“মন-মুখ এক হ’লে …. পারে না।” – ব্যাখ্যা

সত্যানুসরণের বাণীটি হলোঃ

মন-মুখ এক হ’লে আর ভিতরে গলদ জমতে পারে না-গুপ্ত আবর্জনা ভাষায় ভেসে উঠে পড়ে। পাপ গিয়ে তার ভিতর বাসা বাঁধতে পারে না।

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক প্রদত্ত ব্যাখ্যা :

শ্রীশ্রীপিতৃদেবের আদেশে কৃতি আলোচনা শুরু করল—মনমুখ এক মানে, মনে যা আছে, মুখেও তাই রয়েছে। তখন ভিতরে পাপ থাকে না।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—মনমুখ এক হওয়া মানে, মনে যেটা হচ্ছে মুখে সেটা প্রকাশ করছি তো! মনমুখ এক হ’লে কী হয়?

কৃতি—তাহ’লে কোন গলদ জমতে পারে না।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—সেটা উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে বলতে হবে তো! বেণু বল তো!

বেণুকে নিরুত্তর দেখে শ্রীশ্রীপিতৃদেব বললেন—যেমন, আমি মনে-মনে ভাবলাম বেণু খুব ঝগড়াটে, মুখেও বললাম তা’। তা’ শুনে বেণুর মা-বাবা-দাদা সবাই লাফায়ে এল,—আমার মেয়ের নামে এমন কথা! আমার সঙ্গে ঝগড়া বাধায়ে দিল। কিন্তু তোমার (বেণুর) বাবা-মা-র মনে যা হয়েছে তা-ই তারা করছে, আবার আমার মনে যা হয়েছে তা-ই আমি বলেছি। তাহ’লে তো কারও মধ্যেই পাপ গিয়ে বাসা বাধতে পারল না। কিন্তু আমাদের মধ্যে ঝগড়া বেধে গেল। এতে লাভ কী হ’ল?—বল।

বেণু ও কৃতি উভয়কে নিরুত্তর দেখে শ্রীশ্রীপিতৃদেব বললেন—ও (বেণু) খুব ঝগড়াটে আমার মনে হয়েছে, কিন্তু সবার কাছে তা বলতে যাব কেন? যেখানে বললে ভাল ছাড়া মন্দ কিছু হয় না সেখানে বলতে হয়। বলে কোন খারাপ প্রতিক্রিয়া না হয় দেখতে হয়। যেখানে প্রয়োজন সেখানেই শুধু প্রকাশ করব।

এবার ছেলেদের দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে শ্রীশ্রীপিতৃদেব বললেন—ননীদার একটা জিনিস দেখে আমার লোভ হ’ল, নিতে খুব ইচ্ছে হ’ল। না ব’লে নিয়েও নিলাম। নিয়ে ভাবছি কাজটা খুব অন্যায়। মনে-মনে ভাবছি—না নিলেই ভাল হ’ত, ননীদা খোজাখুঁজি করছেন! ননীদারও খুব দুঃখ হচ্ছিল জিনিসটা হারানোর পর। এমন সময় আমি যদি কাছে গিয়ে বলি, আমার খুব অন্যায় হয়ে গেছে, আপনার জিনিসটা আমি না ব’লে নিয়েছি। তখনো যদি ননীদাকে জিনিসটা ফেরৎ দিই, ননীদা ভাববেন— ছেলেটা বেশ ভাল তো! মনটা বেশ সরল! নিয়েছে, কিন্তু অকপটে স্বীকার তো করল। এর ফলে ননীদার মনে আনন্দ হ’ল, আমিও দুশ্চিন্তার হাত থেকে মুক্ত হলাম, ভিতরের গলদ চলে গেল।

