বন্ধুর নিকট … চেষ্টা ক’রো।

সত্যানুসরণ-এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

বন্ধুর নিকট কিছু প্রত্যাশা রেখো না, কিন্তু যা’ পাও, প্রেমের সহিত গ্রহণ ক’রো। কিছু দিলে পাওয়ার আশা রেখো না, কিন্তু কিছু পেলে দেওয়ার চেষ্টা ক’রো।

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

আজও বাণীটি নানাভাষায় পাঠের পর মিনতি ও তীর্যরাণীকে একবার ক’রে পড়তে বললেন। অতঃপর অতসীকে বাণীটি বুঝিয়ে বলতে বললেন।

অতসী—যদি বন্ধুর কাছ থেকে কোন জিনিস পাই, তা’ ভালবাসার সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে।

শ্ৰীশ্ৰীপিতৃদেব—ভালবাসার সঙ্গে গ্রহণ করা কেমন? তার আগে আছে ‘বন্ধুর নিকট কিছু প্রত্যাশা রেখো না’: প্রত্যাশা মানে কী?

অতসীকে চুপ থাকতে দেখে শ্ৰীশ্ৰীপিতৃদেব বললেন—মৃত্যুঞ্জয়, প্রত্যাশা কাকে বলে?

মৃত্যুঞ্জয় (রায়)—বন্ধুকে কিছু একটা জিনিস দিলাম, সে যে আমাকে কিছু দেবে এ আশা রাখব না।

শ্ৰীশ্ৰীপিতৃদেব এবার শাশ্বতীকে জিজ্ঞাসা করলেন—প্রত্যাশা কাকে বলে?

শাশ্বতী—বন্ধুকে কোন জিনিস দিলাম, তার বিনিময়ে আমি বন্ধুর কাছ থেকে কিছু পাব—একেই প্রত্যাশা বলে।

শ্ৰীশ্ৰীপিতৃদেব—ধর, আমার গাছে পেঁপে রয়েছে, তোমাকে পেঁপে দিলাম; কারণ, মনে আশা—তোমার বাগানে তরমুজ হয়েছে, আমি তোমার কাছ থেকে তরমুজ পাব। পেঁপের বিনিময়ে তরমুজ পাওয়ার এই যে আশা তা-ই প্রত্যাশা। শুধু বন্ধুর ক্ষেত্রেই যে এরকম, তা নয়। যাকেই দিই না কেন, দিয়ে পাওয়ার আশা করা ঠিক না।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব প্রদীপ পালকে জিজ্ঞাসা করলেন—‘প্রেমের সহিত গ্রহণ কর’-এর অর্থ কী?

প্রদীপ—‘প্রেমের সহিত’-এর অর্থ ভালবাসার সহিত।

শ্ৰীশ্ৰীপিতৃদেব—এই তো ঠিকই বলেছ। আমাকে যে দিচ্ছে তার সঙ্গে আমার ভালবাসা রয়েছে। সেইজন্য ভালমনে তার দেওয়া জিনিস গ্রহণ ক’রতে হয়। ঠাকুর সবাইকে আপন ক’রে নিতে বলেছেন। সকলেই আমার বন্ধু, সকলেই আমার আত্মীয়—ভাবতে হয়।

পরমদয়াল কিভাবে গ্রহণ করেন সে-প্রসঙ্গে বললেন—তুমি বাড়ীতে শসাগাছ বুনেছ, মনে-মনে সংকল্প ক’রলে গাছের প্রথম যে ফলটা হবে সেটা ঠাকুর-ভোগে দেবে। গাছ বড় হ’ল, অনেক শসা হ’ল। প্রথমের শসাটাতে বোলতায় কামড় দিয়েছে, তাই আর বড় হ’চ্ছে না; পরেরগুলি সব বড়। শসাগুলো দেখে তোমার মা বলছেন—বোলতায় বিঁধেছে, ওটা কেন নিয়ে যাবে? তুমি বলছ—সে-কি মা! এটা ঠাকুরের জন্য রেখেছি, এটা নিয়ে যেতেই হবে; বড়ও দেব। শসা নিয়ে তুমি ঠাকুর-বাড়ী গেলে। ঠাকুরের সামনে এসে বড় বড় শসা তুমি থলি থেকে দেখাচ্ছ। প্রথম ফলটার দিকে ঠাকুর দৃষ্টি দিয়ে বললেন—বাঃ, খুব সুন্দর জিনিস নিয়ে এসেছিস তো! তোমার চোখ দিয়ে জল ঝরে পড়ছে। তুমি বোধ করতে পারলে—ঠাকুর অন্তর্যামী, সেইজন্য ওই বোলতা কামড়ানো শসাটাই তিনি পছন্দ করলেন। কিন্তু তোমার হাতের শসা ও চোখে জল দেখে অনেক লোক হাসতে পারে, ঠাট্টা ক’রতে পারে। কিন্তু তাঁর মহিমা তুমি উপলব্ধি ক’রতে পারলে। ইষ্টের প্রতি ভালবাসা যদি থাকে, সেই ভালবাসা থেকে যা’ দেওয়া যায় তা-ই অমূল্য।

শ্ৰীশ্ৰীপিতৃদেব এবার ধৃতিবল্লভকে (সিকদার) জিজ্ঞেস করলেন—বাণীতে আছে, কিছু পেলে দেওয়ার চেষ্টা করো। বন্ধু যদি কিছু দেয়, সেই জিনিসই কি তাকে দেব?

ধৃতিবল্লভ—আজ্ঞে।

শ্ৰীশ্ৰীপিতৃদেব—তা কেন? বন্ধু তোমাকে তার বাগানের পেঁপে দিল, তুমিও কি পেঁপে দেবে? তোমার বাগানে কুমড়ো হয়েছে, তুমি কুমড়ো দিলে। এবারে ‘প্রত্যাশা না রেখে’-এর অর্থ বুঝিয়ে বল।

ধৃতিবল্লভ—আমি বন্ধুকে কিছু দিলাম, কিন্তু তাই বলে বন্ধুর কাছ থেকে কিছু পাব আশা রাখব না।

শ্ৰীশ্ৰীপিতৃদেব—বাঃ! তুমি তো ঠিকই বলেছ। কাউকে কিছু দিয়ে কখনো ভাবতে হয় না, ও কিছু দেবে। নিঃস্বার্থভাবে দিতে হয়, পাওয়ার আশা না রেখে। কোন জিনিস, তা যত স্বল্প পরিমাণেই হোক, কেউ যদি দেয় খুব ভালবাসার ভাব নিয়েই তা নিতে হয়। বন্ধুকে দেবার আগে বাড়ীর বাবা, মা, দাদা-দিদিদের জিজ্ঞাসা করতে হয়। বাড়ীর জিনিস তো! না ব’লে দিতে হয় না। কথা বুঝেছ?

মিনতি, তীর্য, অতসী প্রভৃতি মেয়েরা এবং মৃত্যুঞ্জয়, ধৃতিবল্লভ প্রভৃতি ছেলেরা সকলে ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল।

[ ইষ্ট-প্রসঙ্গে/তাং-৩/২/৭৬ ইং]

[প্রসঙ্গঃ সত্যানুসরণ পৃষ্ঠা ৯২, ৯৩]