নিষ্ঠা রেখো, কিন্তু… না। ব্যাখ্যা

সত্যানুসরণ-এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

নিষ্ঠা রেখো, কিন্তু গোঁড়া হ’য়ো না।

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

শ্রীশ্রীপিতৃদেব ননীদাকে (চক্রবর্তী) আলোচনা করতে বললেন।

ননীদা—নিষ্ঠা মানে নিরন্তর লেগে থাকা। গোঁড়া মানে অন্ধবিশ্বাসী।

প্রতিদিন ঠাকুর-বাংলায় সমবেত প্রার্থনাতে যোগ দিই। ঠাকুর-বাংলা থেকে আমার বাড়ি একটু দূরে। আসার পথে ঘড়ি দেখি ১২ মিনিট বাকি আছে। তাড়াতাড়ি আসছি হঠাৎ দেখি একটা ছেলে মাটিতে পড়ে ভীষণ কাঁদছে, কাছে পিঠে কাউকে দেখা গেল না। ছেলেটিকে তুলে দেখলাম। মনে হল হাত ভেঙ্গে ফেলেছে, সেই জন্য ভীষণ চিৎকার করে কাঁদছে। ঠাকুরবাড়িতে সমবেত প্রার্থনাতে না গেলে ক্ষতি হবে না, কিন্তু প্রতিদিন সমবেত প্রার্থনাতে যোগ দিই, আজ পারলাম না।

আমার প্রার্থনাতে নিষ্ঠা আছে বলে প্রার্থনা আরম্ভ হওয়ার নির্দিষ্ট সময়ে নিচু স্বরে প্রার্থনা শুরু করলাম আর ছেলেটিকে হস্পিটালে নিয়ে গেলাম। তারপর ডাক্তারবাবু তার যা যা দরকার তা ব্যবস্থা করে দিলেন।

আমি যদি ভাবতাম থাক পড়ে, আগে প্রার্থনা করে আসি তাহলে গোঁড়ামী হত; প্রার্থনাতে নিষ্ঠা আছে বলা যেত না।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব ছোট একটা ঘটনা বললেন। একটা ছেলে তার বন্ধুকে একটা পেনসিল দিয়েছিল। কিন্তু কেমন করে পেনসিলটি হারিয়ে যায় কিংবা চুরি হয়ে যায়; পাওয়া যায়নি। এ ছেলেটি তার বন্ধুকে আর একটি নতুন পেনসিল দেয় এবং আগের চেয়ে দামী। কিন্তু তার বন্ধু যেটি হারিয়ে গেছে আর কখনও পাওয়া সম্ভব নয় সেইটি চায়। এটা হল গোঁড়ামী।

গুরুকিঙ্করদা একটা ঘটনা বললেন। এক ভদ্রলোকের একমাত্র ছেলের জ্বর হয়েছে। ১০৩ ডিগ্রি. জ্বরে ভুল বকছে। বাবা-মা, কি করি ছেলে ভুল বকছে, একবার ঘর, একবার বারান্দা, একবার উঠান এমনি করছেন। এমন সময় পাশের বাড়ি থেকে একটা মেয়ে এসে তাড়াতাড়ি মাথায় জল ঢালতে শুরু করে দিল। বেশ কিছুক্ষণ পরে জ্বর নামতে শুরু করলে তারপর ডাক্তার আনতে যায়। বিপদ এলে তার প্রতিকার কিংবা প্রতিবিধান না করে একমাত্র ছেলে যদি মরে যায় এই আশঙ্কায় ছুটোছুটি করাটা গোঁড়ামীতে পর্যবসিত হচ্ছে।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব আর একটা ঘটনা বললেন। ছোটভাইয়ের স্ত্রী মশারীর মধ্যে ছেলেকে নিয়ে ঘুমোচিছল। কি ভাবে যেন আগুন লেগে গেছে। ভাই বউ আগুন আগুন বলে চিৎকার করেছে। কাছে-পিঠে তেমন কেউ নেই। ভয়ে মশারীর মধ্যে থেকে কেন যেন বের হতে পারছে না। এদিকে, ভাদ্রবউ বলে ছুঁতে নেই। হঠাৎ কি মনে হল ছুটে গিয়ে টান মেরে মশারী ছিঁড়ে দু’জনকে বের করলাম। যদি গোঁড়ামী পেয়ে বসত তাহলে প্রাণ বিসর্জন দিত দুটো প্রাণী। নিষ্ঠা সেটাই ভাইবউয়ের সঙ্গে কোন রকম অসৎ আচরণ না করা।
এছাড়া খাওয়ার ব্যাপারে অনেক সময় নিষ্ঠার পরিবর্তে গোঁড়ামী ও শুচিবাই আমাদের মধ্যে অল্প-বিস্তর দেখা যায়।

[ তাঁর সান্নিধ্যে/তাং-২৪/৩/৭৪ ইং ]


বাণীটি মেয়েদের আলোচনায় দীপা বাগচি আলোচনা করছে। পুনরায় পাঠ করে বলল- নিষ্ঠা রাখার জন্য স্কুলে যাই।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব— স্কুলে যাস নিষ্ঠা রাখার জন্য, না—বিদ্যার্জনের জন্য ? (একটু পর) ঠিকই বলেছিস, কিন্তু বুঝিয়ে বলবি তো! দৈনিক যাস নিষ্ঠা রাখার জন্য।— নিষ্ঠা মানে কি?

—টান।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—কিরকম টান? তাহলে তো টান থাকতো। নিষ্ঠার মধ্যে কয়টা কথা আছে?—নিঃ আছে, ষ্ঠা আছে। ষ্ঠা আসে স্থা থেকে। নিঃ মানে নিয়ত। কোন কাজে নিয়ত লেগে থাকাই হচ্ছেনিষ্ঠা। স্কুলে যাচ্ছিস, একদিন হয়তো রাস্তায় কোন সহপাঠী অসুস্থ হয়ে পড়ল, তখন কি করতে হবে?

—তখন আগে তাকে সুস্থ করার জন্য চেষ্টা করতে হবে। পরে স্কুলে খবর দিতে হবে। তখনই স্কুলে যেতে হবে এমন গোঁড়ামী না রেখে আগে তাকে সুস্থ করার ব্যবস্থা করতে হবে।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—হ্যাঁ, আগে তাকে সুস্থ করার জন্য যা যা করণীয় তা করতে হবে।

অভিধান থেকে নিষ্ঠা শব্দের অর্থ দেখে বললেন—নিষ্ঠা মানে দৃঢ় আস্থা, বিশ্বাস, অনুরক্তি। দৃঢ় আস্থা মানে নিয়ত লেগে থাকা। (দীপাকে) নে, আবার পড়।

দীপা আবার বাণীটি পড়ল। “নিষ্ঠা রেখো কিন্তু গোঁড়া হ’য়ো না।”

[পিতৃদেবের চরণপ্রান্তে/তাং-১৯/৮/৭৯]

[প্রসঙ্গঃ সত্যানুসরণ পৃষ্ঠা ১২৯ – ১৩০]