তোমার মন থেকে …. ইহা নিশ্চয়। – ব্যাখ্যা

সত্যানুসরণ-এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

তোমার মন থেকে যে-পরিমাণে বিশ্বাস স’রে যাবে, জগৎ সেই পরিমাণে তোমাকে সন্দেহ ক’রবে বা অবিশ্বাস ক’রবে, এবং দুর্দ্দশাও তোমাকে সেই পরিমাণে আক্রমণ ক’রবে, ইহা নিশ্চয়।

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

সব ভাষায় পাঠ হ’লে শ্রীশ্রীপিতৃদেব সতীশদা (পাল)-কে বললেন—আলোচনা কর।

সতীশদা কিছু বলার চেষ্টা করতেই শ্রীশ্রীপিতৃদেব বললেন—আগে বাণীটা প’ড়ে নে, তারপর বল্‌।

সতীশদা জোরে-জোরে বাণীটি পড়লেন। তারপর বললেন—আমার কাছে একজন লোক আছে। তাকে বিশ্বাস করি। তাকে আলু-পটল ইত্যাদি কিনতে বাজারে পাঠালাম। বাজারে গিয়ে যে-দামে কিনেছে তার চেয়ে বেশী দাম ব’লে সে কিছু পয়সা মেরে দিল। প্রতিবেশীরা যারা বাজারে গিয়েছিল, তাদের কাছ থেকে বাজার দর জেনে বুঝতে পারলাম আমার ভৃত্যটি পয়সা মেরে দিয়েছে। তারপর আমি তার উপর সন্দেহ করলাম। তার প্রতি আমার অবিশ্বাস এল। এরপর থেকে আমি সবাইকেই অবিশ্বাস করতে থাকলাম। তখন আমাকে দুর্দশায় ঘিরে ধরবে।

এরপর শ্রীশ্রীপিতৃদেব অনেককেই এ বিষয়ের উপর জিজ্ঞাসা করলেন। অনেকে অনেক রকম ক’রে বলল। কিন্তু ঠিক অর্থ স্পষ্ট হ’ল না।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব বললেন—ওই example (সতীশদার উদাহরণ) দিয়ে বোঝান যায় না?

ভবানীদা (রায়)—আজ্ঞে, সতীশদা যে উদাহরণ দিলেন তাতে এ-রকম দাঁড়াচ্ছে—অবিশ্বাসের কাজ করল ঐ লোকটি যাকে বাজারে পাঠিয়েছিলাম কিন্তু শেষ পর্যন্ত দুর্দ্দশা ঘিরে ধরল আমাকে। ঐ লোকটি অবিশ্বাসের কাজ করল ব’লে আমি সবাইকে অবিশ্বাস করতে থাকলাম এবং তার ফল ভোগ করলাম—এটা কেমন ক’রে হয়? পাশেই ছিলেন দুর্গেশদা (মালাকার), তিনি ভবানীদার কথায় সায় দিলেন।

সতীশদা—কিন্তু এটা তো দেখা যায় আমি কোন ভৃত্যকে অবিশ্বাস করলাম, পরে অন্য যারা ভৃত্যের কাজ করে তাদেরকেও সন্দেহ করি; আর এ থেকে অন্য মানুষের প্রতিও আমার সন্দেহ বেড়ে গেল।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—না, না, তা’ নয়। ওইটাই ঘুরিয়ে বললেই হয়।

সতীশদা—আজ্ঞে, একজন অবিশ্বাসের কাজ করল, এরপর অন্যদের পূর্বের মত বিশ্বাস করি কি ক’রে?

