ভাবমুখী থাকতে… থাকবে।-ব্যাখ্যা

সত্যানুসরণ-এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

ভাবমুখী থাকতে চেষ্টা কর, পতিত হবে না বরং অগ্রসর হ’তে থাকবে।

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

শ্রীশ্রীপিতৃদেব মুরলীকে বাণীটি আলোচনা করতে আদেশ দিলেন।

মুরলী বাণীটি পুনরায় পাঠ ক’রে আলোচনা শুরু ক’রল—ভাবমুখী মানে ইষ্টমুখী, মানে ঈশ্বরমুখী।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—ভাবমুখী মানে ইষ্টমুখী কেমন ক’রে, বুঝায়ে বল। আলোচনা মানে যুক্তি দিয়ে বোঝা এবং বোঝানো।

মুরলী—ভাব আসছে ভূ ধাতু থেকে। ভূ মানে হওয়া। আমার মনে ভাব আছে তাঁর কাজ করব, তাঁর সেবা করব।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—তাহ’লে তাঁর সেবা করার ভাব নিয়ে থাকব। কী হ’তে চাই, না সেবক। কীরকম সেবক, না তাঁর একান্ত সেবক। সুতরাং কী হ’তে হবে?

—তাঁর মনের মত, তিনি যেমন চান, সেইরকম।

—বল, অকপট সেবক । অকপট সেবক হ’তে চাই আমি। সে-রকম হ’তে গেলে কী ক’রতে হবে?

—চেষ্টা ক’রতে হবে।

—সেদিকেই মন রাখার চেষ্টা ক’রতে হবে। সেদিকে মন রাখার মানে কী?

—সেই ভাব মনে রাখব সবসময়।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—ঠিকই বলেছ। তারপর?

মুরলী বই দেখে বাণীর শেষাংশ পাঠ করল—কখনো পতিত হবে না, বরং অগ্রসর হ’তে থাকবে।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—তার মানে? পতিত মানে বল।

মুরলী— নীচে পড়া।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—যদি ভাবমুখী থাকতে পারি তাহ’লে তাঁর দিকে এগিয়ে যেতে পারব। আমার যে অপকট সেবক হওয়ার বাসনা আছে তা’ পূর্ণ হবে। বক্সী বল, কেমন ক’রে অগ্রসর হওয়া যায়।

ধৃতিদীপী—যদি আমার মনে একান্ত সেবক হওয়ার ভাব থাকে তাহ’লে যা-যা ক’রলে তা’ হওয়া যায় তা’ করব।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—তার মানে?

ধৃতিদীপী—তিনি যা-যা বলেছেন তা’ ঠিক-ঠিক পালন করব। তাঁর আদেশ মেনে চলব। তিনি যা’ বলেন সেগুলি যদি ঠিকমত করতে পারি তাহ’লে সেবক হ’তে পারব।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—আমি তো তাঁর অকপট সেবক হ’তে চাই, কিন্তু অতশত বুঝব কেমন ক’রে—ঠিক-ঠিক আদেশ পালন হ’চ্ছে কি-না? আদত কথা হ’ল, তাঁতে অচ্যুতভাবে লেগে থাকতে হবে। ঠাকুর বলছেন অগ্রসর হওয়ার বিষয়ে। যদি ভাবমুখী থাকতে পারি তাহ’লে তাঁর অকপট সেবক হওয়া যায়। যদি আমি সব জায়গাতেই গিয়ে বসি—যারা আদর্শকে ভালবাসে তাদের সঙ্গ করি, আবার যারা বিরুদ্ধাচরণ করে তাদের কাছেও বসি তখন আমার সেই ভাব নষ্ট হ’য়ে যাবে। অনেক ভক্তজন খবরের কাগজ পর্যন্ত পড়ে না ভাব নষ্ট হ’য়ে যাবে বলে। আর পড়লেও ইষ্টের সম্পর্কে যে কথা সেই কথা শুধু পড়ে। এমন কথা শোনে না, এমন খাবার খায় না যাতে ভাব নষ্ট হ’য়ে যায়। যারা ভাবমুখী থাকতে চেষ্টা করে তারা ঐরকম । আমি ঠাকুরের দীনসেবক হ’তে চাই, সে’জন্য তাঁকে ভাবব, তাঁর গুণ-কীর্তন ক’রব। তাঁরই আলাপ-আলোচনা, ধ্যান-ধারণা, তাঁর সম্বন্ধে লেখা, তাঁর মহিমা-সম্পর্কিত বই পড়া—এগুলি সবই ভাবমুখী হ’তে পুষ্টি জোগায়। ভাবমুখী থাকতে-থাকতে এমন অবস্থা আসে যখন বুঝতে পারা যায় কখন কী ক’রতে হবে, কেন এমন হ’ল ইত্যাদি। বিপদের আশঙ্কাও আগে থাকতেই সে বুঝতে পারে, টের পায় এখানে থাকা ঠিক হবে কি-না। এটা হ’ল অগ্রগতির একটা stage (স্তর), যখন করণীয় সম্বন্ধে এরূপ divine dictation (ঐশী নির্দেশ) পেয়ে থাকে। শুধু ঠাকুরের বাণীশ্রবণ, তাঁর গ্রন্থপাঠ, তাঁরই যাজন করা, তাঁকে যারা ভালবাসে তাদের সঙ্গ করা এবং অন্যদিকে কান না দেওয়াকে অনেকে গোঁড়ামি মনে করতে পারে। কিন্তু সাধনার জিনিসই হ’চ্ছে তা-ই। চারাগাছ যখন থাকে তখন চারদিক ঘিরে দিতে হয়, যাতে পোকামাকড়, ছাগল-ভেড়ায় না নষ্ট ক’রে দেয়। মানুষের ক্ষেত্রেও তা-ই।

[ইষ্ট -প্রসঙ্গে/তাং-২৯/৯/৭৬ ইং]

[প্রসঙ্গঃ সত্যানুসরণ পৃষ্ঠা ২৭৪ – ২৭৫]