যদি কোনদিন তোমার …. আছেন।-ব্যাখ্যা

সত্যানুসরণ-এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

যদি কোনদিন তোমার প্রেমাস্পদকে সৰ্ব্বস্ব বিকিয়ে নিমজ্জিত হ’য়ে থাক,—আর ভেসে উঠবার আশঙ্কা দেখ, তবে জোর ক’রে তৎক্ষণাৎ নিমজ্জিত হ’য়ে বিগতপ্রাণ হও—দেখবে প্রেমাস্পদ কত সুন্দর, কেমন ক’রে তোমাকে আলিঙ্গন ক’রে আছেন।

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—যিনি আমার ইষ্ট, যিনি গুরু তিনিই আমার প্রেমাস্পদ। তাঁর জন্যই সর্বস্ব বিকিয়ে দিতে হয়। তাঁর চরণে সর্বস্ব দেবার জন্যই গুরুকরণ করেছি। আমার আলাদা কোন entity থাকছে না। ভেসে উঠলে মানে আমার আলাদা entity দেখা দিলে; সেক্ষেত্রে তৎক্ষণাৎ বিগতপ্রাণ হতে বলেছেন। তাঁর entity-ই হবে আমার entity. মহাসমুদে আমি একটি বুদ্বুদ। বুদ্বুদ জলেই মিলিয়ে যায়। আমার আলাদা সত্তা ফুটে উঠলে তখন সঙ্গে-সঙ্গে তাঁর ইচ্ছাকে আমার ইচ্ছা করে পুনরায় বিগতপ্রাণ হতে হবে। তবে যে-কোন পার্থিব বস্তুর প্রতি এতটুকু আসক্তি থাকলে তাঁর হওয়া যায় না। আমরা তাঁকে চাই। তিনি এমন জিনিস, তাঁকে পেলে সব পাওয়া হয়ে যায়।

একটা প্রশ্ন আসতে পারে—বিগতপ্রাণ হ’লে কেমন করে enjoy করব? বিগতপ্রাণ হ’লেও enjoy করা যায়। বেঁচে-আছি তোমার জন্য। তুমি ছাড়া আমার বেঁচে থাকাও হয় না। বিগতপ্রাণ হ’লে এমন হয়।

সতীশদা—মনে ইষ্টের প্রতি সন্দেহের কারণে কি ভেসে উঠছি?

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—সন্দেহ বা সরে যাওয়ার কথা আসছে না।

অতঃপর শ্রীশ্রীপিতৃদেব বীরভক্ত হনুমানের উদাহরণ দিলেন।—শ্রীরামচন্দ্রের সঙ্গে হনুমান দেখা করতে আসেন নিজের কাজ উদ্ধারের জন্য। জানতেন শ্রীরামচন্দ্র রঘুকুলপতি। বীরশ্রেষ্ঠ। তাঁর সাহায্য পেলে কাজ হবে। হনুমান প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। জঙ্গল থেকে আসেন নাই। বিরাট পণ্ডিত ছিলেন। শ্রীরামচন্দ্রকে দর্শন করেই ভক্ত হয়ে গেলেন। তাঁর যা’ ছিল সবই রামচন্দ্রের হয়ে গেল। তার মানে সর্বস্ব বিকিয়ে দিলেন। এটা হতে বেশি সময় লাগেনি।

এরপর শ্রীশ্রীপিতৃদেব সাধিকা মীরাবাঈ-এর কাহিনী উল্লেখ করলেন।—মীরাবাঈ কৃষ্ণভক্ত। রূপে ও গুণে অসামান্যা মীরাবাঈ-এর বিয়ে হয় মেবারের মহারাজ কুম্ভের সঙ্গে। মেবারের রাজবংশ শক্তির উপাসক। কৃষ্ণ উপাসনা ত্যাগ ক’রে মীরাবাঈকে শক্তি-উপাসনা করার নির্দেশ দিলেন রাজমাতা। প্রাণান্তেও কৃষ্ণ উপাসনা ত্যাগ করতে অপারগ জানালেন মীরা। শেষপর্যন্ত রাজপ্রাসাদ ত্যাগ ক’রে কৃষ্ণ উপাসনার পথই বেছে নেন মীরা। স্বামীপ্রদত্ত অর্থে ধর্মশালা স্থাপন করে মানুষের সেবা করতে থাকেন। মীরা রাজধানী পরিত্যাগ করার পর মেবারে দুর্ভিক্ষ, অনাবৃষ্টি ইত্যাদি অমঙ্গল দেখা দিতে থাকে। জ্যোতিষী জানালেন—রাজলক্ষ্মী রাজধানী ছেড়ে যাওয়ার কারণে মেবারে নানাবিধ অমঙ্গলের সূচনা। মীরাবাঈ দ্বারকায় যান এবং সেখানে কৃষ্ণনাম করতে-করতে নশ্বর দেহ ত্যাগ করেন। তিনি কৃষ্ণে বিগত প্রাণ ছিলেন। তাঁর কোন স্বতন্ত্র সত্তা ছিল না। তাই তাঁর কাছে রাজপ্রাসাদ ও অতুল বৈভব তুচ্ছ মনে হয়েছিল।

