যত পার সেবা কর,….হয় ।-ব্যাখ্যা

সত্যানুসরণ -এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

যত পার সেবা কর, কিন্তু সাবধান! সেবা নিতে যেন ইচ্ছা না হয় ।

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

অন্যান্য দিনের মত আজও বাণীটি নিয়ে আলোচনা শুরু হ’ল। সতীশদা দেবকুমারদাকে (সিংহভাদুড়ী) আলোচনা করতে বললেন।

দেবকুমারদা—ঠাকুর বলছেন সেবা নিতে যেন ইচ্ছা না হয়। আমার সেবা সবাই করুক এরকম ভাবতে নেই।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—সেবার মানে তো বুঝতে পারলাম না। সেবার তো একটা মানে আছে। আগে এর মানেটা বুঝা দরকার। আমাকে সব্বাই সেবা করুক সেটাই বা ভাবতে যাব কিজন্য?

অতঃপর শ্রীশ্রীপিতৃদেব অভিধান খুলে সেব্‌ ধাতুর অর্থ দেখলেন। বললেন—পরিরক্ষণ, পরিপূরণ, পরিপোষণ এই তিনটি সেবার অঙ্গ।

এরপর শ্রীশ্রীপিতৃদেব সতীশদাকে বাণীটির অর্থ বুঝিয়ে বলতে বললেন।

সতীশদা—বাড়িতে অতিথি এলে তাকে সেবা করি—থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্ত করি। সেবা বলতে এরকম বুঝি।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—অতিথি যে, নারায়ণ জ্ঞানে তার সেবা করব, তাকেও ইষ্ট ভেবে পরিতৃপ্ত করার চেষ্টা করব। আর সবসময়ই কি অতিথি আসবে? শুধু কি তারই সেবা করব? “সেবা কর” বলতে কি ঠাকুর এই বলতে চেয়েছেন? সেবা করার তো কত ক্ষেত্র রয়েছে।

ক্ষণিক থেমে শ্রীশ্রীপিতৃদেব বললেন—সেবা মানে আমি বুঝি ঠাকুরের সেবা। নিঃস্বার্থ সেবা দ্বারা যখন মানুষকে খুশি করি, তৃপ্ত করি তখন ঠাকুর খুশি হন। ইষ্টজ্ঞানে স্থাবর-অস্থাবর সবকিছুকে সেবা দেওয়া যায়।

সতীশদা—স্থাবর বা inanimate object-কে (নিষ্প্রাণ বস্তুকে) সেবা দেওয়া কিরকম?

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—যেমন একটা বই-এর পাতা উল্টে পড়ে আছে দেখলে দেখেই তুমি তা ঠিক করে রাখলে, যার’ই বই হো’ক না কেন। এমনি ক’রে প্রত্যেক বস্তুসত্তাকে সেবা দেওয়া যায়, তৃপ্ত করা যায়। এভাবে সেবা দিতেই ঠাকুর আমাদের বলেছেন। ‘সেব্‌’ ধাতুর অর্থটা মনে মনে ঠিক রাখতে হয়। কিন্তু আমাকে সবাই সেবা দিক তা ভাবতে হয় না। যারা সেবা নিতেই অভ্যস্ত তারা নিজের প্রতি সামান্যতম ত্রুটিতেই অসন্তুষ্ট হয়ে থাকে। যারা পয়সা দিয়ে চাকর-বাকর রাখে তাদের অনেককে দেখা যায়, তার সামান্যতম ক্রটিও সহ্য করতে পারে না। তারা জানে কাজের সুবিধার জন্যই চাকর রাখা। চাকরের উপর নির্ভর করতে তারা অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু চাকরের মধ্যেও ইষ্ট রয়েছেন। তাকেও ইষ্টজ্ঞানে সেবা দিতে হয়। উভয়ে উভয়ের কাছে সেবা পাওয়ায় পারস্পরিক টান বেড়ে যায়।

