প্রকৃতি তাদের ধিক্কার … হয়। – ব্যাখ্যা

সত্যানুসরণ-এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

প্রকৃতি তাদের ধিক্কার করে, যারা নাকি প্রত্যক্ষকে অবজ্ঞা বা অগ্রাহ্য ক’রে পরোক্ষকে আলিঙ্গন করে। আর, পরোক্ষ যার প্রত্যক্ষকে রঞ্জিত ও লাঞ্ছিত করে—তারাই ফাঁকির অধিকারী হয়।

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

শ্রীশ্রীপিতৃদেব উপস্থিত কর্মিবৃন্দের দিকে এক নিমেষ তাকিয়ে বললেন,— কালীপদ, আলোচনা কর।

কালীপদদা (ভৌমিক)— বাস্তবে যা’ দেখি তা’ অবজ্ঞা ক’রে যা’ দেখিনি সেদিকে যদি হাত বাড়াই, যে সামনে আছে তাকে মানি না কিন্তু অসাক্ষাতে যা’, তাকে নিয়ে টানাটানি করি তাহ’লে আমাদের ধিক্কার পেতে হবে।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—কিভাবে ধিক্কার পেতে হবে আলোচনা কর্‌।

কালীপদদা—ঠাকুর (শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র) আমাদের কাছে প্রত্যক্ষ। রামকৃষ্ণদেব দেহত্যাগের পূর্বে যে ইঙ্গিত দিয়ে গেছেন, তদনুযায়ী, তার কিছুকাল পর ঠাকুরের আগমন ( শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের জন্মগ্রহণ), ঠাকুরের ঐহিক লীলা—এ-সব দেখে আমাদের বুঝতে কোন কষ্টই হয় না যে ঠাকুর রামকৃষ্ণদেবই আবার ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র হ’য়ে এসেছেন। এখন যদি বর্তমানকে না ধরি, তিনিই যে ইনি—এ-বোধ যদি না আসে, তা’হলে কিছু হয় না। রামকৃষ্ণদেবকেই মানা হয় না। ফলে জীবনে ধিক্কার এসেই জোটে।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—ও-রকম ক’রে ভাবতে হয় না। তিনিই যে ইনি এ-রকম ভাবতে হয় না। ইনিই যে তিনি এ-রকম ভাবতে হয়। ইষ্টের মধ্যে সবাই অনুস্যুত হ’য়ে রয়েছেন। তাই তাঁকে মানলে আর সবাইকে মানা হয়। এ তো না-হয় বুঝলাম কিন্তু প্রকৃতির ধিক্কারটা কেমন?

কালীপদদাকে নীরব দেখে এবার বিনোদদা (মুন্সী) বলতে শুরু করলেন—ঠাকুরই পরমহংসরূপে ছিলেন। তাই এখন আমরা তাঁকে মানব, যিনি আমাদের নিকট বর্তমান। যেমন, আমরা ঠাকুরদাকে বাদ দিই না, কিন্তু বাবাকে মেনে চলি, তেমনি জীবন্ত যিনি, বর্তমান যিনি, যিনি আমাদের দৃষ্টির গোচরে আছেন তাঁকে নিয়েই চলব।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—তা’ তো ভাল। কিন্তু ধিক্কৃত হচ্ছি বুঝব কেমন করে?

শান্তিময় রক্ষিত—আজ্ঞে, আমার মনে হয়, ঠাকুর আমাদের কাছে প্রত্যক্ষ আমরা যদি প্রত্যক্ষকে বাদ দিয়ে পরোক্ষকে ধরার চেষ্টা করি তাহ’লে সুখ, শান্তি, কিছুই পাব না। এটাই হ’ল প্রকৃতির ধিক্কার।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—তুমি না হয় সুখ-শান্তি চাও; কিন্তু ভক্তরা তো কেউ সুখ-শান্তির ধারই ধারে না। তা’রা ইষ্টের জন্য সব রকমের কষ্ট সহ্য করতে প্রস্তুত থাকে। তা’রা কষ্টকে কষ্টই মনে করে না।.. . অনেকেই সুখ-শান্তি চায়—তাতে কী? আমাদের জীবনের উদেশ্য কী? জীবনের উদ্দেশ্য হ’ল ঈশ্বরলাভ। তাঁকে লাভ করার জন্যই যা’-যা’ করণীয় তার জন্য প্রস্তুত থাকতেই হবে।

ক্ষীতিশদা (সেনগুপ্ত) — বৰ্তমান-মহাপুরুষ যিনি আসেন তাঁর দীক্ষা না নিলে ঠিকভাবে চলাই যায় না। শুনেছি রামকৃষ্ণদেবের জনৈক ভক্ত তাঁর বোনের প্রতিলোম বিয়ে দিলেন।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব এরূপ অসংলগ্ন উক্তিতে বিরক্তি বোধ করলেন। বললেন—তাতে কি?