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—ব্যাপারটা ঠিক তা’ না। এখানে তোমার বিশ্বাস-অবিশ্বাসের কথা হচ্ছে না। তুমি তাকে (যাকে বাজারে পাঠালে) বিশ্বাস কর ঠিকই কিন্তু সে-ই তোমার উপর বিশ্বাস হারাল। তোমার বাজারের পয়সা চুরি ক’রে অবিশ্বাসীর কাজ করল। অর্থাৎ, তার হৃদয় থেকে তোমার প্রতি বিশ্বাসের ভাব স’রে গিয়েছে, তাই ও-কাজ ক’রে বসল। এভাবে অবিশ্বাসীর কাজ ক’রে সে তোমার নিকট অবিশ্বাসী হয়ে উঠল। তুমি তাকে ছাড়িয়ে দিলে।

এর মধ্যে সে অনেকের নিকট অবিশ্বাসী হ’য়ে গেছে। কেমন ক’রে, শোন! ধর, তোমার প্রতিবেশী জানল, ঐ ভৃত্যটি পয়সা চুরি করেছে। সে তার স্ত্রীর নিকট গল্প করল। তার স্ত্রী আবার পাড়ার অন্য কাউকে বলল। এভাবে পাড়াসুদ্ধ লোকের নিকট সে অবিশ্বাসী হ’য়ে উঠল। তুমি ও তোমার পাড়া-প্রতিবেশী নিয়ে যে জগৎ সে জগৎসুদ্ধ লোকের বিশ্বাস হারাল। দুর্দশা তখন তাকে ঘিরে ফেলল। বিষয়টা পরিষ্কার করার জন্য শ্রীশ্রীপিতৃদেব আরেকটা উদাহরণ দিলেন।

ধর, কোন ব্যাংকের ক্যাশিয়ার। ব্যাংক থেকে তহবিল তছরূপ করল। কয়েকবার করায় জানাজানি হ’য়ে গেল। ধরা পড়ল। ব্যাংকের সমস্ত লোক জেনে ফেলল। বাইরেও খবরটা ছড়িয়ে পড়ল। এখন সে কি আর সহজে চাকরী পাবে? দুর্দশা তাকে ঘিরে ধরল।

দুর্গেশদা—আজ্ঞে, ঐ বিশ্বাস হারানোর ব্যাপারটা কেমন? কোন লোক চুরি করল—এটা জেনেই তো আমি তাকে অবিশ্বাস করলাম। তা’ না হলে কাজে ছাঁটাই ক’রে দেওয়ার ব্যাপার আসে কি ক’রে?

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—তাকে কাজে নিযুক্ত রাখা বা ছাটাই করার সঙ্গে তোমার বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ব্যাপার জড়িয়ে নেই। আমরা যখন কোন কাজ করি বা ওই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিই, তখন কার্য-কারণের সূত্র ধ’রেই ক’রে থাকি। ধর, তুমি একটা পথ ধ’রে হাটছ। শুনলে এ-পথে বাঘ লুকিয়ে থাকে। কিছু দূর গিয়ে বাঘের গন্ধও পেলে। এরপর কি তুমি সে-পথ ধ’রে হাঁটবে?

কিংবা ধর, তুমি শুনলে এ-সাপের বিষ আছে। এ-সাপ কামড়ায়। সাপে-কাটা মানুষের মৃত্যুও দেখেছ। এ-সত্ত্বেও কি তুমি সাপের মুখে এগিয়ে যাবে? (একটু থেমে) আসলে কার্য-কারণের সূত্র ধ’রে আমরা যখন কোন বিষয়ে নিশ্চিত হই তখন ওই নিশ্চিত বিষয়ের উপর দাঁড়িয়েই কাজ করি। এতে কারও প্রতি বিশ্বাস-অবিশ্বাস হারানোর ব্যাপার কি জড়িয়ে থাকে?

