মানুষের আকাঙ্ক্ষিত মঙ্গল ….হন। – ব্যাখ্যা

সত্যানুসরণ-এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

মানুষের আকাঙ্ক্ষিত মঙ্গল তার অভ্যস্ত সংস্কারের অন্তরালে থাকে, আর মঙ্গলদাতা তখনই দণ্ডিত হন—যখনই দেওয়া মঙ্গলটার অভ্যস্ত সংস্কারের সঙ্গে বিরোধ উপস্থিত হয়—আর তাই প্রেরিত-পুরুষ স্বদেশে কুৎসামণ্ডিত হন।

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

শ্রীশ্রীপিতৃদেবের নির্দেশে জগজ্যোতিদা আলোচনা শুরু করলেন।

জগজ্যোতিদা—মানুষের আকাক্ষিত মঙ্গল মানে যে মঙ্গল মানুষ পেতে চায়, আকাক্ষা করে, সেই মঙ্গল পাওয়ার জন্য যা যা করণীয় তা’ সে করে না। তাই আকাঙ্কিত মঙ্গল লাভ করতে পারে না। অভ্যস্ত সংস্কার বা করা অনুযায়ী ফল পেয়ে থাকে।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—যা বলছে বোঝা যাচ্ছে তো?

গুরুকিংকরদা—অভ্যস্ত সংস্কার পরিষ্কার হ’ল না। আবার আকাঙ্খিত মঙ্গল অভ্যস্ত সংস্কারের অন্তরালে কেন থাকে তাও বলা দরকার।

জগজ্যোতিদা—অভ্যস্ত সংস্কার মানে যে-সব রীতি-নীতি, আচার-ব্যবহারে আমরা অভ্যস্ত।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—মানে যে-সব সংস্কার আমরা মেনে চলছি। একটা উদাহরণ দিবি তো!

এরপর শ্রীশ্রীপিতৃদেব সুধীরদাকে (সমাজদার) আলোচনা করতে বললেন।

সুধীরদা—আকাঙ্খিত মঙ্গল অভ্যস্ত সংস্কারের অন্তরালে থাকে। যেমন সতীদাহ প্রথা আমাদের দেশে ছিল। আমাদের দেশে এটা একটা অভ্যস্ত সংস্কার ছিল। স্বামীর প্রতি অটুট টানের দরুন স্ত্রীও সহমরণে প্ৰবৃত্ত হত। এতে স্বামীর প্রতি স্ত্রীর টানই প্রকাশ পায়। আকাঙ্খিত মঙ্গল হচ্ছে স্বামীর প্রতি তাঁর নিষ্ঠা, অচ্যুত টান। এখন অবশ্য দেশ থেকে সতীদাহ প্রথা উঠে গেছে।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—একটা সহজ উদাহরণ দেবে তো। ঠাকুরের বিষয় নিয়ে কত সহজ উদাহরণ দেওয়া যায়। তনু বল্‌ দেখি।

তনুদা ইষ্টভৃতি-বিষয়ে উদাহরণ দিচ্ছিলেন। কিন্তু সকলের নিকট পরিষ্কার হল না।

শ্ৰীশ্ৰীপিতৃদেব বললেন—আমরা প্রত্যহ ইষ্টভৃতি করি। সৎসঙ্গীরা না করেই পারে না। ঠাকুর ইষ্টভৃতির কথা যেমন সরাসরি বলে গেছেন পূর্বতন কোন মহাপুরুষই এমনভাবে তা তুলে ধরেন নি। তবে ইষ্টভৃতি সকলের (সব সম্প্রদায়ের) মধ্যেই কোন না-কোন ফর্মে আছে। ঠাকুরের দীক্ষাগ্রহণ করেছি আমরা। প্রত্যহ ইষ্টভৃতি নিবেদন ক’রে আহার গ্রহণ করি। সমাজের যারা দীক্ষা গ্রহণ করেনি তাদের অনেকের কাছে এর তাৎপর্য পরিষ্ফুট নয়। তারা কেউ-কেউ ঠাকুরের এই নীতিকে নিন্দা করে থাকে শোনা যায়। তারা ইষ্টভৃতি পরিপালনে অভ্যস্ত নয়। ঠাকুরকেও সমালোচনার মধ্যে ফেলে। ইষ্টভৃতি মঙ্গলের জিনিস। এর ফলে মানুষের কী মঙ্গল হয় যারা নিষ্ঠাসহকারে পরিপালন করছে তারা সকলেই জানে। ঠাকুরের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বড়-বড় পণ্ডিত ব্যক্তিদের মধ্যে অদূর ভবিষ্যতে কত চর্চা, কত গবেষণা শুরু হতে চলেছে।