ক্ষীতিশদা—রামকৃষ্ণদেবের তো সুবিবাহ সম্পর্কে কিছু বলা নেই। রামকৃষ্ণদেবের ঐ ভক্ত যদি ঠাকুরের (শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের) দীক্ষিত হতেন তাহ’লে তার প্রতিলোম বিয়ে হ’ত না।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব (বিরক্তির সুরে)—এ-সব শুনতে আমার মোটেই ভাল লাগে না। এ-সব কথা ভাল না। বিবাহ সম্পর্কে তো আগে থেকেই বলা আছে যখন শ্রীকৃষ্ণরূপে তিনি এসেছিলেন, বিধান দিয়েই গেছেন। তা’ছাড়া ঠাকুরের দীক্ষা নিয়েই যে সবাই ঠিক-ঠিক করে তা’ তো নয়। আসল কথা হ’ল—নিষ্ঠাসহ তাঁর (ইষ্টের) অনুশাসনবাদ মেনে চলা।

বিনোদদা (মুন্সী) সবিনয়ে জানালেন—বড়দা, আমি কিছু বলব।

শ্ৰীশ্রীপিতৃদেব—হ্যাঁ, বল্‌।

বিনোদদা—মায়ের স্তন পান না ক’রে কোন শিশু যদি ‘আমূল’ (Amul) খেয়ে বড় হয়, তাহ’লে
তার স্বাস্থ্য ভাল হয় না। প্রত্যক্ষ বাদ দিয়ে পরোক্ষ ধরলে এ-রকম হয়।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—কিন্তু অনেক সময় মায়ের দুধের চেয়ে ‘আমুল’ খাওয়াই বেশী উপকারী। আগেকার দিনে স্বাস্থ্যবতী মা ছিল, তখন মাতৃস্তন খেয়ে শিশুরা পুষ্টিলাভ করত। কিন্তু আজকাল অধিকাংশ মায়েরই স্বাস্থ্য ভাল যাচ্ছে না। তাই, অনেক ক্ষেত্রেই এ-সব মায়েদের শিশুদের ‘আমুল’ খাওয়ানোই বেশী উপকারী। সেজন্য অনেক বিবেচনা ক’রেই ডাক্তাররা ‘বেবিফুড’ বের করেছেন।

মূল প্রশ্ন থেকে আলোচনা দূরে স’রে যাচ্ছে দেখে এবার শ্রীশ্রীপিতৃদেব সতীশদাকে (পাল) কিছু বলতে বললেন। কিন্তু সতীশদার কথাতেও বিষয়টা স্পষ্ট বোঝা গেল না। মোক্তার আলিদাও কিছু বললেন।

কিন্তু এখনও ঐ বাণীর অর্থ অস্পষ্ট থেকে যাচ্ছে দেখে অবশেষে শ্রীশ্রীপিতৃদেব বললেন—সহজভাবেই যদি এরূপ ভাবা যায়, ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব যখন এলেন তখন বহু মানুষই শিব, দুর্গা, কালী প্রভৃতি দেবদেবীর আরাধনা ক’রে চলত। ধরো, একজন কালীভক্ত। সে ভাবল, ঠাকুর রামকৃষ্ণদেবও তো আমারই মত একজন কালীসাধক। আমি মাকে ভজনা করি, তিনিও করেন। সুতরাং তাঁর কাছে গিয়ে লাভ কি? আবার কেউ হয়তো নারায়ণ পুজো করে। রামকৃষ্ণদেবের সঙ্গ লাভ ক’রে তাঁর সঙ্গ ও সাহচর্যে ইষ্টদেব নারায়ণের প্রতি তার অনুরাগ বেড়ে গেল। অমূর্ত নারায়ণ তার কাছে মূর্ত হ’য়ে উঠল। সে নির্মল আনন্দের অধিকারী হ’ল। আর যে কালীপুজো করলো সে তো রামকৃষ্ণদেবের সঙ্গই করল না। সাধনার যে উদ্দেশ্য তা’ থেকেও বঞ্চিত হ’ল। পরে সে চোখের সামনে দেখতে পেল, যারা ঠাকুর রামকৃষ্ণদেবের সঙ্গ করেছে, তা’রা মানুষ হ’য়ে গেল। সে তখন ভাবতে লাগল, আমার কিছুই হ’ল না। এ-রকম যারা প্রত্যক্ষকে অবলম্বন না করে তারা অষ্টপাশের হাত এড়াতে পারে না। তাদের জীবনে পূর্ণতা আসে না। প্রকৃতির ধিক্বার এ-ছাড়া আর কী?

আলোচ্য বিষয়ের ব্যাখ্যা-প্রসঙ্গে এবার শ্রীশ্রীপিতৃদেব বললেন,—আমরা পুরুযোত্তমকে ইষ্টরূপে পেয়েছি। তাঁর কাছে নানা সম্প্রদায়ের মানুষ— হিন্দু, মুসলমান, জৈন, বৌদ্ধ সবাই এসেছে। কিন্তু কেউ converted (ধর্মান্তরিত) হয়নি। বরং প্রত্যেকেরই নিজ-নিজ Beloved-এর প্রতি অনুরাগ বেড়ে গেছে। তাঁর কাছে এসে প্রত্যেকেই অপার আনন্দের অধিকারী হয়েছে।

[ইষ্ট-প্রসঙ্গে/তাং-১৩/৭/৭৪ ইং]

[প্রসঙ্গঃ সত্যানুসরণ পৃষ্ঠা ৩০৪ – ৩০৬]