দিকে তাকিয়ে শ্রীশ্রীপিতৃদেব বললেন—কী ভাবতে হবে তখন?

ঋকু—ভাববো তিনিই কাজ করাচ্ছেন, তাঁর দয়াতেই করছি।

—বল, তাহলে ইষ্টের দয়ার কথা ভাবতে হবে। ইষ্ট সকলেরই আছে। কিন্তু অনেকে বলে তার ইষ্ট নাই। যে গুরুকরণ করেনি, দীক্ষা নেয়নি, তারও তো প্রিয়তম থাকে, সে প্রিয়তমের কথা প্রেষ্ঠের কথা ভাবতে পারে। প্রিয় তো থাকেই। ইষ্ট ছাড়া কি প্রিয় নাই? (ঋকুকে প্রশ্নটি করলেন)

ঋকু—আছে।

—সেইসময় সেই কথা ভাবব, সেই কথা ভাবা ভালই। বাবা আছে, কাকা আছে, জেঠা আছে, দাদা আছে। এদের কারও কথা ভাবতে পারে যাকে সে ভালবাসে, ভক্তি করে।

এরপর শ্রীশ্রীপিতৃদেব গৌর-এর দিকে তাকিয়ে বললেন—গৌর কার কথা ভাববে? তোমার তো জেঠা নেই ঋকুর মত, তুমি তোমার বাবার কথা ভাববে, মায়ের কথা ভাববে। তবে ঠাকুরের কথা ভাবা সবচেয়ে ভাল। আমি যদি অহংকার করি, ঠাকুর মনে ব্যথা পাবেন। তখন নিজে-নিজেই নম্র হয়ে আসবে। সংশোধন হবে। তা ভিন্ন শত্রুতার ভাব বাড়তে-বাড়তে যাবে।

এরপর শ্রীশ্রীপিতৃদেব বললেন—কিন্তু সুন্দরের চিন্তা তো বলা হল না। দুর্বলতা কখন আসে? অসুখ-বিসুখ করেছে, মনে করছে বাঁচবে না, অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে। মন দুর্বল হয়ে পড়ছে, ‘মলেম’ ‘মলেম’ ভাবছে, তখন যিনি সুন্দর ও সবল তাঁর কথা ভাবতে হবে।

ছেলেদের দিকে তাকিয়ে বললেন—ভবেশের একটা নূতন বল দেখে গৌর এর নেবার ইচ্ছা হ’ল। লোভ হ’ল। মন ঝুঁকে পড়ল সে দিকে। সে সময় কী করতে হবে? যারা কখনো অপরের জিনিসে হাত দেয় না তাদের কথা ভাবতে হবে। তোমার দিদি গোপা কখনো নেয় না, তার কথা ভাববে—তাইতো আমারই তো দিদি, সে তো কখনো কারও জিনিস নেয় না, আমি যদি নিই বাবা, মা শুনে ব্যথা পাবেন, দুঃখ পাবেন। ঠাকুরের কথা, বাবার কথা, মা-র কথা ভাবতে হয়। বড় হয়ে গেলে গুরুর সম্বন্ধে বোধ আসে, গুরুর কথা ভাবতে হয়। গুরুর কথা, পরমপিতার কথা, বাবার কথা ভাবতে হয়।

Actively ভাবতে হয় আমাদের বাড়ীতে কেউ এরকম নয়, কেউ এমন করেনি, আমি যদি করি বাড়ীর সকলে হেয় হয়ে যাবে, আমিও ছোট হয়ে যাব—এটা কিসের চিন্তা? সুন্দরের চিন্তা। এছাড়া বুদ্ধ, যীশু, ঠাকুর এদের সবলতা সম্বন্ধে লক্ষ-লক্ষ গল্প আছে, এদের কথা ভাবলেও মনে সবলতা আসে। দোষ ত্রুটির ইচ্ছা চলে যায়। মন সবল হয়ে যায়। আর, মানসিক স্বাস্থ্য ভাল থাকবে মানে?—প্রফুল্ল থাকবে, শরীরও ভাল থাকবে। আমি যদি কুচিন্তা ও কুকাম করে বেড়াই আর শরীর চর্চা করি, ডন-বৈঠক করি তাহলে কি শরীর ভাল থাকবে?

