যদি এতটুকু লোকনিন্দা … কি?-ব্যাখ্যা

সত্যানুসরণ-এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

যদি এতটুকু লোকনিন্দা, উপহাস, স্বজনানুরক্তি, স্বার্থহানি, অনাদর, আত্ম বা পরগঞ্জনা তোমার প্রেমাস্পদ হ’তে তোমাকে দূরে রাখতে পারে, তবে তোমার প্রেম কতই ক্ষীণ—তা’ নয় কি?

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

সতীশদা জানালেন, আলোচনা করার আছে।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—কে বলবে? শঙ্কর (রায়) বলুক।

শঙ্করদাকে ইতস্ততঃ করতে দেখে শ্রীশ্রীপিতৃদেব বললেন—কি জিজ্ঞাসা করতে হবে জিজ্ঞাসা কর সতীশদাকে।

তাকে কিছু জিজ্ঞাসা করার আগে তিনি (সতীশদা) জানতে চাইলেন—লোকনিন্দা ইষ্টবিচ্যুতি নিয়ে আসে কেমন ক’রে?

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—তাহলে প্রশ্ন ওঠে লোকনিন্দা বলতে কি বোঝা যায়? কার সম্বন্ধে কে নিন্দা করবে?

শঙ্করদা—ঠাকুরের দীক্ষা নিয়ে মাছ-মাংস খাই না। এজন্য লোকে আমার নিন্দা করছে।—মাছ-মাংস খাচ্ছ না, স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে যাবে।

—মাছ-মাংস খাচ্ছ না, স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে যাবে; এটা কি লোকনিন্দা হল?

—লোকের ঐ কথা শুনে আমার বিচ্যুতি এলে তবেই লোকনিন্দা বলা যাবে।

—আমি মাছ-মাংস খাই না, ঠিকই তো; ঐ কথায় আমার বিচ্যুতি হবে কেন?

তাঁর আদেশে এবার প্রফুল্লদা (বক্সী) কিছু বললেন। কিন্তু প্রফুল্লদার কথা আসল বক্তব্য থেকে দূরে স’রে যাচ্ছে দেখে শ্রীশ্রীপিতৃদেব বললেন—এত সময় নিলে আলোচনা চলবে কেমন ক’রে?

প্রফুল্লদার বক্তব্য ছিল, সৎসঙ্গীরা মাছ-মাংস খায় না; তাই অন্যেরা সৎসঙ্গীদের নিন্দা করতে পারে।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব তা’ শুনে বললেন—যদি বলি ইনি মাছ-মাংস খান না, এটা লোক নিন্দা হলাে নাকি?

একটা ঘটনা বলি শোন্‌। তখন আমার বয়স আট। এক গাঁয়ে গেছি। কায়স্থ বাড়ী। গাঁয়ে সৎসঙ্গী (গুরুভাই) কম। আমি বামুনের ছেলে, নিরামিষ খাই দেখে তারা এক বামুনের বাড়ীতে আমার খাওয়ার ব্যবস্থা করল। আমি নিরামিয খাই শুনে বাড়ীর গিন্নী বলল—এতটুকু ছেলে মাছ-মাংস খায় না, শরীর থাকবে কি-ক’রে? বাড়ীর লোকের কাণ্ডজ্ঞান নেই। আমি সব শুনে গেলাম। অথচ খাওয়ার সময় দেখা গেল বাড়ীর ছেলেরা শুধু মাছের ঝোল আর ভাত খাচ্ছে, আর আমার জন্য ঘি, দুধ, কলা কত-কি জিনিস! এতসব ক’রেও বলছে—বাবা, কি-ক’রে খাবে, শুধু ভাত।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব পুনরায় বললেন—নিরামিষ খেলে লোকে শ্রদ্ধাই করে। আসল ব্যাপার হ’ল লোভ। অধিকাংশ লোক মাছ-মাংস লোভে পড়েই খায়। সেজন্য যারা মাছ-মাংস খায় তারা নিরামিষাশীদের শ্রদ্ধার চোখেই দেখে।

লোকনিন্দা প্রসঙ্গে সতীশদা পুনরায় বললেন—একজন লোক হয়তো দীক্ষা নিয়ে ঠাকুরের কাজ করে। লোকে বলে লোকটার বাড়ী-ঘরের দিকে মন নেই, সবসময় ঠাকুর-ঠাকুর করে, বিষয়-সম্পত্তি কিছুই দেখে না, স্ত্রী-পুত্র-পরিবারের প্রতি এতটুকু মমতা নাই—এটা একধরণের লোকনিন্দা।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—এটা লোকনিন্দা হ’ল কি করে? এটা হ’ল সুখ্যাতি। কোনকিছুই তাকে ঠাকুরের কাজ থেকে সরিয়ে রাখতে পারে না। যোল আনা মন দিয়ে সে ঠাকুরের কাজ করছে। সে তো strongly (দৃঢ়ভাবে) করছেই, আবার যে বলছে ঘর-সংসারের দিকে মন নেই, সবসময় ঠাকুর-ঠাকুর করে সে-ও strongly বলছে।

লোকনিন্দার যথাযথ উদাহরণ হচ্ছে না দেখে শ্রীশ্রীপিতৃদেব নিজেই বললেন—একজন লোক দীক্ষা নিয়ে প্রায়ই ঠাকুরবাড়ী আসে। তা’ দেখে হয়তো কেউ ওর বাড়ীর লোককে বলল, ঠাকুরবাড়ী ঠাকুরের টানে যাচ্ছে নাকি? মেয়েলোকের টানে যায়। তারপর ঐ লোক বাড়ী এসে দেখল কেউ কথা বলছে না তার সঙ্গে, তাদের ভাব বুঝতে পারল। সে তো ঐসব শুনে উড়িয়েই দিল, কিছু মনেই করল না। আবার অন্যরকমও হতে পারে। ঐ একই কথা বার-বার শুনতে হচ্ছে দেখে হয়তো ঠিক করল,— আর যাবই না ঠাকুরবাড়ী।

‘যত সব টাকা মারার ফন্দী’, যত সব নারী-ঘটিত ব্যাপার’, লোকে সাধারণতঃ এই বলে নিন্দা ক’রে থাকে। ‘এতলোক দীক্ষা নিয়েছে, তোমার মত বারে-বারে কে অত ঠাকুরবাড়ী যায়’ বাড়ীর লোকে সাধারণতঃ এই কথা ব’লে থাকে।

মনোরঞ্জন (চ্যাটার্জী)—এক দাদা, বেনারসে বাড়ি, বর্ণে বিপ্র। আনন্দবাজারে পংক্তি ভোজন দেখে বললেন, আপনারা তো বর্ণাশ্রম মানেন না।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—আপনি তখন কি বললেন?

মনোরঞ্জনদা—আমি বললাম, পংক্তি ভোজন হ’লে কি বর্ণাশ্রম মানা হয় না?

শ্ৰীশ্রীপিতৃদেব—আমি হ’লে বলতাম মহাপ্রসাদের দোষ আছে নাকি? জগন্নাথ-ক্ষেত্রের নাম শুনেছেন তো—কত নিষ্ঠাবান-নিষ্ঠাবতীরা সেখানে রান্না করে, কিন্তু সেখানেও ছোঁয়া-ছুঁয়ির ব্যাপার নেই। মহাপ্রসাদের ক্ষেত্রে ওসব বিধি-নিষেধ চলে না।

[ ইষ্ট-প্রসঙ্গে/তাং-১৩/৯/৭৫ ইং ]

[প্রসঙ্গঃ সত্যানুসরণ পৃষ্ঠা ২৮৩ – ২৮৪]