যখনই দেখবে, গুরুর … এসেছে।-ব্যাখ্যা

সত্যানুসরণ-এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

যখনই দেখবে, গুরুর আদেশে শিষ্যের আনন্দ হ’য়েছে, মুখ প্রফুল্ল হ’য়ে উঠেছে, তখনই বুঝবে যে তার হৃদয়ে শক্তি এসেছে।

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

শান্তদীপাকে (রায়চৌধুরী) আলোচনা করতে বললেন শ্রীশ্রীপিতৃদেব।

শান্তদীপা—যখন আমি গুরুর কথা শুনব না তখন মনে প্রফুল্লতা আসে না, হৃদয়ে শক্তিও পাই না। আর যখন গুরুর কথা শুনব তখন মন আনন্দে ভ’রে যায়, হৃদয়ে শক্তি আসে।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—গুরুর কথা শোনা মানে?

শান্তদীপা—মানে গুরুর আদেশ পালন করা।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—হ্যাঁ, গুরুর আদেশ না শোনার কারণ কী? গুরুজনদের কথা শুনতে ভাল লাগে না কেন?

—মা হয়তো আমাকে পড়া তৈরি করতে বললেন। আমি পড়লাম। তারপর মায়ের কাছে পড়া দিলাম। মা বললেন—হয়নি, আবার পড়্ । আমি আবার পড়লাম। এবারও পড়া না হওয়ায় মা আবার পড়তে বললেন। আমার ভাল লাগল না; বললাম—আর পারব না।

উপস্থিত সবার মুখে হাসি। শ্রীশ্রীপিতৃদেবও হাসছেন; প্রশ্ন করলেন—পারব না কেন বললে?

—মুখস্থ হচ্ছে না, তাই।

—মুখস্থ হচ্ছে না কেন?

শান্তদীপাকে নির্বাক দেখে তিনি সুন্দরীকে ঐ একই প্রশ্ন করলেন।

নীরদাসুন্দরী সরকার—পড়তে ভাল লাগে না, তাই মুখস্থ হয় না।

—পড়তে ভাল লাগে না কেন?

—মনচায় না।

—হ্যাঁ, সে তো হ’ল, কিন্তু মন চায় না কেন?

নীরদাসুন্দরী উত্তর দিচ্ছে না দেখে তিনি ধৃতিদীপীকে (বক্সী) ঐ প্রশ্ন করলেন।

ধৃতিদীপী—প’ড়ে আনন্দ পাই না, তাই মন চায় না।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—সে তো বটেই। কিন্তু পড়ে আনন্দ হচ্ছে না কেন?

ধৃতিদীপী নিরুত্তর।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—গুরু মানে কী? গুরু মানে ভারী। পিতামাতা হলেন গুরু। শিক্ষকও হ’লেন গুরু, শিক্ষা-গুরু। গুরুর আদেশ পালন করতে মন চাইছে না, তাই আনন্দ পাচ্ছ না। মা বললেন—পড়া কর্‌, এ-কথা শুনে যদি তোমার মনে আনন্দ হয় তবে তুমি মন দিয়ে পড়বে আর পড়াও মুখস্থ হবে। গুরুজনদের আদেশ পেয়ে যদি মন আনন্দে ভ’রে ওঠে তাহলে সে কাজ তাড়াতাড়ি হয়। সব মনের ব্যাপার, মনকে ইচ্ছামত দু’দিকেই চালানো যায়। বিবেক অনুযায়ী মনকে চালানো যায়, আবার প্রবৃত্তি অনুযায়ীও চালানো যায়। বিবেক মানে কী? ভাল-মন্দ বিচার ক’রে ভাল যেটা তা’ যা থেকে আসে তাই বিবেক। মন তা’ সবসময় চায় না, মন এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ায়। সেজন্য বিচার ক’রে বিবেক অনুযায়ী মন চালাতে হয়।

উদাহরণ দিয়ে শ্রীশ্রীপিতৃদেব বললেন—এই ধর, যখন প্রসাদ নেওয়া চলছে; সবাই হৈ-চৈ শুরু ক’রে দিল। তুমিও করতে লাগলে, আগে প্রসাদ নিতে চাইলে; এটা হ’ল প্রবৃত্তির দিক। আর যদি ভাব—না, হৈ-চৈ করা ঠিক না—এই বিচার ক’রে লাইনে দাঁড়ালে তাহলে তা’হবে বিবেকের কাজ। আমরা অনেক সময় লোভে প’ড়ে অবিবেকের কাজ করি। লোভই পাপ। সেই ছড়াটা কী আছে যেন?

নির্দেশক্রমে উপস্থিত ছেলে-মেয়েরা একে-একে ব’লে চলল—

খুব সাবধান! লোভ ক’রো না 
লোভ ক'রে ছাই সাধ এনো না
সাধের সঙ্গে ঢোকে পাপ
পাপ ঢুকলেই মনস্তাপ।

মাঝে-মাঝেই প্রসঙ্গক্রমে শ্রীশ্রীপিতৃদেব ঐ ছড়া উদ্ধৃত করেন; ছোট-ছোট ছেলে-মেয়েরা তাঁর কাছ থেকে শুনে ছড়াটি মুখস্থ ক’রে ফেলেছে। বাল্যকালে ‘ঠাকুরমা’র ঝুলি’ বা অন্য কোন বইয়ে তিনি তা’ পড়েছিলেন।

[ইষ্ট-প্রসঙ্গে/তাং-১৭/৩/৭৬ ইং]

ছেলেদের মধ্যে সনৎ সরকারের উপর আলোচনার নির্দেশ হলে সনৎ বাণীটি পুনরায় পাঠ করে বলল—কোন শিষ্য যখন গুরুর আদেশ পালনের জন্য সর্বদা উন্মুখ হয়ে থাকছে, গুরুর কাজ করে আনন্দ পাচ্ছে—তখনই বুঝব তার হৃদয়ে শক্তি এসেছে।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব উপস্থিত জনদের বললেন—কি, ঠিক আছে?

হরিপদদা (দাস)—না, বোঝা গেল না।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—প্রশ্ন কর্‌, প্রশ্ন করলে আলোচনাটা clear (পরিষ্কার) হয়।

হরিপদদা (সনৎকে)—যখন গুরুর আদেশ পালন করতে আনন্দ জাগে তখন শক্তি আসে—শক্তিটা আসে কেমন করে?

সনৎ—তাঁর খুশী, তাঁর সুখবোধটা বুঝতে পারব। নিজের মঙ্গল হবে আর তখনই হৃদয়ে শক্তি আসবে।

[পিতৃদেবের চরণপ্রান্তে/তাং-২৮/৮/৭৯ ইং]

[প্রসঙ্গঃ সত্যানুসরণ পৃষ্ঠা ১৩৮ – ১৩৯]