বিচারের ভার….হবে। – ব্যাখ্যা

সত্যানুসরণ-এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

বিচারের ভার, শাস্তির ভার আপনহাতে নিতে যেও না ; অন্তরের সহিত পরমপিতার উপর ন্যস্ত কর, ভাল হবে।

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

আদেশক্রমে শ্যামাপদ আলোচনা শুরু করল।

শ্যামাপদ—কেউ হয়তো দোষ করল। আমি তাকে শাস্তি না দিয়ে যদি ভাবি যে, শাস্তি দেওয়ার ভার তো একজনের উপরই—সুতরাং তিনি যা করেন! এরকম মনে করাই ঠিক। আর তা না ক’রে যদি আমি তার কাজের বিচার করি তাহলে ভাল হবে না।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—ঠিকমত বোঝা গেল না। কার ভাল হবে না—যে দোষ করল, তার না তোমার? অন্তরের সহিত মানে কী?

শ্যামাপদ—মানে হৃদয়ের সহিত।

—’অন্তরের সহিত পরমপিতার ওপর ন্যস্ত কর’—এখানে কী ন্যস্ত করার কথা বলা হচ্ছে?

—কেউ অন্যায় করল। সেই অন্যায় কাজটা….

—কী অন্যায় করল, উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দাও।

—কেউ আমার নিকট হতে দশ টাকা নিয়েছে। দিচ্ছে না। তাকে মারলাম। এটা নিজের ওপর বিচারের ভার নেওয়া হ’ল। আর তা না ক’রে ঐ শাস্তির ভার যদি পরমপিতার ওপর ন্যস্ত করি তাহ’লে ভাল হবে।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—ধর, আমি তোমার নিকট হতে দশ টাকা নিলাম, বললাম কয়েকদিন পর ফেরৎ দেব। তারপর পাঁচ মঙ্গলবার চলে গেল, দিলাম না। তখন কী হবে! পরমপিতার নিকট কী জানাবে? শাস্তির ভারটা কি পরমপিতার ওপর দেবে?

শ্যামাপদ—আজ্ঞে , হ্যাঁ।

—পরমপিতাকে কী জানাবে?

—আজ্ঞে, আপনি নিলে কোন দুঃখ হবে না। তাই পরমপিতাকে কিছুই জানাব না।

—আর অন্য কেউ নিয়ে টাকা ফেরৎ না দিলে

—তাহলে মনে দুঃখ পাব। তখন পরমপিতাকে জানাব, পরমপিতা তুমি এর জন্য ওর শাস্তিবিধান কর, আমি তো আদায় করতে পারলাম না!

শ্যামাপদর আলোচনা শুনে সকলের হাসির উদ্রেক হ’ল।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব (শ্যামাপদকে)—দূর পাগল!

মধুর হেসে পুনরায় শ্রীশ্রীপিতৃদেব জিজ্ঞাসা করলেন—আমি নিলে এরকম, আর অন্য কেউ নিলে তার জন্য অন্যরকম করতে যাবে কেন? বাণীতে যা বলা হচ্ছে তা কি বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য?

শ্যামাপদ কিছু উত্তর দিচ্ছে না দেখে তিনি উপস্থিত দাদাদের পানে তাকিয়ে একই প্রশ্ন করলেন।

হরিপদদা (দাস)—আজ্ঞে না। ঠাকুর যা বলেছেন তা সর্বকালে সর্বক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—তাহলে কী হ’ল? শ্যামাপদর যুক্তি তাহলে মানা যাচ্ছে না—না কি?

কারো মুখ থেকে কোন কথা সরছে না দেখে শ্রীশ্রীপিতৃদেব শ্যামাপদ-র প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ ক’রে বললেন—একজন আমার সাথে অন্যায় ব্যবহার করল। ধর, জোর ক’রে আমার পেনটা নিল। তখন মনে হয় মারি জোরে এক চড় । আর তা না ক’রে যদি মনে মনে প্রার্থনা করি—দয়াল, যা ভাল হয় তুমি এর বিচার কর, আমি কিছু করতে চাই না—এরকম সর্বান্তঃকরণে যদি তাঁর শরণাপন্ন হই, যদি অন্তরের সহিত তাঁর ওপর সব দায়-দায়িত্ব ছেড়ে দিই—তাহ’লে সব দিক থেকে ভালই হবে। বিচার ক’রে তো শাস্তি দিতে হয়! তা করলাম না। অন্তরের সহিত মানে Sincerely পরমপিতার ওপর সে সবের ভার ছেড়ে দিলাম। এমন করলে ভাল হবেই। সকলেরই ভাল হবে—যে দোষ করল আর যার বিরুদ্ধে দোষ করল—উভয়েরই।