[ ইষ্ট-প্রসঙ্গে/তাং-১৫/৯/৭৫ইং]

ক্ষিতীশদা—যদি তাঁকে আমার সৰ্ব্বস্ব বলে গ্রহণ করি আর যদি প্রাণ দিয়ে থাকি তবেই।

শ্রীশ্রীবড়দা—আলোচনা কর, আর একটা উদাহরণ দাও, প্রেমাম্পদ কে?

ক্ষিতীশদা—ভক্তির গাঢ়ত্বই প্রেম।

শ্রীশ্রীবড়দা—প্রিয়পরম যিনি তাঁর উপর ভক্তি ক্রমে প্রেমে পরিণত হয়।

ক্ষিতীশদা—তাঁকে আমি সব দিয়েছি। বিগত প্রাণ হব কি করে?

উত্তর—আমি আমার বলে কিছু না রেখে তাঁকে দিয়ে বিলীন হয়ে যাব। নিজত্ব বলে রাখব না। তখন তাঁর সুন্দর রূপ বুঝতে পারব।

শ্রীশ্রীবড়দা—নিমজ্জিত ও বিগতপ্রাণ হ’ল কি ক’রে?

উত্তর—তার নিজত্ব, পাপ-পুণ্যের কোন বোধ নেই, হনুমান চুরি করল শ্রীরামচন্দ্রের মুখে হাসি ফুটল।

শ্রীশ্রীবড়দা—চুরি করে নিয়ে আসল তাতে কি শ্রীরামচন্দ্রের হাসি ফোটে? ও ভাবল আমার যা হয় তা হোক, প্রভু খুশি হলেই হল। রামচন্দ্রকে যদি বলত আমি হাজার-হাজার মানুষকে পুড়িয়ে দিয়ে এসেছি, তবে কি তাঁর হাসি ফুটত?

বিগতপ্রাণ বলতে কি বোঝা যায়—দেহরক্ষা করা? তা না। দেহের কোন প্রয়োজন বোধ না করা। যাঁর জন্য দেহ তাঁকেই দিয়ে দেওয়া। মীরা নন্দলালের প্রেমে ঘর ছেড়ে চলে গেল। দেশের পণ্ডিত, রাজা, যারা সৎলোক একযোগে চললো মীরাকে ফিরিয়ে আনতে। ভজন করতে করতে মীরার দেহটা পড়ে থাকল গিরিধারীলালের চরণে। দ্বারকায় একটা তালাকূপ আছে। গোপীরা যখন শুনল শ্রীকৃষ্ণ সেখানে দেহ রেখেছেন—সব গোপীরা শুনেই ঝাঁপ দিয়ে পড়ল। যখন মন-প্রাণ তাঁতে মিশে যায় তখন দেহাত্ম বোধ থাকে না। দেহটা পড়ে থাকে, মন চলে যায়। আমরা জন্মেছি তাঁর দয়াতে, তাঁর ইচ্ছাতে। মায়াবদ্ধ জীব তো, তাই দেহের ওপর মায়া থাকে। World is drifting into perfection দেহ থাকলে নানা ঝঞ্জাট তো…..কাম-ক্রোধ-মদ-মাৎসর্য্য বিগতপ্রাণ হওয়া আর প্রেমাস্পদে বিগতপ্রাণ হয়ে পরমানন্দ লাভ করা, অনেক পার্থক্য। আমরা মায়াবদ্ধ জীব তো? তাঁর জন্য জীবন দিতে পারি না। কারণ দেহটার উপর মায়া আছে। দেহটা তো একদিন চলেই যাবে—সব সময় দেখছি, কিন্তু তাঁর জন্য যদি দেহটা দিই—তখন সাপে কাটুক, জরায় ধরুক—তাঁর জন্য দিলেই পরমানন্দ।

[‘যামিনীকান্ত রায়চৌধুরীর দিনলিপি/তাং-১০/১০/৭৬ ইং]

[প্রসঙ্গঃ সত্যানুসরণ পৃষ্ঠা ২৮২-২৮৩]