প্রেম কর, কিন্তু …. না।-ব্যাখ্যা

সত্যানুসরণ-এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

“প্রেম কর, কিন্তু আসক্ত হ’য়ো না।”

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

দ্বৈপায়ন বাণীটির আলোচনা শুরু করল।

দ্বৈপায়ন—ভালবাস, কিন্তু বদ্ধ হয়ে থেকো না। নিঃস্বার্থভাবে ভালবাস।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—আসক্ত মানে কী?

দ্বৈপায়ন—আসক্ত মানে বদ্ধ ।

শ্রীশ্রীপিতৃদেবের নির্দেশে এবার সুপালী বলল—শ্রীশ্রীঠাকুর বলছেন ভালবাস, কিন্তু তার টানে খারাপটাকে সমর্থন করো না।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—দ্বৈপায়নও তো তা-ই বলল। আর প্রেম মানে? ভক্তির গাঢ়ত্বই প্রেম। ভক্তি আসছে ভজ্‌ ধাতু থেকে। ভজ্‌ ধাতু মানে সেবা, আশ্রয়, দান, প্রতিগ্রহ, অনুরাগ। যার উপর ভক্তি থাকে তাঁর ভরণপোষণের ভার নিই, তাঁকে দান করি, তাঁর জন্য অনেক করে থাকি। তাঁর আশ্রয় গ্রহণ করে থাকি। আসক্তি মানে টান। যেটা না হলেই চলে না। এমন ভালবাসা, সে না হলেই চলে না। এটা কার বেলা চলে?

দ্বৈপায়ন—ইষ্টের বেলায়।

শ্ৰীশ্রীপিতৃদেব—অন্যের বেলায় হলে—? অন্যের বেলায় হ’লে নিম্নগামী টান হয়ে যাবে। তা আমার পক্ষে ভাল হবে না। যেমন প্রসূন তোমার বন্ধু। ধর তোমার মায়ের খুব অসুখ। ওষুধ আনতে হবে বাজার থেকে। আনার আর লোক নেই। মা বলছে ওষুধ আনতে। কিন্তু তুমি মায়ের কথা না শুনে চলে গেলে বন্ধুর বাড়ি। বন্ধুর সঙ্গে দেখা না করলে তোমার চলে না। এটাই হ’ল বন্ধুর প্রতি আসক্ত হওয়া। ঠাকুর বলছেন প্রেম কর, কিন্তু এমন টান ইষ্ট ছাড়া কারও প্রতি যেন না হয়। যখন বিড়ি-সিগারেটে নেশা হয় তখন তা না হলেই চলে না। বন্ধুর বেলায়ও তাই। রাজা ভরতের গল্প জান তো? রাজা ভরত খুব ধার্মিক ছিলেন। হরিণ-শাবককে প্রাণতুল্য ভালবাসতেন। হরিণের কথা ভাবতে-ভাবতেই মারা গেলেন। পরের জন্মে হরিণ হয়ে জন্মগ্রহণ করলেন।

স্ত্রী-পুত্র-পরিবার আছে—এদের সকলের সঙ্গে প্রেম করতে হয়। মনপ্রাণ দিয়ে ভালবাসতে হয়। অনেক সময় আমরা জানি এটা করা ঠিক, ওটা করা ঠিক নয়, কিন্তু করি কোনটা? যেটায় আমি আসক্ত। ঠাকুরের বাণী যদি চরিত্রগত করে ফেলি, দুনিয়া তখন সোনার সংসার হয়ে যায়।

বসওয়ান সিংদা প্রশ্ন করলেন—এই বাণী কার জন্য? যে ইষ্ট বা গুরুগ্রহণ করেনি তার জন্যেও কি প্রযোজ্য?

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—ঠাকুরের বাণী দুনিয়ার প্রতি-প্রত্যেকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যেখানে সমস্ত দুনিয়ার সাথে সম্বন্ধ ইষ্ট বা শ্রেয়জন দিয়ে নয়, সেখানে আসক্তি কাজ করে ষোলআনা। যে আসক্ত সে প্রেম করতে পারে না। বড় হলে ছেলের হাতে মার খায়।

বড় অফিসার—বাড়িতে রুইমাছ নিয়ে এসেছে। স্ত্রী রান্না করে ছেলেকে মাছের মাথাটা দিয়েছে। খাবার টেবিলে অফিসার দেখছে আমার বাটিতে তো মাছের মাথাটা নেই। স্ত্রী বলল—ছেলেকে দিয়েছি। অফিসার রেগে গেল। খেতে খেতে ছেলে রেগে বাবাকে বলল—শালা চুপ্!

কিছুদিন আগেই এই ঘটনা শুনলাম।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব এবার নীরদাসুন্দরীকে বললেন আলোচনা করতে।

নীরদাসুন্দরী—আমি একটা বিড়াল পুষেছি। বিড়াল না হলে আমার চলে না। আমি বিড়ালে আসক্ত হয়ে গেছি। একবেলা না দেখতে পেলে চলে না।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—সেরকম আসক্তি ইষ্টের উপর হতে হয়। ইষ্ট না হ’লে আমার চলে না।

[ ইষ্ট-প্রসঙ্গে/তাং-১৫/৫/৭৬ ইং]

[প্রসঙ্গঃসত্যানুসরণ পৃষ্ঠা ১৮৫-১৮৬]