প্রচারের অহঙ্কার …. বলে।-ব্যাখ্যা

সত্যানুসরণ-এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

প্রচারের অহঙ্কার প্রকৃত-প্রচারের অন্তরায়। সে-ই প্রকৃত প্রচারক—যে আপন মহত্ত্বের কথা ভুলেও মুখে আনে না, আর, শরীর দ্বারা সত্যের আচরণ করে, মনে সত্য-চিন্তায় মুগ্ধ থাকে এবং মুখে মনের ভাবানুযায়ী সত্যের বিষয় বলে।

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

শ্রীশ্রীপিতৃদেব প্রথমে সুবীরকে আলোচনা করতে বললেন। সুবীর কিছু না বলায় তিনি ভবেশকে আলোচনা করার আদেশ দিলেন।

ভবেশ—প্রচার মানে নাম প্রচার, ঠাকুরের নাম প্রচার। কেউ যদি বলে আমি ঠাকুরের কাজ করি, ঠাকুরের কথা বলি, আমি এত যাজন করেছি, দীক্ষার ব্যবস্থা করিয়েছি—এসব হ’ল প্রচারের অহঙ্কার।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—এতো ঠিক অহঙ্কার না, এটা হ’ল নিজের প্রচার। এখানে অহঙ্কার হ’ল কোন্‌ জায়গায় (গোরাকে প্রশ্ন করলেন)?

গোরা—যদি বলি আমিই সব করছি, আমার জন্যই এসব হচ্ছে, তাহ’লে অহঙ্কার এসে পড়ে।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—হ্যাঁ, ‘আমি কর্তা’-ভাবই হ’ল অহঙ্কার। আমার মত প্রচারক আর নেই, আমি না থাকলে কাজই হ’ত না,কে করবে এসব,—এই ভাব এলে অহঙ্কার এসে পড়ে। অন্তরায় মানে কি?

গোরাকে নিরুত্তর দেখে নিজেই উত্তর দেন তিনি—অন্তরায় মানে বাধা। তাহ’লে কী দাঁড়াল?

গোরা—অহঙ্কার প্রকৃত-প্রচারে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। লোকে তাকে (অহঙ্কারী প্রচারককে) পছন্দ করে না। লোকে চায় মঙ্গলের কথা শুনতে, সত্যের কথা শুনতে।

গোরার কথায় সম্মতি জানিয়ে শ্রীশ্রীপিতৃদেব এবার স্বপ্নাকে বলতে বললেন—প্রকৃত প্রচারক কাকে বলে।

স্বপ্না—যে সৎকেই চিন্তা করে, সৎ-এরই যাজন করে—সে-ই প্রকৃত প্রচারক।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—সৎ কী? ইষ্টই সৎ। জীবনবৃদ্ধির মূর্ত প্রতীক তিনিই। প্রকৃত প্রচারক নিজের কথা বলে না। সে ইষ্টের প্রচার করে, আদর্শের প্রচার করে—এ তো বোঝা গেল। কিন্তু শরীর দ্বারা সত্যের আচরণ কেমন? শাশ্বতী বল দেখি।

শাশ্বতী—শরীরকে টিকিয়ে রাখার আচরণ করা।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—তাহ’লে বল, সদাচার পালন করা। কী-কী করলে সদাচার পালন করা হয়?

শাশ্বতী—পুষ্টিকর খাবার খেলে—

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—দৈহিক ও মানসিক স্বাস্থ্য বজায় থাকে যা’ করলে—পুষ্টিকর লঘুপাচ্য খাবার খেলে, যা’ শরীরের অনিষ্ট করে তা’ না খেলে, নাম-ধ্যান, যজন-যাজন করলে, মানুষকে নিঃস্বার্থ সেবা দিলে—এককথায় যা-যা করলে ইষ্টস্বার্থপ্রতিষ্ঠা হয় তা-ই শরীর দ্বারা আচরণ করা। এসব ঠিক-ঠিক করতে হয়—লোক-দেখানোর ব্যাপার নয়।

এরপর বাণীর পরের অংশটুকু “মনে সত্য চিন্তায় মুগ্ধ থাকে” রানীকে ব্যাখ্যা করতে বললেন।

রানী—প্রকৃত প্রচারক যে সে বোঝে ইষ্টই মঙ্গল, ইষ্ট ছাড়া সে কিছু বোঝে না।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—ইষ্ট ছাড়া কিছু বোঝে না কেন? বুদ্ধি কম—এজন্য?

রানী—ইষ্টচিন্তা ক’রে সে আনন্দ পায়।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—ইষ্টচিন্তা কী? না—যা-যা করলে ইষ্ট খুশি হ’ন, যা তিনি পছন্দ করেন সেইসব ভাবা, বলা, আচরণ ক’রে চরিত্রগত করা।

রানীর কথার সূত্র ধ’রে বললেন—আনন্দ পায় বলেই করে ঠিকই,—আনন্দের একটা expression (প্রকাশ) আছে তো! চোখে-মুখে তা’ প্রকাশ পায়। তখন চোখ-মুখ সব সুন্দর হ’য়ে ওঠে। আবার পরনিন্দা পরচর্চা করতে-করতে সুন্দর মুখও খারাপ হ’য়ে যায়। সৎ-চিন্তা যে করে তার মুখ দিয়ে তা’ প্রকাশ পায়। শরীর দ্বারা যে সত্যের আচরণ করে তার মনের ভাব আপনিই আচরণে প্রকাশ হ’য়ে পড়ে।

শ্রীশ্রীপিতৃদেবের নির্দেশমত রানী এবার গোটা বাণীটি পাঠ ক’রে তার অর্থ বুঝিয়ে বলল।

[ ইষ্ট-প্রসঙ্গে/তাং-৬/৯/৭৬ ইং]

[প্রসঙ্গঃ সত্যানুসরণ পৃষ্ঠা ২৬০]