পরমপিতার কাছে …..স্পর্শ ক’রবে না। – ব্যাখ্যা

সত্যানুসরণ -এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

পরমপিতার কাছে প্রার্থনা কর—’তোমার ইচ্ছাই মঙ্গল; আমি জানি না, কিসে আমার মঙ্গল হবে আমার ভিতরে তোমার ইচ্ছাই পূর্ণ হোক’। আর, তার জন্যে তুমি রাজী থাক—আনন্দে থাকবে, দুঃখ তোমাকে স্পর্শ ক’রবে না।

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

বাণীটির আলোচনা শুরু হ’ল।
শঙ্করদা (রায়)—আমি তো আমার মঙ্গল বুঝি না, তাই তাঁর ইচ্ছামত চলব, তাঁর কাছে প্রার্থনা করব—তোমার ইচ্ছায় যেন চলতে পারি। কারণ, একমাত্র তিনিই মঙ্গলময়।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—যা’ লেখা আছে তার বাইরে তো একটা কথাও বললি না।

—দুঃখ আমরা নিজেরা তৈরি করি, তাঁর ইচ্ছামত চললে দুঃখ আসে না।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—তা না হয় হ’ল, কিন্তু পরমপিতার কাছে প্রার্থনার দরকার কী? আমার ভেতর তোমার ইচ্ছাই পূর্ণ হোক—এই ভাবটা তো বলবি।

—আমাকে প্রার্থনা করতে হবে পরমপিতার কাছে—তোমার ইচ্ছায় যেন চলতে পারি।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—শরণাপন্ন না হ’লে কী ক’রে বলব তোমার ইচ্ছাই পূর্ণ হোক। শরণাগত হ’তে হবে; তাঁকে বিশ্বাস করতে হবে, তাঁর পথে চলতে হবে। তা না ক’রে শুধু-শুধু ও-কথা বলে কী লাভ? তাঁর ওপর ভক্তি, বিশ্বাস রাখতে হয়। আমি খেয়ালমাফিক চ’লে বলব, তোমার ইচ্ছাই পূর্ণ হোক, তাহলে হয় নাকি?

—তাঁর ওপর বিশ্বাস ভক্তি এলে তাঁর মনোমত চলা যায়।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—বিশ্বাস বলতে আবার কী বোঝা যায়? ঠাকুর বিশ্বাস কাকে বলেছেন?—’যে-ভাব বিরুদ্ধ ভাব দ্বারা আহত বা অভিভূত না হয়, তাই বিশ্বাস।’ কারও-কারও পরমপুরুষকে দর্শনমাত্রই বিশ্বাস হয়—তুমি ত্রিকালজ্ঞ, জীবনস্বামী। আমাদের মত সাধারণ মানুষের দীক্ষা নিয়েও বিশ্বাস আসে না। তাই আমরা দীক্ষার সময় যে-সংকল্প ও সংবেদনী গ্রহণ করি তা’ অকপট ভাবে মেনে চলতে হয়। মেনে চলতে-চলতে বিশ্বাস হয়। সংকল্পগুলি মেনে না চললে বিশ্বাস আসে না।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব পুনরায় বললেন—আমি দুঃখের কাজ করলে দুঃখ আসবেই তো। তখন যে-কোন দুঃখকেই গভীর মনে হয়। এই দুঃখ আমার থেকেও হ’তে পারে, আবার পরিবেশ থেকেও হ’তে পারে।

শঙ্করদা—এমন একজন লোক চাই যাকে ধ’রে চ’লে আমার দুঃখ দূর হবে।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—আমার প্রেষ্ঠই তিনি, যাঁকে পেয়ে আমার মন ভরপুর হ’য়ে আছে। ইষ্টস্বার্থপ্রতিষ্ঠাই আমার জীবনের মুখ্য উদ্দেশ্য। এজন্য আমি এমন কাজ করি না যাতে তিনি ব্যথা পেতে পারেন।