শ্রীশ্রীপিতৃদেব ক্ষিতীশদার দিকে তাকাতেই ক্ষিতীশদা বললেন—শরীর আরও খারাপ হয়ে যাবে।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—যারা নিষ্ঠাসহকারে শরীর চর্চা করে তাদেরও ideal এর (আদর্শের) কথা ভাবতে হয়। ভাল চিন্তা করতে হয়, ভাল সঙ্গ করতে হয়। কেউ বা শংকরের চিন্তা করে, অনেকে হনুমানের কথা ভাবে।

অতঃপর ছেলেদের দিকে তাকিয়ে শ্রীশ্রীপিতৃদেব বললেন—মনে দুর্বলতা এলে কী চিন্তা করতে হয়? না, পরমপিতার চিন্তা করতে হয়। তিনি জগতে সুন্দর ও সবল। সুন্দর ও সবল-এর সব গুণই তাঁর মধ্যে আছে।

[ ইষ্ট-প্ৰসঙ্গে/তাং-২৮/ ১২/৭৭ ইং]

শ্রীশ্রীপিতৃদেব ভবেশকে আলোচনা করার আদেশ দিলেন। ভবেশ কিছু বলছে না দেখে তিনি প্রশ্ন করলেন—অহংকারের ভাব কেমন?

ভবেশ—আমি সবার ওপরে, আমার মত কেউ নেই, আমি সব জানি—এরকম ভাব অহংকারের ভাব।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—দীনতা কী?

ভবেশ—আমি কর্তা, এই ভাব না থাকা।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—এরপর কী আছে পড়।

ভবেশ পাঠ করল—দুর্বলতার সময় সুন্দর ও সবলতার চিন্তা ক’রো।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—দুর্বলতা কখন আসে?

ভবেশ—রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি, সেই রাস্তায় ভূতের ভয় আছে, তখন সুন্দর ও সবলের কথা চিন্তা করব। তারপর রাস্তাটা পার হ’য়ে যাব। বাঘ-ভালুকের ভয় থাকলেও একইভাবে চলে যাব।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—ধর, তোমাকে কোথাও যেতে হবে, যে রাস্তা দিয়ে যাবে সবাই জানে সে রাস্তায় বাঘ চলাচল করে, সাপও থাকতে পারে,—তখন কী করবে?

ভবেশ—ভয় না ক’রে চলব।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—ভয় না ক’রে জোর করে চললে তো বাঘের পেটে যেতে হবে! নদীতে কুমীর আছে জেনেও নেমে গেলে, কিংবা স্থানীয় অধিবাসীরা বলে দিয়েছে রাস্তায় বিপদ, তুমি তা’ কর্ণপাত না ক’রে চলে গেলে,—এরকম করা কি ভাল?

ভবেশ—আজ্ঞে না।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—এসব ক্ষেত্রে বিপদ এড়িয়ে চলতে গেলে প্রস্তুতি নিয়ে বেরোতে হবে। তবে ভূতের ভয় থাকলে লোকে ‘রাম’ ‘রাম’ উচ্চারণ করে। রাম পরম সুন্দর ও সবল। তাঁর নামে ভয় চলে যায়। ভয়ের স্বপন দেখে অনেকে ‘রাম-রাম’ ক’রে ওঠে। যারা ঠাকুরের দীক্ষা নিয়েছে তারা ভয় পেলে ঠাকুরের নাম জপ করতে থাকে। …. আর কী দুর্বলতা থাকতে পারে বৃতিসুন্দর?

