যত ডুববে তত বেমালুম হবে।-ব্যাখ্যা

সত্যানুসরণ-এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

যত ডুববে তত বেমালুম হবে।

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

বিভিন্ন ভাষায় বাণীটি পাঠের পর শ্রীশ্রীপিতৃদেব নাম ধ’রে ছোট-ছোট বোনেদের কয়েকজনকে বাণীটি পাঠ করতে বললেন। আজ পাঠ করল যথাক্রমে কুমারী নীরদাসুন্দরী সরকার, কুমারী মিনতি গাঙ্গুলী, কুমারী শান্তদীপা রায়চৌধুরী ও কুমারী তীর্যরানী দাস। পাঠ শেষে নির্দেশমত তীর্যরানী আলোচনা শুরু করল।

তীর্যরাণী—যত আমি নাম করব, ধ্যান করব, তত তার মধ্যে ডুবে থাকব, আমি যে আছি বুঝতে পারব না।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—নিজে থেকেই বললে? ঋত্বিক কে?

তীর্যরাণী—বাবা (শ্রীহরিপদ দাস)।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—উৎফুল্ল হ’য়ে বললেন—বাঃ! বেশ বলেছ। তোমরা তো অনেক বুঝে ফেলেছ দেখছি!

এরপর তিনি নীরদাসুন্দরীকে বাণীটি বুঝিয়ে দিতে বললেন।

নীরদাসুন্দরী—যত নাম করব তত আমি অন্য সব কিছু ভুলে যাব।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—বেমালুম মানে কী? দীপ্তি বল।

দীপ্তি (কর)—বেমালুম মানে না জানা, বুঝতে না পারা।

বাণীটি সম্বন্ধে বোনেদের আলোচনার পর শ্রীশ্রীপিতৃদেব বললেন—চান করতে গেলাম, ডুব দিলাম, অল্প ডুবলাম, তাই ঘাড় মাথা সব দেখা যাচ্ছে। আরো ডুবলাম, কিছুই দেখা যাচ্ছে না, কেবল জলের ওপর তরঙ্গ উঠছে। একসময় সেই তরঙ্গও মিলিয়ে যাবে। জলাশয়ের পাড়ের লোকেরা আমায় টের পাবে না। জল দেখে কেউ বুঝতে পারছে না ভেতরে লোক আছে।— এটা একরকম । আর, তীর্যরাণী, সুন্দরী যা বলল তা’ থেকে বলা যায়—নাম করছি, মশায় কামড়াল, টের পেলাম না। নাম করেই চলেছি, বাইরের সংঘাত কিছুই বোধ করতে পারছি না। বাইরের সংঘাত দ্বারা আমি বিক্ষিপ্ত হচ্ছি না। সেজন্য বাইরেও তার প্রকাশ নাই। এটা আর একরকম।

[ ইষ্ট-প্রসঙ্গে/তাং-১৭/২/৭৬ ইং]

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—কৃতিদেবতাকে (চৌধুরী) আলোচনা করতে বললেন। কৃতিদেবতা বাণীটি একবার পড়ল কিন্তু কিছু না বলায় শ্রীশ্রীপিতৃদেব বললেন—কি হল রে? ডুব্‌, ডুবলেই তো বুঝতে পারবি। ডুবা মানে কি? —তার মানে গভীর ছাপ পড়া। মালুম হওয়া মানে কি?

কৃতিদেবতা—বুঝতে পারা, জানতে পারা।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—তাহলে বেমালুম মানে—বুঝতে না পারা। ধর্‌, একটা পুকুরে ডুব দিলি—আস্তে আস্তে মালুম হচ্ছে, মানে জানতে পারছিস, কিন্তু যদি অনেকক্ষণ ডুবিস তখন জল স্থির হয়ে যাবে। ঘরের মধ্যে অঙ্ক করছিস্—অন্যে চেঁচামেচি করছে—সবই জানতে পারছিস। আর যখন মশগুল হয়ে গেলি—মা বলছে ঘরে কেউ নাই নাকি?—কোন শব্দ নাই।—এই রকমই হয়। একদম absorb (মগ্ন) হয়ে গেলে বেমালুম হয়ে যায়। বাইরের লোক বুঝতে পারে না, নিজেও বুঝতে পারে না। ইষ্টের কাছে গিয়ে বুঝতেই পারে না নিজে কি করছে।

অভিধান থেকে মালুম মানে দেখলেন—বোধ, জ্ঞান, উপলব্ধি। আবার বললেন—তুই জলের মধ্যে যাচ্ছিস, তখন প্রথম-প্রথম মালুম হচ্ছে। পরে যখন সম্পূর্ণ ডুবে গেলি তখন সব স্থির, আর কোন ঢেউ নাই। সব সমান। ঘরের মধ্যে সমস্ত অন্তর দিয়ে কাজ করা যায়—বাইরের লোক বুঝতে পারে না। অঙ্ক কষতে-কষতে ৮টা কষে ফেললি। তখন এত ডুবে গেছিস যে খেয়ালই নাই। একটা ছেলের মাথা খুব যন্ত্রণা করত, কিন্তু ‘কোডোপাইরিন‘ খেত না—অঙ্ক কষতে বসত। তাতে আস্তে আস্তে ভাল হয়ে যেত, বেমালুম হয়ে যেত। কল্যাণীর (পূজনীয়া বড়দিদি) যখন বিয়ে হয় তখন বাবুকে (পূজ্যপাদ বড়দাদাকে) খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছে না। খোঁজাখুঁজির পর দেখা গেল একটা মশারি টাঙিয়ে ভেতরে বসে পড়ছে । এত মন বসে গেছে। যখন মন বসে না, তখন ৫ মিনিট নাম করলে মনে হয় এক ঘন্টা হয়ে গেল। আবার যখন মন বসে তখন এক ঘন্টা-দু’ঘন্টা বসলেও মনে হয় ৫ মিনিট করলাম। যত ডুববে, যত তুমি মন দিয়ে কাজ করবে তত কি হবে?—বেমালুম হয়ে যাবে। স্থান, কাল, পাত্র সব বেমালুম হয়ে যাবে।

[ পিতৃদেবের চরণপ্রান্তে/তাং-২৮/৭/৭৯ ইং]

টীকা:

১. কোডোপাইরিন – (Codopyrin) — অ্যাসপিরিন ২৫০ মিগ্রা, কোডেইন ১০ মিগ্রা, ও প্যারাসিটামল ২৫০ মিগ্রা -এর সমন্বয়ে গঠিত একটি ব্যাথা ও জ্বর কমানোর ঔষধ।