আমাদের অনেকেই এখনও ঠিক বুঝতে পারছে না দেখে শ্রীশ্রীপিতৃদেব ব্যাখ্যা ক’রে বললেন—ধর, আমাদের কেউ ঋত্বিক—কিন্তু মাছ-মাংস খায়, ঠাকুরের অনুশাসনবাদ মানে না। এখানে অবিশ্বাসের কাজ কে করল? শ্রীশ্রীঠাকুর, না ঐ ঋত্বিক? নিশ্চয় ঠাকুর অবিশ্বাসের কাজ করেননি। তিনি আমাদের ঠিকই বিশ্বাস করেন। কিন্তু ঐ ঋত্বিকই ঠাকুরের প্রতি ঠিক-ঠিক বিশ্বাস রাখতে পারেনি। যদি তা’ পারত তাহলে ঐভাবে মাছ-মাংস খেতে পারত না। ঠাকুরের প্রতি ঠিকমত আস্থা নেই তাই ঐ ঋত্বিক ঠাকুরের অনুশাসনবাদ পালন করতে পারল না। এই অবিশ্বাসের কাজ থেকে অন্য সকলের নিকট ঐ ঋত্বিক অবিশ্বাসের পাত্র হ’য়ে দাড়াবে। জগৎসুদ্ধ লোক তখন তাকে ঘৃণা করবে এবং এর ফলে দুর্দ্দশা তাকে ঘিরে ফেলবে।

আসলে বিশ্বাস অর্থে এখানে ইষ্টের উপর বিশ্বাস বোঝাচ্ছে। যে তাঁকে বিশ্বাস ক’রে তাঁর পথে চলছে, জগৎসুদ্ধ সবাই তাকে ঠিক বিশ্বাস ক’রে চলবে। কিন্তু যে-মুহূর্তে তার ইষ্টের প্রতি বিশ্বাস স’রে যাবে সেই মুহূর্তে দুর্দ্দশা তাকে ঘিরে ধরবে। ঠাকুর আমাদের প্রতি প্রত্যেকের উপর বিশ্বাস রাখেন। যদি হারাই তবে আমরাই তা’ হারাই।

প্রসঙ্গ-ক্রমে শ্রীশ্রীপিতৃদেব তাঁর বাড়ীর ঘটনা উল্লেখ ক’রে বললেন—আমার বাড়ীতে কত লোক কাজ করে, তাদের কতজনে কত জিনিস চুরি করেছে, আমি দেখেছিও, কিন্তু তাদের প্রতি বিশ্বাস হারাইনি। তাদের কি ক’রে ইষ্টের প্রতি বিশ্বাস এনে দিতে পারি তারই চেষ্টা করি। আমার যদি কেউ কোন জিনিস চুরি করে তাতে আমার বিশেষ কিছু যায়-আসে না। এটা হ’ল, যে চুরি করল তার ব্যাপার। সে কতখানি ইষ্ট থেকে বিচ্যুত হচ্ছে সেটা জেনে তার প্রতিবিধান করা তখন আমার কর্তব্য।

বসাওনদা (সিং) শ্রীশ্রীপিতৃদেবের পাশেই বসেছিলেন। বললেন—বিশ্বাসের ক্ষেত্র সবাই হয় না। একমাত্র তিনিই (ইষ্ট) বিশ্বাসের ক্ষেত্র।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব এ-কথায় সম্মতি জানিয়ে বললেন—হ্যাঁ, সেজন্যই ঠাকুরের বলা আছে—

“You are for the Lord,
not for others;
you are for the Lord
and so for others.”

তুমি কেবলমাত্র Lord বা ইষ্টের জন্য। কেননা, তিনিই প্রকৃত বিশ্বাসের ক্ষেত্র। তুমি ইষ্টের উপর বিশ্বাস রেখেছ ইষ্টের জন্য। তাই তুমি জগৎসুদ্ধ সকলের জন্য—অর্থাৎ জগতের সকলেই তোমার জন্য। …… কি, বোঝা গেল?

—আজ্ঞে, হ্যাঁ (উপস্থিত সবাই একবাক্যে সম্মতি জানাল)।

[ ইষ্ট-প্ৰসঙ্গে/তাং-২৫/১০/৭৩]

[প্রসঙ্গঃ সত্যানুসরণ পৃষ্ঠা ২১৩ – ২১৪]