শঙ্করদা—ঐভাবে থাকলে দুঃখটা বোধ হয় না।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—কিন্তু বাণীতে আছে ইচ্ছা করলেই তাকে তাড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে। সেইভাবে বলতে হবে। হরিপদ বল্‌।

হরিপদদা (দাস)—মানুষের প্রকৃতি দুঃখ চায় না, আনন্দলাভ করতে চায়, আর দুঃখকে তাই ইচ্ছে করলেই তাড়িয়ে দেওয়া যায়।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—দুঃখ পাওয়ার মত যদি করি, অথচ যদি বলি আমি কিছু জানি না, তা’ বললে কী হবে?—আমি যদি চুরি করি আমাকে তার জন্য দুঃখ পেতেই হবে।

ক্ষণিক থেমে পুনরায় বললেন—মানুষের সাধারণতঃ কিসে দুঃখ হয়?—খাদ্যাভাবে দুঃখ হয়, প্রিয়জনবিয়োগে দুঃখ হয়, accident-এ (দুর্ঘটনায়) দুঃখ হয়—তাই না? প্রিয়জন অসুস্থ হ’ল, সারানোর চেষ্টা না করায় সে মারা গেলে দুঃখ তো হবেই—এ-এক অবস্থা। আবার মনে কর, তা’কে সারানোর জন্যে প্রাণপণে চেষ্টা করলাম, তবু মারা গেল। তখন ঠাকুরের কাছে যদি নিবেদন করি—’দয়াল তোমার ইচ্ছাই পরম মঙ্গল’, তাহলে দুঃখ অনেক লাঘব হয়। কিংবা ধর, তোমার বাড়িতে একটা লোক কাজ করে। বাড়ি থেকে সে কোন জিনিস চুরি ক’রে নিয়ে গেছে। বাড়ির লোক তার বিরুদ্ধে নালিশ করছে। সে-ক্ষেত্রে তুমি যদি বল, না-না ওর দরকার, অভাব; তাই নিয়ে গেছে। এ-রকম ভাবলে সান্ত্বনা আসে। এ-ভাব নিয়ে তুমি যদি তা’র (যে চুরি করেছে) সঙ্গে ঠিকমত আচরণ কর তাহলে একদিন-কি-একদিন সে তোমার ভালবাসার কাছে বাঁধা পড়বেই। তখন তা’র পরিবর্তন হওয়াই স্বাভাবিক। এতে তারও মঙ্গল, তোমারও মঙ্গল।

সমুখের কর্মীদের পানে তাকিয়ে শ্রীশ্রীপিতৃদেব বললেন—ভাল কাজ করলে প্রারব্ধ সাহায্য করে, সদ্গুরুর দয়ায় আরও progress (উন্নতি) হয়। তা’ না হ’লে পরের জন্মে আবার চাপে পড়তে হয়। যেমন, এ-জন্মে ভাল কাজ ক’রে পরের জন্মে ধনী-ঘরে জন্ম হল। ধনী হয়ে ধন-সম্পদ যদি কুকাজে ব্যবহার করি তাহলে আবার নীচে নেমে যাই। কিন্তু এ ধন দিয়ে যদি ইষ্টকাজ করি তাহলে জীবনটা progressive (বর্দ্ধনশীল) হয়, পরজন্মে আরও উন্নত জীবনের অধিকারী হই। সে-জন্যই সদ্গুরুর শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন। তাঁর প্রদর্শিত পথে চলা প্রয়োজন; আর তাঁর ইচ্ছামত যদি চলি তা’হলে আনন্দে থাকব, দুঃখ আমাকে স্পর্শ করবে না।

[ইষ্ট-প্রসঙ্গে/তাং-২৭/১১/৭৫ ইং]

[প্রসঙ্গঃ সত্যানুসরণ পৃষ্ঠা নং ২৩, ২৪]