অন্তর্ভেদী দৃষ্টি মেলে তিনি পুনরায় বললেন—একজন খামাখা এক ফকিরকে মেরে দিল। তার পরদিন থেকে তার পা ফুলে গেল, নড়তে পারে না। আগে কিছুই ছিল না, হঠাৎ ফুলে গেল। এরকম ঢের case (ঘটনা) দেখা গেছে।

কেউ টাকা নিয়েছে, দিল না। যদি পরমপিতার উপর নির্ভর করা যায়—’দিল না! ঠাকুর তোমার যা ইচ্ছা’!—তাহলে একদিন না একদিন সে দিয়ে দেবেই। sincerely (অকপটে) তাঁর ওপর নির্ভর করা চাই কিন্তু।

[ ইষ্ট-প্রসঙ্গে/তারিখ-১০/৬/৭৭ ইং ]

শ্রীশ্রীপিতৃদেব বললেন—নিজে যত কষ্টসহিষ্ণু হবে, ধৈর্য ও অধ্যবসায় বাড়াবে ততই ভাল। ধর, তোমার পেনটা কেউ চুরি করল এবং চোর ধরে ফেললে; তবে তাকে শাস্তি দিতে নাও পার। তার কারণ তুমি যদি ভাব পেনটা পরমপিতা দিয়েছিলেন প্রয়োজন আছে বলে, এখন হয়ত আর প্রয়োজন নাই, তাই তিনি তাঁর জিনিস নিয়ে নিয়েছেন; আবার যখন প্রয়োজন হবে হয়ত জুটিয়ে দেবেন এমন ভাবতেও পার! ঐ চুরির প্রতিবিধান নাও করতে পার।

আবার কেউ অন্যায়ভাবে কানমোলে দিলে—তার প্রতিবাদ নাও করতে পার। সহ্য করে নিতে পার, আর ভাবতে পার; আমি হয়ত কোনদিন কারুর মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিলাম তার পরিবর্তে আজ কানমোলা খেলাম। সামান্য কিছু একটা বিনিময়ে পেতেই হবে।

এ তো গেল নিজের বেলায়।

আবার কোথাও যদি দেখি অন্যায়ভাবে কেউ কাউকে মারছে, সেখানে কি করব! প্রকৃত অন্যায়কারীকে বের করতে হবে, তাকে না মেরে। আর যথাযথভাবে বিচারের ব্যবস্থা করব।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব জিজ্ঞাসা করার পূর্বেই উক্ত দাদা বললেন—আজ্ঞে, এখন বুঝতে পেরেছি।

[ তাঁর সান্নিধ্যে/তাং-১৫/১২/৭৪ ইং]

বৃতিসুন্দর ভট্টাচার্য আলোচনার নির্দেশ পেয়ে পূণরায় বাণীটি পাঠ করে বলল—এখানে ঠাকুর বলেছেন—যদি কেউ কোন অন্যায় করে থাকে তাকে বিচার না করে, শাস্তি না দিয়ে বলতে হবে পরমপিতার ইচ্ছাই মঙ্গল, পরমপিতা তার ব্যবস্থা করবেন।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—কে কি অন্যায় করল? কে তার বিচার করবে?

—আমার প্রতি যদি কেউ অন্যায় করে, আমি ভাববো—ভগবান সবার মঙ্গলদাতা, তিনি যা করেন সেটাই মঙ্গল—এই ভাবব। আমি তার ব্যবস্থা করতে যাব না।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—ঐ ভেবে ভেবে পরমপিতার উপর ছাড়ব? সোজাসুজি ছেড়ে দিলে হয়। তিনি মঙ্গলময়, যা করেন তাই হবে। তিনিই ব্যবস্থা করবেন।—অন্তরের সহিত মানে?— সর্বান্তকরণে। সহজভাবেই হয়, বুদ্ধি করে হয় না। সৎ-এর পথ খোলা। অসতের পথ কন্টকাকীর্ণ।

[পিতৃদেবের চরণপ্রান্তে/ তারিখ-১২/ ৯/৭৯ ইং]