গুরুকিংকরদা (পাণ্ডে)—’সেবা দিতে হয়’ শেখানোর জন্যও তো অনেক সময় সেবা নিতে হয়। যেমন আমার ছেলেকে আমার সেবা করতে বললাম। কিংবা সংশোধনের জন্যও তো প্রয়োজন হয়ে থাকে।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—আমি নিজে সেবা নিয়ে শেখাতে যাব কেন? আমি সেবা দিই, তা’ দেখে আমার ছেলেও শিখবে। আমার আচরণের মধ্যে তা’ ফুটে উঠবে। এইভাবে সেও বুঝবে। অবশ্য দোষক্রটি সংশোধনের জন্য ছেলেপেলেকে ভালবাসা, মিষ্টি কথায় কাজ না হলে প্রয়োজনে কখনওবা আঘাতও করা যায়। আঘাত দেওয়াটাও সেখানে ভাল-র জন্যই। যেমন ডাক্তাররা রোগীর ফোঁড়া কাটে, রোগী চিৎকার করে, ব্যথা পায়—এটা তার ভাল-র জন্যই।

মোটকথা, ইষ্টের প্রীতি-উৎপাদনই সেবার মূল লক্ষ্য। সব অবস্থায় প্রতি পদক্ষেপেই ইষ্টকে খুশি করার ব্যাপার রয়েছে। যাকে আমি সেবা দিচ্ছি সে যদি পুষ্ট না হয়, পরিপুরিত না হয় সে সেবার কোন অর্থ হয় না, ইস্ট খুশি হন না সে সেবায়। ইস্টের প্রীতি-উৎপাদনই আমার লক্ষ্য।

[ ইষ্ট-প্রসঙ্গে/তাং-১৮/১/৭৬ ইং]

—প্রীতিদীপা রায়ের উপর বাণীটি আলোচনার ভার পড়ল। শ্রীতিদীপা বাণীটি পুনরায় পাঠ করে বলে—আমি যত পারি সেবা করব। একজনের জ্বর হয়েছে, তার মাথায় জল ঢেলে দিলাম, ওষধ এনে দিলাম।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—কারও যদি জ্বর না হয়? জ্বর যদি না হয়, তখন কী সেবা করবি?

প্রীতিদীপা—একজন বুড়ো হয়ে গেছে—বাজার করে দিলাম।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—বুড়ো যদি না হয়?

প্রীতিদীপা—একজন লোক যখনই যেটা বলল, আমি যদি সেটা করে দিই।

বাণীটি ঠিক আলোচনা হচ্ছে না দেখে শ্রীশ্রীপিতৃদেব কমলকে (চক্রবর্তী) বলতে বললেন।

কমল—ঠাকুর এখানে বলছেন, যত পার সেবা কর কিন্তু সেবা নিও না।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—সেটা কী রকম? সেবা মানে কী?

পাশের অভিধান খুলে দেখলেন—সেবা মানে আরাধনা। (কমলকে) ঠিকই তো বলছিস, বল্।

কমল—যত পার সেবা কর, কিন্তু সেবা নিও না।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—তাই আছে নাকি? সাধারণভাবে বুঝতে পারছিস না! সেবা দেওয়ারই রেওয়াজ নাই তো! সেবা করা মানে কী?—যেমন একজন লোক কলে জল খেতে এল—চান করছিলাম, ছেড়ে দিলাম। নিজের সুবিধা না করে অন্যের সুবিধা করে দেওয়াই সেবা। একটা কুকুর পথে পড়ে আছে, গাড়ি চাপা পড়তে পারে—সরিয়ে দিলাম। (কমলের দিকে তাকিয়ে) শুধু ঝগড়া করলে তো সেবা হয় না। তোর টিকিতে হাত দিলে তুই মেরে দিস। যদি বুঝিয়ে দিতে পারতিস তাহলে সেবা হত। মানুষের যে কোন রকম সুযোগ-সুবিধা করে দেওয়া নিজের অসুবিধা করেও—সেটাই সেবা।

[ পিতৃদেবের চরণপ্রান্তে/তাং-২২/৬/৭৯ ইং]

[প্রসঙ্গঃ সত্যানুসরণ পৃষ্ঠা ৭৫, ৭৬]