তুমি যা’ই দেখ না কেন, … ফেল।-ব্যাখ্যা

সত্যানুসরণ -এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

তুমি যা’ই দেখ না কেন, অন্তরের সহিত সর্ব্বাগ্রে তা’র ভালটুকুই দেখতে চেষ্টা কর, আর এই অভ্যাস তুমি মজ্জাগত ক’রে ফেল।

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

বাণীটি পাঠ করার পর শ্রীশ্রীপিতৃদেব জিজ্ঞাসা করলেন—এর মধ্যে আলোচ্য অংশটুকু কী?

হরিপদদা—’তুমি যা’ই দেখ না কেন?’ এখানে ‘যা’ই’ বলতে কী বুঝব?

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—কে বলবে?

গুরুকিংকরদা—মুরারিদা (দাঁ) বলবে।

মুরারিদা কিছু বললেন। কিন্তু বিষয়টা পরিক্ষার হচ্ছে না দেখে শ্রীশ্রীপিতৃদেব বললেন—সহজ উদাহরণ দে, আমরা সবাই যেন বুঝতে পারি।

অতঃপর শ্রীশ্রীপিতৃদেব বললেন—মানুষের মধ্যে ভাল গুণ আছে, মন্দও আছে। ঠাকুর বলছেন তার ভাল গুণটা দেখ। ভালরই চর্চা কর।

গুরুকিংকরদা—পুজা করতে যাচ্ছি, আসনে বসে দেখি চাঁদমালাটা নাই। কাছে ছেলেগুলো ছিল, ভাবছি ওরাই নিয়েছে—তাদের নিয়ে নানা নিন্দাবান্দা করছি। পরে দেখি আমারই হাত থেকে রাস্তায় পড়ে গেছে। যদি বলতাম গেছে তো গেছে কি হয়েছে। তাহলে খারাপ দেখা হ’ত না।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব হরিপদদাকে জিজ্ঞাসা করলেন—খারাপ দেখলে কী হয়?

হরিপদদা—খারাপ হয়।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—ভাল দেখলে কী হয়?

হরিপদদা—ভাল হয়।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—খারাপ দেখলে খারাপ ক্রিয়া হয়।

গুরুকিংকরদা—সুশীলদা নামে এক দাদা খক্খক্‌ করে ঘরের মধ্যে কেশে থুথু ফেল্ল। তিত্তিরি তাকে বলল—থুথু ফেললে কেন? সুশীলদা বলল—তুমি পরিষ্কার কর।

হরিপদদা—সেবা করার সুযোগ পেয়েছি—তিত্তিরি এরকম ভাবলে পারত।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—কাশের উদাহরণ দিলি। কাশের গল্পই কচ্ছি। মহাত্মাজী (মহাত্মা গান্ধী) ভাগলপুর যাচ্ছেন। থার্ড ক্লাস কম্পার্টমেন্টে উঠেছেন। পাশে এক বিহারী ব্যবসায়ী বসে আছেন। লোকটি গাড়ির মধ্যেই থুথু ফেলল। মহাত্মাজী মিষ্টি করে বললেন—এত লোক কম্পার্টমেন্টে আছে, আপনি বাইরে ফেলুন। সে বলল—না, এখানেই ফেলব। মহাত্মাজী খবরের কাগজ পড়ছিলেন। খবরের কাগজের টুকরা দিয়ে তিনি ঐ কাশ বাইরে ফেলে দিলেন। এমনি করে ৩/৪ বার ফেলার পর আর ফেলেনি।কিছুক্ষণ পর ট্রেন ভাগলপুর স্টেশন পৌঁছে গেল। প্ল্যাটফর্মে বিরাট ভিড়। মহাত্মা গান্ধীকে receive করার জন্য মালা নিয়ে বহুলোক অপেক্ষা করছিল। বন্দে মাতরম্‌ ধ্বনি দিয়ে, ফুলের মালা নিয়ে মহাত্মাজীকে অভ্যর্থনা জানাবে। সেই ব্যবসায়ীটি বুঝতে পারল ইনিই মহাত্মা গান্ধী। তখন খুব লজ্জিত হল এবং পুনঃ পুনঃ ক্ষমা প্রার্থনা করল।

মহাত্মা অশ্বিনীকুমার দত্ত সম্বন্ধেও এক কাহিনী আছে। দুপুরবেলা রাস্তার ধারে বাড়ির সামনে এক যুবক ও একজন যুবতী বসে আছে। যুবতীর বিধবার পোষাক। অশ্বিনী দত্তের সাথে তাঁর বন্ধু আছে। বন্ধু দেখে বলছে—দুপুরবেলা কেমন মেয়েমানুষ নিয়ে গল্প করছে—দেশের মানুষের কেমন অবনতি। অশ্বিনীবাবু সাথে-সাথে বললেন—ঐ মেয়েটি কোন আত্মীয় হবে বোধহয়। কৌতুহল নিরসন করতে বন্ধু খোজ নিয়ে জানলেন—ঐ মহিলা যুবকটির বৌদি। মা অসুস্থ। মায়ের জন্য বোতলে গঙ্গাজল নিয়ে যাচ্ছে। বন্ধুটি লঙ্জিত হল, ভুল comment করার জন্য ।

[ ইষ্ট-প্রসঙ্গে/তাং-১০/১২/৭৫ ইং]

বাণীটি আলোচনা কালে সকলের কাছে অর্থ ঠিকমত বোধগম্য না হওয়ায় শ্রীশ্রীবড়দা বললেন—ধর্‌, কেউ যদি ভুল কিছু করে, তাকে কিছু বলব না? এখন যদি কিছু বলি তবে ভেবে দেখতে হবে এর প্রতিক্রিয়া কি হতে পারে, আর না বললেই বা কি ক্রিয়া হবে। আমি যদি বুঝিয়ে মিষ্টি করেই বলি বা কড়া করেই বলি, তার ভিতর ‘আমি’ থাকেই। কেউ হয়ত প্রস্রাব ক’রে জল দেয়নি, তুমি সব্বাইকে সেকথা বলে চেঁচিয়ে ফাটিয়ে দিলে। বুঝলে না, এতে তার ego আরও বেড়ে গেল! তোমার ঠিকমত বলবার ধৈর্য্য নেই। ঠাকুর সদাচারের কথা বলেছেন তাই তুমি তাকে বললে। যদি বলতেই হয় তবে সদাচার সম্বন্ধে অন্য কথাও আস্তে আস্তে তুলে ধরতে হয় যা’তে তার বোধে আসে। তখন সে জীবনীয় আচার-বিচারগুলি না মেনেই পারে না। আর এভাবেই আমার মধ্যে ভাল যা’ কিছু তা’ অন্যের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ পাব, আর আমার অভ্যাস স্বভাবগত হ’য়ে উঠবে।

[ যামিনীকান্ত রায়চৌধুরীর দিনলিপি/তাং-২১/৫/৭১ ইং]

[প্রসঙ্গঃ সত্যানুসরণ পৃষ্ঠা ৩৯, ৪০]