বৃতিসুন্দরের বক্তব্য স্পষ্ট হচ্ছে না দেখে তিনি পুনরায় বলতে লাগলেন—যেমন, কাজ করতে যাচ্ছি, সন্দেহ আসছে—কাজটা হবে কি-না, করতে পারব কি-না, তখন ঠাকুরের নাম নিয়ে আরম্ভ ক’রে দিলাম। সন্দেহ, দুর্বলতার জন্য কাজটা করতে পারছ না, কিন্তু যেই ‘জয়গুরু’ ব’লে আরম্ভ করে দিলে তখন ঠিকই পারবে। ঠাকুরের নাম নিয়ে বা ‘জয়গুরু’ ব’লে আরম্ভ করলে মানে কাজ শুরুর সময় সুন্দর ও সবলতার কথা চিন্তা করলে । আর অহংকার সম্বন্ধে? অহংকারের সময় কী করবে?

বৃতিসুন্দর—যিনি প্রিয়পরম তাঁর চিন্তা করতে হবে।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—তিনি বাবা হ’তে পারেন, দাদা হ’তে পারেন বা যে-কোন গুরুজন হ’তে পারেন—যাঁকে তুমি শ্রদ্ধা কর, ভালবাস, মেনে চল। আবার, দীক্ষা নিলে গুরুদেব হ’তে পারেন। ভালবাসা আছে বলেই প্রিয়পরমের কথা মনে এলে অহংকার চলে যায়।

লালদা (রামনন্দন প্রসাদ)—একবার আমি জলে ডুবে যাচ্ছিলাম, তখন ভাই-এর জন্ম হয়নি। আমার দুই দাদুর মধ্যে আমিই একমাত্র নাতি ছিলাম। জলে ডুবতে-ডুবতে মা-বাবার কথা মনে পড়ল। আমি মরে গেলে মা-বাবার কী অবস্থা হবে ভাবছি, তখন হাতের কাছে একটা অবলম্বন পেয়ে গেলাম—উঠে পড়লাম।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—এটা তো অহংকার হ’ল না। অহংকার কী রকম? একজন হয়ত ফার্স্ট ডিভিশনে পাশ ক’রে মনে-মনে ভাবল—সবাই তো ফাস্ট ডিভিশন পায় না, আমি পেয়ে গেছি—এইভাবে অহংকার আসতে পারে। কিন্তু সে যদি ভাবে—আমি আর কী করেছি—মাষ্টারমশায়ের (কিংবা বাবার) দয়ায় পেয়েছি; দীক্ষা নিলে বলবে—ঠাকুরের দয়ায় পেয়েছি; কিংবা ভাববে—আমার চেয়েও অনেকে কত ভালভাবে পাশ করেছে, তখন আর অহংকার আসতে পারে না। মানুষের কত রকম অহংকার থাকে! খকু (কুমারী ঋকরানী দত্ত) ভাল গান করে, যদি মনে-মনে ভাবে এমন গান এখানে কেউ করতে পারে না—তাহলেই অহংকার। এমনি অহংকারের সময় যদি ভাবি—তাঁর দয়াতেই শিখলাম, আমার নিজের কী-ই বা কৃতিত্ব!—তাহলে মন শান্ত হয়, অহংকার চলে যায়। সুন্দর একটা জিনিস দেখে আত্মসাৎ করার ইচ্ছা হ’ল—এটাও দুর্বলতা । সে সময় যদি ভাবি—অপরের জিনিস নিয়েছি শুনলে মা কী মনে করবেন, দুঃখ পাবেন, আমাদের বাড়ীতে তো এরকম কেউ করে না,—এরূপ ভাবলে ঐ ইচ্ছা আর থাকে না, দুর্বলতা কেটে যায়।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব পুনরায় বললেন—দুর্বলতা, অহংকার যখন কাউকে পেয়ে বসে তখন তাকে চেপে ধ’রে নীচের দিকে নিয়ে যায়। ঠাকুর তাই বলেছেন—এই সময় সুন্দর ও সবলতার কথা চিন্তা করতে থাকলে ঐ দুর্বলতার কবল থেকে নিস্তার পাওয়া যায়। আরো সহজ ক’রে বল্‌ না পরমেশ্বর!

পরমেশ্বরদা (পাল)—খুব সহজ হয়েছে, আর সহজ হয় না।

[ ইষ্ট-প্রসঙ্গে/তাং-২৮/১০/৭৬]

[প্রসঙ্গঃ সত্যানুসরণ পৃষ্ঠা ২৯৪-২৯৬]