যাঁর কোন মুৰ্ত্ত আদর্শে ….তিনিই সদ্‌গুরু।

সত্যানুসরণ-এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

যাঁর কোন মুৰ্ত্ত আদর্শে কৰ্ম্মময় অটুট আসক্তি—সময় বা সীমাকে ছাপিয়ে তাঁকে সহজভাবে ভগবান্ ক’রে তুলেছে—যাঁর কাব্য, দর্শন ও বিজ্ঞান মনের ভাল-মন্দ বিচ্ছিন্ন সংস্কারগুলিকে ভেদ ক’রে ঐ আদর্শেই সার্থক হ’য়ে উঠেছে—তিনিই সদ্‌গুরু।

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

শ্রীশ্রীপিতৃদেবের আদেশে সরমা আলোচনা শুরু করল।—আদর্শ মানে যাঁকে সামনে রেখে তাঁর মত হতে চেষ্টা করি। আসক্তি মানে—

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—আসক্তি মানে টান। সময় ও সীমাকে ছাপিয়ে মানে?

সরমাকে নিরুত্তর দেখে শ্রীশ্রীপিতৃদেব জিজ্ঞাসা করলেন—তুমি কখন জন্মেছ? কোন্‌ সালে?

সরমা—জানি না।

—ধর, তুমি দেওঘরে জন্মেছ ১৯৫৮ সালে। জ্ঞান হওয়া অবধি তুমি দেখছ, জানছ। তার বেশি তোমার জানা নেই। যিনি ভগবান, ষড়ৈশ্বর্যশালী তিনি ভূত, ভবিষ্যৎ, বর্তমান সবই জানেন। ভবিষ্যতে কি হতে চলেছে তাও তাঁর অনুভূতিতে ধরা পড়ে। ইষ্টের প্রতি তাঁর রয়েছে অটুট টান। শুধু কথার কথা না। ইষ্টের ইচ্ছাপূরণে তিনি ভীমকর্মা। তাঁর শরণ নিয়ে তাঁর ভাবে অনুপ্রাণিত হ’য়ে কত লোকের যে উদগতি হয় তার ঠিক নেই। বহু বছর পরেও তা’ হতে থাকবে। সহজভাবেই তিনি সকলের কল্যাণ, মঙ্গলে ব্রতী।

এরপর শ্রীশ্রীপিতৃদেব ধীরাকে জিজ্ঞাসা করলেন—কাব্য, দর্শন, বিজ্ঞান মানে?

ধীরা—কাব্য মানে পদ্য।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—কাব্য মানে পদ্য-সাহিত্য। সদগুরুর ভাষাই কাব্যময়। আর দর্শন মানে—?

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—দর্শন মানে তত্ত্বজ্ঞান। ইংরাজীতে বলে philosophy, আবার দর্শন মানে ভক্তিভরে দেখাও হয়। বিজ্ঞান মানে বিশেষ জ্ঞান।

মনের ভালমন্দ বিচ্ছিন্ন সংস্কার বলতে কী বুঝব? অনেক মন্দকাজও মানুষ অভ্যাসের বশে, ঝোঁকের বশে করে চলেছে। সদগুরু মনের এই ভালমন্দ সংস্কারগুলির ঠিক-ঠিক বিন্যাস করেন। অনুশাসন পরিপালনের মধ্যে দিয়ে অভ্যাস সংস্কারে পরিণত হয়। যেমন, আমরা প্রত্যহ ইষ্টভৃতি করি। অভ্যস্ত হতে হতে সংস্কার তৈরী হয়। না ক’রেই পারি না। অনুশাসন মুর্ত্ত আদর্শের সঙ্গে যুক্ত থাকায় তা জীবনবৃদ্ধির সহায়ক, তা’ অর্থপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। তা’ সকলকে পরিপুরিত করে। সকলের কাজে লাগে।

কৃপাসিন্ধু—আজ্ঞে, মন্দ সংস্কার কিভাবে সুসংবদ্ধ হয়? যেমন, কালীপূজোয় পাঁঠা বলি দেওয়ার রীতি আছে। হয়ত আমার বাড়ীতেই পুজো হয়, পাঁঠাবলিও হয়। ঠাকুরের দীক্ষা গ্রহণ ক’রে জানলাম বলি দেওয়া ঠিক না। তখন?

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—এক্ষেত্রে ঠাকুরের বিধানমতই করব। পশুবলি আর দেব না। ঠাকুরকে গ্রহণ ক’রে আমার চৈতন্য হ’ল, মা পশুর রক্ত গ্রহণ করেন না। তাই পশুবলি না দিয়েই পূজো করতে লাগলাম। সব জিনিস তখন ঠাকুরের দৃষ্টিতে দেখছি। ইষ্টের প্রতি অটুট টানে সদগুরুর সব সংস্কারগুলি সুসংবদ্ধ হ’য়ে ইষ্টস্বার্থপ্রতিষ্ঠায় সহায়ক হয়ে ওঠে। তাই মন্দ সংস্কার তখন আর মন্দ থাকে না। সেগুলিও ইষ্টে বা আদর্শে সার্থক হ’য়ে ওঠে।

[ ইষ্ট-প্ৰসঙ্গে/তাং-১৫/১/৭৮ ইং ]


অরুন্ধতী চ্যাটার্জী বাণীটি আলোচনা করার নির্দেশ পেয়ে বলল—যে মানুষ কাজের মাধ্যমে কোনও আদর্শের টানে … ,

অরুন্ধতীর বলার রকম শুনে শ্রীশ্রীপিতৃদেব বললেন—একটু-একটু পড়ে, একটু-একটু বল্‌। পরে নিজেই বলে দিলেন—যাঁর মানে—একজন লোকের। মূর্ত্ত আদর্শ মানে—রক্ত-মাংসসঙ্কুল আদর্শে, কর্মময় অটুট আসক্তি অর্থাৎ যত কাজই থাক সবই তাঁকে কেন্দ্র করে—সেই আদর্শকে কেন্দ্র করে।—সময় বা সীমাকে ছাপিয়ে মানে তিনি যে কালে আসেন তখনকার যে সব culture (কৃষ্টি), সংস্কার এ সবগুলির মর্মার্থ সহজভাবে অর্থাৎ স্বাভাবিকভাবেই জেনেছেন। কাব্য মানে যা লেখে—সাহিত্য, সঙ্গীত এ-সব, দর্শন মানে তিনি যা বলতে চান। বিজ্ঞান মানে—বিশেষভাবে যা বলতে চান। মনের সংস্কার অর্থাৎ আমাদের মনে ভালমন্দ অনেকরকম ধারণা আসে কিন্তু সেই আদর্শকে কেন্দ্র করে সেগুলি adjusted (নিয়ন্ত্রিত) হয়, সংস্কারভেদ হয়। যাঁর প্রতি টানে এগুলি হয় তিনিই আমাদের সদ্ গুরু।

[পিতৃদেবের চরণপ্রান্তে/তাং-২/৫/৮০ ইং]

[প্রসঙ্গঃ সত্যানুসরণ পৃষ্ঠা ৩০৮ – ৩০৯]