সতীদাহ প্রথার উদাহরণও দেওয়া যায়। যেমন সমাজদার যা বলল তা দিয়েও হতে পারে। সহমরণ তো আসল জিনিস নয়। আকাঙ্খিত মঙ্গল হচ্ছে স্বামীর প্রতি টান, ভালবাসা, ভক্তি, স্বামীতে অনুগতি। স্বামীর ভালয় স্ত্রীর ভাল, স্বামীর মন্দে মন্দ, স্বামীর দুঃখে দুঃখ অনুভব। স্বামীর প্রতি এই টানের ফল সন্তান-সন্ততি বা পরবর্তী বংশধরগণের মধ্যেও বর্তায়। তাই টানের চর্চার জন্য যা-যা করণীয় তা-ই তা-ই করা প্রয়োজন। সমাজে সহমরণ প্রথা চলে আসছে। কিন্তু প্রেরিতপুরুষ সব সংস্কার বা প্রথার মধ্যে কতটুকু সত্যতা আছে, তার উদ্দেশ্যই বা কী তা খুঁজে বের করে দেখান এবং যা অনুসরণীয় নয় তা পরিষ্কার বলে দেন। সাধারণতঃ মানুষ বৃত্তি দ্বারা পরিচালিত। সংস্কারকে ভেদ করতে পারে না। তাই প্রেরিতপুরুষের মতবাদের সাথে অনেকের বিরোধ উপস্থিত হয়। তারা প্রেরিতপুরুষের নিন্দায় সরব হয়ে ওঠে।

এরপর শ্রীশ্রীপিতৃদেব প্রশ্ন করলেন—কিন্তু স্বদেশের কথা বলা হচ্ছে কেন? প্রেরিতপুরুষ স্বদেশে কুৎসামণ্ডিত হন কেন?

নিজেই উত্তর দিলেন শ্রীশ্রীপিতৃদেব—নিজের দেশের লোকেরা প্রেরিতপুরুষের গুরুত্ব দিতে পারে না। দেশের বাইরের লোক মহান আদর্শের কথা শুনে যতখানি আগ্রহান্বিত হয় স্বদেশের বহু মানুষ তত হয় না। যুগে যুগেই এর পুনরাবৃত্তি দেখা গেছে।

[ ইষ্ট-প্রসঙ্গে/তাং-৯/৯/৭৮ ইং]

মৈত্ৰেয়ী দে বাণীটি আলোচনা করার নির্দেশ পেয়ে বললেন—মানুষ সব সময়ই চায় ভাল থাকতে, ভাল করে বাঁচতে। কিন্তু ভাল থাকতে হলে যা করা উচিৎ তা না করলে মঙ্গল আসে না, অনেক সময় তা সংস্কারের অন্তরালে চাপা পড়ে থাকে।

আরও বিস্তৃত আলোচনায় শ্রীশ্রীপিতৃদেব বললেন—সকলেই মঙ্গল চায় তো, তাই সাধন-ভজন করে। কেউ চার্চে যায়, কেউ মন্দিরে যায়, পূজা-আর্চ্চা করে। মনে করে এটাই করা। ক্রমে ঐটা সংস্কার হয়ে দাঁড়ায়।

যীশু আসলেন চার্চে, দেখলেন টাকা-পয়সা লগ্নি হচ্ছে, ডিম বিক্রি হচ্ছে। তিনি জোর করে বললেন—এটা ধর্মের জায়গা—ভগবানের জায়গা । এখানে ও-সব চলবে না। কিন্তু তখন অভ্যাস হয়ে গেছে ঐ সব করা। তারা তাঁর কথা শুনতে চাইল না। তাতে বিরোধ উৎপন্ন হল।

আবার গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর সময় অনেকেই বলল—এই সব কীর্ত্তন-টীর্ত্তন চলবে না। একদল লোক মানল, একদল লোক মানল না। যখন অভ্যস্ত সংস্কারে ঘা লাগে তখন বিরোধিতা করে, আর মহাপুরুষ তখনই দন্ডিত হন। তিনি (মহাপুরুষ) বলেন—এটা করলে ভাল, কিন্তু তারা তা মেনে নিতে পারে না। তখন সকলে তাঁর নিন্দা করতে আরম্ভ করে।

[পিতৃদেবের চরণপ্রান্তে/তাং-২৬/৪/৮০ইং]

[প্রসঙ্গঃ সত্যানুসরণ পৃষ্ঠা ৩০৪]