বাড়িতে বা স্কুলে কোন জিনিস না বলে নিলে গুরুজন বা তার কাছে গিয়ে স্বীকার করতে হয়। ভেতরে রাখতে হয় না। সবাই চিনেবাদাম খাচ্ছে দেখে তোমারও খেতে ইচ্ছে করছে। হাতে পয়সা নেই। না ব’লে তোমার বাবার জামার পকেট থেকে একটা সিকি বের করে চিনেবাদাম কিনে খেলে। না বলে নিলেও খোঁজাখুঁজি করার পূর্বেই বাবাকে বলতে হয়, বাবা, জামার পকেটের একটা সিকি বের ক’রে চিনেবাদাম খেয়েছি। যদি বাবার কাছে স্বীকার না কর, আবার একদিন নেবে, আবার একদিন নিতে ইচ্ছা হবে। এমনি করতে-করতে সাহস বেড়ে যাবে, চুরিতে অভ্যস্ত হ’য়ে যাবে। না ব’লে নেওয়া খুব খারাপ। কিন্তু মনমুখ এক হ’লে না-ব’লে কোনদিন নিলেও তোমার ভেতর কোন গণ্ডগোল বা গলদ জমতে পারবে না। সবার সঙ্গে মিল হবে, সবাই ভালবাসবে। তুমিও ভালবাসতে পারবে সবাইকে । ছেলের। সকলে বুঝতে পারছো?

ছেলেরা—আজ্ঞে হ্যাঁ।

[ইষ্ট-প্রসঙ্গে/তাং-১৫/১২/৭৬ ইং]

নির্দেশক্রমে অর্চিনন্দন আলোচনা শুরু করল।

অর্চিনন্দন—মন-মুখ যদি এক করি তাহলে ভিতরের গলদ সব নষ্ট হয়ে যায়।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—গলদ কী?

অর্চিনন্দন—মনের ভিতর অন্যরকম চিন্তা।

— অন্যরকম চিন্তা কী? চিন্তা সব সময় তো নানারকম হচ্ছে। এক চিন্তাই যদি করতাম তাহলে তো কাজই হয়ে যেত।

—ভিতরে যা হয় তার সবটুকু প্রকাশ না করা।

—আকাশে তো অনেক তারা দেখি সব তো প্রকাশ করা যায় না তাহলে গলদ কী?

অর্চিনন্দননের কাছ থেকে উত্তর না পেয়ে শ্রীশ্রীপিতৃদেব অক্ষয়কুমার মিশ্রকে একই প্রশ্ন করলেন।

অক্ষয়দা—গলদ মানে ময়লা।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—ময়লা কী?

—ময়লা হল যা ত্যজ্য পদার্থ। যাকে ভিতর থেক্ষে বের ক’রে দেওয়া উচিৎ।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—সে তো বুঝলাম। কিন্তু এখানে কী বের করে দেওয়া উচিৎ? মনের গলদ কী—তা তো বোঝা যাচ্ছে না।

এরপর তিনি নিজেই উত্তর দিলেন—পাপচিন্তাই হ’ল মনের গলদ । যে চিন্তা জীবনবৃদ্ধির অন্তরায় সেই চিন্তাই পাপ; আর তা-ই মনের গলদ। কখনো হয়তো পাপচিন্তা করলাম। কিন্তু যদি তা’ প্রকাশ করি, যেখানে প্রকাশ করা দরকার, তাহলে এ পাপচিন্তা আর থাকে না।

যদি অন্যায়, অসংগত চিন্তা করি আর সেটা যদি প্রকাশ না করি তাহলে তা’ থেকেই যাবে। সেজন্য তা’ প্রকাশ করতে হয়—বাবা-মার কাছে, শিক্ষকমশাইয়ের কাছে, কিংবা হিতাকাঙ্ক্ষী কারো কাছে—যেখানে যেমন প্রয়োজন।

[ইষ্ট-প্রসঙ্গে/তাং-৬/৪/৭৯ ইং]

[প্রসঙ্গঃ সত্যানুসরণ এর পৃষ্ঠা ৮, ৯]