মুক্তস্বার্থ হ’য়ে আদর্শে …. না। – ব্যাখ্যা

সত্যানুসরণ-এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

মুক্তস্বার্থ হ’য়ে আদর্শে দোষ দেখলে তার অনুসরণ ক’রো না—ক’রলে আত্মোন্নয়ন হবে না।

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

মদনমোহন পাল বাণীটি আলোচনা করার নির্দেশ পেয়ে পুনরায় পাঠ করে বললেন—স্বার্থচিন্তা যদি না থাকে তবুও আদর্শের দোষ দেখে তাহলে তার অনুসরণ করব না।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—যা লেখা আছে তাই বললে কী হবে! আগের বাণীতে আছে স্বার্থচিন্তা আদর্শে দোষারোপ করে, এখানে স্বার্থ চিন্তা নাই, মুক্তস্বার্থ। নিজেকে নিয়ে যে ব্যস্ত নয় সে মুক্তস্বার্থ। সবাই তো নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত, খাওয়া-দাওয়া, ঘুম-টুম, নিজের লজ্জানিবারণ।—আদর্শ মানে কি?—এমন একটা লোকের কাছে গেলি—যাঁকে সামনে রেখে চলবি, তাঁর মনের মত হওয়ার চেষ্টা করবি। তুই তো বড় হয়েছিস্‌—বড়র মত আলোচনা করিস্‌।

আবার বলছেন—মুক্তস্বার্থই বা হলাম কি করে, আদর্শকে সামনে রেখেই বা চললাম কেমন করে? সহজভাবে নিজের জীবন দিয়ে ভাব। —আমরা ঠাকুরের কাছে এসেছি কেন? নিজের বিষয় চিন্তা করলেই হয়। আমরা দয়ালের কাছে কি জন্যে এসেছি?

মদনদা—মঙ্গলের জন্যে।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—মঙ্গল হয় কখন? ঠাকুর আদর্শ আমাদের । তাঁর কাছে এসেছি কি জন্য? —যদি বৃত্তি-প্রবৃত্তির চাপে পড়ে থাকি তাহলে জীবন পথে এগিয়ে যেতে পারব না। আমি জীবনচলার পথে অগ্রসর হই তাঁকে সামনে রেখে। তাঁকে সামনে রেখে যখন চলি—তখন বৃত্তি-প্রবৃত্তি adjust হয়। আঘাত-প্রতিঘাত কম আসে। তাঁর কাছে যে আসে তার অন্তর সব সময় আনন্দে পূর্ণ থাকে। আমার একটা স্বার্থ আছে—তাঁর কাছে এসে যত কালিমা ঘুচিয়ে সপরিবেশ মঙ্গলের পথে চলব। মুক্তস্বার্থ হয়ে যদি দেখি তিনি নিজের স্বার্থ দেখছেন, তবে তাঁকে অনুসরণ করব না। করলে আত্মোন্নয়ন হবে না। —আত্মোন্নয়ন মানে কি? —সপরিবেশ আত্মার উন্নয়ন। —উন্নতি যাতে হয় তাই। এই পর্যন্ত বলে শ্রীশ্রীপিতৃদেব পরের গ্রন্থ পাঠের জন্য বললেন— ‘নে নে পড়্‌’।

কিন্তু আবার উপরিউক্ত বাণীটি প্রসঙ্গে বলছেন—মুক্তস্বার্থ হওয়াই তো আলাদা জিনিস। রাজা হরিশচন্দ্রের গুরু বিশ্বামিত্র। হরিশচন্দ্র শনির কোপে পড়েছেন। বিশ্বামিত্র বলল—এটা আমাকে দাও। এই রাজবাড়ি দাও। সব নিয়ে পথের ফকির করে দিল। পরে সবই ফিরে পেল। সব গুরুর দয়ায়। বিশ্বামিত্র বলল—এই নাও, তুমি শনির কোপের থেকে মুক্ত হয়েছ। আমি রেখে দিয়েছিলাম। সেই সময় হরিশচন্দ্র যদি ভুল বুঝত—গুরুর দোষ দেখত তাহলে উল্টো হত। হরিশচন্দ্রের কি দুর্ভোগ! পুত্র মরল, স্ত্রীকে জামিন দিতে হল। সকলে কত কিছু মনে করল। আর তার (হরিশচন্দ্রের) তো বিশ্বাস ছিলই—গুরু যা করেন তাতেই মঙ্গল। হরিশচন্দ্রের বরং স্বস্তিই ছিল। তিনি (বিশ্বামিত্র) দয়া করে নিয়েছেন। আমার ভালই হয়েছে।—এই পর্যন্ত বলে শ্রীশ্রীপিতৃদেব থামলেন।

[পিতৃদেবের চরণপ্রান্তে/তাং-৭/৯/৭৯ ইং]

[প্রসঙ্গঃ সত্যানুসরণ পৃষ্ঠা ১৪৪]